লেখক ও কবি নাসরিন আক্তার এর জীবনবোধের অণুগল্প “লাল পিঁপড়ে ”

0
71
লেখক ও কবি নাসরিন আক্তার

লাল পিঁপড়ে

                     নাসরিন আক্তার।

বেলা বাড়ার সাথে সাথে লাল পিপড়ের সারিটা দলে ভাড়ি হচ্ছে , কি করে যে ওরা গন্ধ পেয়ে যায় ! যে রহিমা ওদের পাঁ দিয়ে পিষে মারতো , চুলা থেকে গরম ছাঁই তুলে পথ আটকাতো ,আজ তারি শরীরের গন্ধে ওরা ছুটে চলেছে প্রতিশোধের নেশায় । পেট পুরে খাবে আজ , কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে রহিমার চামড়ার নিচে জমে থাকা চর্বি টুকু । আহা্ কি আনন্দ ।
ছখিনা বিবির কোলে অনবরত কেঁদেই চলেছে দেড় বছরের শিশু হাতেম । বার বার বায়না ধরছে মার কাছে যাবার , কিছুই খাওয়াতে পারছে না । ঘ্যান ঘ্যান করেই চলেছে দাদীর কোলে চড়ে । পাশের বাড়ির রহিমদ্দীর বউ এসে দরজায় দাড়ায় ,
— চাচিআম্মা হাতেম কাঁন্দে ক্যা ? হের মায় কই ?
ছখিনা বিবি ঘরের কোনে জড়ো করে রাখা খড়ের গাদাটা ঠিক করে রাখতে রাখতে উত্তর দেয়
-গোস্সা কইরা বাপের বাড়ি চইল্লা গেছে হেয় ।
রহিমের বউ পাল্টা প্রশ্ন করে .
–ভাইজান হেরে আইজ রাতেও মরছে ?
ছকিনা বিবি বিরক্ত হয়ে বলে
– যাও বউ বাড়িত যাও , নিজের সংসারের কাম কাইজ করো গিয়া ।
গাঁয়ে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে রাত হয়ে যায় , নিবু নিবু কুপির আলোতে মা ছেলে খেয়ে নেয় । মজিদ খাওয়া শেষ করে হাত ধুয়ে বিড়ি ধরায় , ছখিনা বিবি ছেলের উদ্দেশ্যে বলে
– অহন বাইরে যাওন দরকার নাই , কাম আছে ।
মজিদের মনে পরে যায় আজ রাতের কাজের কথা । ঘরের পালায় হেলান দিয়ে আস্তে আস্তে বিড়ি টেনে চলে রাত গভীরের প্রতীক্ষায় ।
শীতের রাতে গ্রাম–গঞ্জে রাত ১০ টা না বাজতেই চরিদিকে শুনশান নিরবতা নেমে আসে ।ছখিনা বিবি ঘরের কোনে রাখা খড়ের গাদা সরিয়ে রহিমার লাশটা বের করে । পুরো লাশের গায়ে লাল পিঁপড়ে ছেয়ে আছে ,কোথাও হাত দিয়ে ধরার উপায় নেই । বিড় বিড় করে ছখিনা বিবি , হারামজাদী মইরাও শান্তি দিলো না ।
মা ছেলে টেনে -হেচড়ে লাশটা বাড়ির পিছনের জঙ্গলে নিয়ে আসে , সাথে আনে এক গাদা খড় আর ছোট একটা বোতলে করে কিছুটা কেরোসিন । খড়ের গাদায় কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় লাশের গায়ে । খড়ের আগুন কিছুক্ষন দাউ দাউ করে জ্বলে নিভে যায় । আধপোড়া লাশের দিকি তাকিয়ে ছকিনা বিবি ছেলে কে বলে , ল’এইবার জটপট গলায় দড়ি বাইন্দা গাছের লগে ঝুলায়া দে । কাজ শেষ করে হাত মুখ ধুয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ি ফিরে মা ছেলে ।
ঘরে ঢুকেই ছখিনা বিবি এক খিলি পান মুখে দেয় । ছেলের উদ্দেশ্যে বলে যা এইবার হুইত্তা পর । নাতীর মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলে , হাতেমের লাইগ্যা তুই ভাবিস না আমি আছি না , এই বার তরে তিরিশ হাজার ট্যাহা লইয়া বিয়া করামু । মাগির দেমাক বাড়ছিলো -কইলাম বাপের বাড়ি থাইক্কা দশ হাজার ট্যাহা আইন্না দে ,মুখে মুখে তক্ক করে ,কয় পারুম না বাপে কৈ পাইবো ? এইবার মজা বুঝ , শিয়াল শকুণে ঠুকরাইয়া ঠুকরাইয়া খাইবো ।
ত্রিশ হাজার টাকা আর নতুন একটা নারী শরীরের গন্ধে নেশাখোর মজিদের চোখ জোড়া রাতের আঁধারে বিড়ালের চোখের মত চক চক করে উঠে ।

LEAVE A REPLY