‘আমার ফাগুন চলে গেছে, অন্য ফাগুন যেন না যায়’

বিশেষ প্রতিনিধি: তরুণ সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনের হত্যারহস্য উন্মোচন করে হত্যাকারীদের খুঁজে বের করে দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা। এ সময় ফাগুনের বাবা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সাপ্তাহিক শেরপুরের সম্পাদক কাকন রেজা জানতে চেয়েছেন, কী এমন কারণ রয়েছে ফাগুনকে এভাবে খুন হতে হলো?

গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করেন সাংবাদিকরা। এ সময় ফাগুন হত্যার কারণ জানতে চান কাকন রেজা।

গত ২১ মে ফাগুন ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে খুন হন। এ ঘটনায় হত্যা মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কূল-কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। ফাগুনের পরিবার ও সহকর্মীদের দাবি, এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা চোখে পড়ার মতো না।

ফলে মামলার তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। ফাগুনের হত্যারহস্য উন্মোচন ও হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করতে মানববন্ধনের আয়োজন করেন সাধারণ সাংবাদিকরা।

মানববন্ধনে ফাগুনের বাবা কাকন রেজা বলেন, ‘আজকের মানববন্ধনে একজন বাবা হিসেবে বিচার চাইতে শুধু আসিনি। আমি শুধু আমার ফাগুনের জন্য না, অন্যান্য ফাগুনের জন্য এসেছি। আমার এক ফাগুন চলে গেছে, কিন্তু আরো অসংখ্য ফাগুন রয়েছে, তারা যেন এভাবে চলে না যায়।’

তিনি বলেন, ‘একজন বাবার জন্য এই অবস্থায় কথা বলা কষ্টকর। একটা কথাই বলতে চাই, আমরা কি শুধু জানতে পারি, কেন ওকে হত্যা করা হলো? কী ওর অপরাধ ছিল? কেন ওকে এভাবে খুন করা হলো। আমরা যারা গণমাধ্যমের কর্মী আছি, তাদের কাছে আমার অনুরোধ, আমরা নিজেরা কী করছি আসলে, একটা ঘটনা ঘটছে আর আমরা ভুলে যাচ্ছি।

আমাদের অনেক সহকর্মী মারা গেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন, আমরা কি এখন মনে করতে পারব? আমাদের মনেও নেই। এই যে আমাদের ফলোআপ নেই, আমাদের নিজস্ব কার্যক্রমটা নেই। এক সাগর-রুনির কথা আমরা মনে রেখেছি, কিন্তু সবার কথা মনে রাখিনি। সবার কথা যদি মনে রাখতাম, তাহলে হয়তো কিছু হতো।’

কাকন রেজা বলেন, ‘ফাগুনের মতো অনেক তরুণ সাংবাদিক রয়েছেন। এখানে আমার সামনেই অনেকে রয়েছেন, এদের যদি কিছু হয়, আমরা যদি তাদের মনেই না রাখি, তাহলে অনেকেই চলে যাবে। গণমাধ্যমকর্মীদের আমরা যেন ভুলে না যাই, আমরা যেন তাদের মনে রাখি, মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি, তাহলে হয়তো কিছু হবে। আমরা হয়তো একটা পর্যায়ে বিচার পাব। চারপাশে আমরা যা দেখি, তাতে আমরা হতাশাই দেখি, কিন্তু তবুও আমাদের চেষ্টা করতে হবে।’

বিচারের আশা বিন্দুমাত্র না থাকলে এই সমাজ কোথায় যাবে: আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘পৃথিবীতে অনেক রকম ভার আছে, কিন্তু সন্তান হারানোর ভারের কাছে এমন বেদনাদায়ক ভার মানুষের জীবনে আর নেই। আজকে আমাদের এক সন্তানহারা পিতা রয়েছেন, এটা পিতামাতারই ভার নয়, আমরা যারা আত্মীয়-স্বজন, আমরা যারা সাধারণ নাগরিক, আমি মনে করি, এই ধরনের মৃত্যু, এই ধরনের নিঃশব্দ পরিস্থিতি সবার জন্য বেদনাদায়ক।’

বরেণ্য এই শিক্ষাবিদ বলেন, ‘এই ফাগুনের বাবা বললেন, আমরা ভুলে যাই, মৃত্যুর পর মৃত্যু ঘটে, আমরা ভুলে যাই। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, তা নয়। মৃত্যু এখন এত বেশি যে, তা আমাদের মাথায় ধারণক্ষমতায় ধরছে না। এত বেশি মৃত্যু হচ্ছে, এত বেশি খুন হচ্ছে কিন্তু খুব কম জায়গাতেই বিচার হচ্ছে। আর বেশিরভাগ জায়গায় অপরাধীরা নির্বিঘ্নে ও স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এটা আমাদের দেশের দৈনন্দিক ঘটনা। এই সংখ্যা এত বেশি যে, সাংবাদিকদের পক্ষেও তা কাভার করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।

তবুও আমরা জনগণের পক্ষ থেকে দাবি করব, এই ধরনের মৃত্যু, এই ধরনের অপরাধ, এই ধরনের রহস্যাবৃত ঘটনা যদি কোনোরকম আলোর সামনে এসে না দাঁড়াতে পারে, আমরা যদি এগুলোকে খুঁজেই বের করতে না পারি, এর বিচারের যদি বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা না থাকে, তাহলে এই সমাজ কোথায় যাচ্ছে, এই সমাজ কোথায় যাবে। এ জন্য আমি মনে করি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আমাদের বিচার অনেক গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে, সরকারকে গ্রহণ করতে হবে, জনগণকে গ্রহণ করতে হবে। না হলে এই যে সম্ভাবনাময় মেধাবী একজন তরুণ জীবন হারালো, সারাদেশে প্রতিনিয়ত শুধু সাংবাদিক নয়, সাধারণ মানুষও জীবন হারাচ্ছে। সাধারণ মানুষের অবস্থা কি ভালো? বিভিন্ন ঘটনার ছবি-ভিডিও আমরা পত্রিকায় টেলিভিশনে দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু বিচারের খবর আমরা পাচ্ছি না।’

প্রতিটি হত্যা, খুন, অপরাধের বিচারের জন্য সরকারকে আরও উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ঢাকা রিপোটার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি ইলিয়াস হোসেন বলেন, ‘একটু আগেই শুনছিলাম, ফাগুনের বাবা বলছিলেন, প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সাংবাদিক নির্যাতন হচ্ছে, হত্যা হচ্ছে। আর আমি ডিআরইউয়ের সভাপতি হিসেবে প্রতিদিনই হত্যা, নির্যাতন, হয়রানির বিচার দাবি করছি। প্রতিদিনই বিচার দাবি করতে করতে ক্লান্ত, তবুও থামছে না এসব অপকর্মের, হত্যাযজ্ঞের।’

তিনি বলেন, ‘আপনারা জানেন, ফাগুন একেবারেই সম্ভাবনাময় মেধাবী একজন তরুণ সাংবাদিক ছিলেন। এখনো বলতে গেলে তার পরিপূর্ণ বিকাশই হয়নি, কেবলই শুরু। এই অবস্থায় দুষ্কৃতিকারীরা তাকে হত্যা করল, একটা মামলাও হলো। কিন্তু এক মাস পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো খোঁজখবর নেই।

আপনারা জানেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে একটা সহজ কথা বলে দেয় যে, এটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমি প্রশাসনকে হুঁশিয়ার করে বলে দিতে চাই, আপনারা বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলতে বলতে কিন্তু জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন।’

মেধাবী তরুণ সাংবাদিক ফাগুনের নিহতের ঘটনা অনেক সময় পার হয়ে গেল। কিন্তু এ হত্যার কোনো রহস্য বের করতে পারছেন না পুলিশ। তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন ডিআরইউ সভাপতি।

তিনি ফাগুন হত্যার রহস্য উন্মোচন ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, আমরা সংবাদকর্মীরা সামান্য কাজ করি, কাজ শেষে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে চাই। কিন্তু তাও হচ্ছে না। তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা দাবি করেন।

ভবিষ্যতে আরা জোরালোভাবে কর্মসূচি দেওয়া হবে বলেও জানান ডিআরইউয়ের সভাপতি।

মানবন্ধনে আরো উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক এম এ নোমান, রফিকুল ইসলাম রঞ্জু প্রমুখ।

ইহসান রেজা ফাগুন অনলাইন পোর্টাল প্রিয়.কমের ইংরেজি বিভাগের সাবেক সহ-সম্পাদক। এক সময় চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নিয়েছিলেন তিনি। গত ২১ মে নিউজ পোর্টাল জাগো নিউজের ইংরেজি বিভাগের যোগদানের বিষয়ে সাক্ষাৎকার দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর থেকেই বাড়ির সঙ্গে ফাগুনের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরে রাতে  জামালপুরের রানাগাছা নামক স্থানে ঢাকা-জামালপুর রেললাইনের পাশে তার মরদেহ পাওয়া যায়।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY