অন্ধকারে স্পষ্ট  দেখতে পাচ্ছিলাম আকাশে মেঘ জমেছে….বৃষ্টিকে থামাও।  লাকী ফ্লোরেন্স কোড়াইয়া এর ভিন্নমাত্রার  ধারাবাহিক  রহস্যময় গল্প ‘’ তিনি একজন’’

0
187
লাকী ফ্লোরেন্স কোড়াইয়া

      তিনি একজন

                       লাকী ফ্লোরেন্স কোড়াইয়া

এরপর আমি আর পিছন ফিরে তাকাইনি।নানান জনের নানান কথা।রাস্তাটা ভাল না।অশুভ শক্তির প্রভাব আছে।কারো কথা কানে তুলিনি। একে তো অপরিচিত জায়গা,তার উপর আবার  সন্ধ্যার সময়। এই বুঝি সামনের জঙ্গলটা পার হওয়ার আগেই সূর্যকে গ্রাস করবে অন্ধকার। আমার সঙীরা সাহসী নয,কিন্তু  হাঁটতে পটু!!! এই কাজটিতে আমি বড়ই দৃর্বল।হঠাৎ বাঁ দিকে চোখ পড়তেই খুশি হলাম।এই যে কালী মন্দির।তাহলে বাসস্ট্যান্ড আর দূরে নয় রে!সাথে সাথেই গীতা বলে ওঠল,হ্যা, তা তো দেখলাম।আরো কত কিছুই তো দেখব!রাস্তায় লোকগুলি তো বলেই দিল।রুহি বাধা দিয়ে বলল,শুধু কি আমরাই যাচ্ছি নাকি? আরো কত লোকই তো যাচ্ছে এ রাস্তা দিয়ে।সীতা বলল,ওরা তো য্যাচ্ছে বাসে।আমাদের মত তীর্থ যাত্রী হয়ে নয়। আমি বাধা দিলাম না।মনে মনে ভাবলাম,ওদের কথায়  নির্জন এই জঙ্গলের। পরিবেশ একটু  মেতে থাকুক।আশেপাশে  যদি তেনাদের(অশুভ শক্তি)আনাগোনা থাকে তবে তেনারা ও সাবধান হয় যাক ওদের মৃদু আলাপনে।আর সময়টা ও পার হয়ে যাবে।এতক্ষণে সাজেক মুখ খুলল,তীর্থযাত্রী তো বটে-ই।এই আমাকে দেখ।নিজের ব্যাগ তো বহন করছি-ই আবার আমাদের লেখিকার  ব্যাগ ও আনন্দের সহিত বহন করছি।তবুও নীরবে পথ চলছি আর মনে মমনে বলছি, এই পথ যদি না শেষ হয়,তবে……সাজেককে থামিয়ে দিয়ে শান্ত স্বভাবের অসিত বলে উঠল,তা তো করবেই।

লেখিকা বললে তো তুই তোর লুকানো কলিজাটা ও দিয়ে দিতে পারবি,সে কথা কে না জানে?এই ভালো হবে না বলছি-সাজেক দাঁড়িয়ে  গেল।অসিত কিছু একটা বলতে যাবার আগেই বাসস্ট্যান্ডের আলো চোখে পড়ল। আমরা এগিয়ে যেতেই কয়েকজন আমাদের দিকে জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকালো। সাজেক পাঁচটি টিকিট কেটে আনল।বাস আসতে দেরি হওয়াতে সবাই চা খেতে চাইল।সাজেকের হাত থেকে  ব্যাগ নিয়ে পানির বোতল আর এক প্যাকেট বিস্কুট  বের করে ওদের দিলাম।আর এই খাবারের ব্যাগ রাখা নিয়েই বেচারা সাজেককে কত অপবাদই না সহ্য করতে হয়।কোন বিষয়ে লেখার জন্য ছুটির সময়টা বেছে নিই যেন  ওরাও আমার  সাথে যেতে পারে।আমার ও সময়টা  বেশ ভালোই কাটে।এ সময়টাতে  অতি আনন্দের সাথে সাজেক আমার খাবারের ব্যাগ রাখে।আজোও তাই হল।

আমি  বাইরের খাবারে অভ্যস্ত না হওয়াতে ওদের থেকে দুরেই রইলাম।মিনিট  দশেকের মধ্যেই বাস চলে এল।সবাই উঠে গেলাম বাসে যাত্রী সংখ্যা ১৫/২০ হবে।আমার পাশের সিট খালি।জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম।বাস চলতে শুরু করল।এর মধ্যে অনেকেই ঝিমুতে শুরু করল।আগেই জেনে নিয়েছিলাম আমাদের পৌঁছাতে প্রায় চারঘন্টা লাগবে।তার মানে আমাদের বাংলোতে পোঁছাতে রাত ১০:০০ টা বেজে যাবে।আগের বাসটি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমরা অনেক পিছিয়ে গেলাম।যা  হোক।যা হবার হয়ে গেছে।এখন সময়ের বিলাপ করে লাভ নেই।

ঘড়ি দেখলাম।সময় ৭:২৫ মিনিট। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম।আকাশটা কেমন যেন অচেনা মনে হতে লাগল।অন্ধকারে স্পষ্ট  দেখতে পাচ্ছিলাম আকাশে মেঘ জমেছে।দুইপাশে ঘন জঙ্গল। কখনো কখনো গাছের ফাঁক দিয়ে হালকা ভাবে রাতের আকাশের অলংকার  আমাদের একমাত্র উপগ্রহ ঐ চাঁদখানা দেখা দেয়।মনে মনে বললাম ,জেগে থাকো চাঁদ।মেঘের আড়ালে নিজেকে হারাতে দিও ননা।এই অন্ধকারে আশার  আলো দেখাও।এখনিই নিভে যেও না।বৃষ্টিকে থামাও। দারুণ আপনার চিন্তা ভাবনা-পাশ থেকে একটি অপরিচিত  কণ্ঠ স্বর শুনে চমকে উঠলাম।এতিক্ষণে বাইরে তাকিয়ে থাকায় বুঝতে পারিনি আমার পাশে কেউ বসেছে।তাকিয়ে দেখলাম একজন ভদ্রলোক বসা।বয়স অনুমান করা কঠিন।সহাস্যমুখ আর অদ্ভুত দৃষ্টি।

প্রথম দর্শণে ভাল লাগার মত একজন তিনি।আর তিনি যে জ্ঞানী, দৃষ্টি যেন তার জলন্ত প্রমাণ। আমালে ঘাবড়ে  যেতে দেখে তিনি বলে উঠললেন,সরি এভাবে হটাৎ কথা বলার জন্য।তাঁর পরিচয় না জনতে চেয়েই জিজ্ঞেস করলাম,আমার চিন্তা-ভবনার কথা আপনি জানলেন কি ভাবে?তিনি হাসলেন।অদ্ভুত  সুন্দর হাসি।তাঁকে চেনার বা মনে করার চেষ্টা করলাম-কখনো কোথাও  দেখেছি কিনা!পারলাম না।আপনি চাঁদের সাথে কথা বলছিলেন।দারুণ!আমিও তাই করতাম এক সময়।কেমন যেন অনেকটা ঘোরের মধ্যে যেন কথা বললেন তিনি।অদ্ভুত  ব্যাপার।

আমি ভয় পেয়ে গেলাম।আমার মনের কথা উনি জানলেন কি ভাবে?উনি কি মানুষ!নাকি রাস্তায় যা শুনেছি তিনি সেই রকমের কেউ!!উনাকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হল।আবার হাসলেন  তিনি।বললেন,অবাক হবার কিছু নেই।আপনি যেটা মনে মনে ভাবছিলেন অজান্তেই সেটা  মুখ দিয়ে বলছিলেন।কিন্তু আপনি খেয়াল করেননি।আমি যুক্তি খাটালাম,না না তা হবে কেন?এবার তিনি মহা জ্ঞানী শিক্ষকের  মত  বললেন,প্রকৃতির সাথে যখন মানুষ একাত্ম  হয়ে যায়,তখন অনেক কিছুই সম্ভব হয়।তখন প্রকৃতি তার কাছে একটি জীবন্ত সত্তা হয়ে উঠে। সে এক ধ্যানের আর জ্ঞানের সমন্বয়েনানুষ বাস্তবতা থেকে নিজেকে অনেক দূরে সরে যায়।আপনার বেলাতে ও তাই হয়েছে।সুতরাং  অস্বীকার  করার কোন উপায় নাই আপনার।আমি মন্ত্র মুগধ হয়ে শুনছিলাম তাঁর মধুর বচন আর মেনেই নিলাম তিনিই সঠিক।ভাবছি এত সাবলীল  ভাষায় কথা বলা এই সুদর্শণ পুরুষ মানুষটি কে?বাংলার শিক্ষক?নাকি দর্শণের নাকি মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক?আমার ভাবনার ছেদ ঘটালেন তিনি।জানতে চাইলেন,লেখালেখি করেন? ছোট্ট করে উত্তর দিলাম,চেষ্টা  করি।হাসলেন তিনি।আমি মুগধ  হলাম তাঁর হাসিতে।মানুষের হাসি এত সুন্দর হয়? প্রশ্ন করলাম নিজেকে।জানতে চাইলাম,কি করে বুঝলেন?কিছু মনে করবেন না,কিছুক্ষণ  আগে আপনি কাউকে মেসেজে লিখেছিলেন- এবারের লেখাটা দিয়ে তোদের চমকে দিব।সম্পুর্ন অন্যরকম একটি লেখা উপহার দিব পাঠকদের।কথা থামিয়ে দু:খ প্রকাশ করলেন মেসেজটা পড়ার  জন্য।

উনি লেখাটা পড়েছেন এটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না।কিন্তু উনি পাশে বসেছেন অথচ আমি খেয়াল করিনি সেটাই আমার কাছে আশ্চর্য জনক মনে হল।ভাল লেখেন আপনি,ঠিক  কিনা?

এবার আমি মৃদু হাসলাম।বললাম,সেটা পাঠকের উপর ছেড়ে দিয়েছি।আমি তো পাঠক নই,তাই তো জানতে চাইছি।তবে এবারে আপনার লেখাটা সত্যি  দারুণ চমক দিবে।আমি আবার হাসার চেষ্টা  করলাম।পারলাম না।তিনি সেটা লক্ষ্য  করলেন।উপদেশের স্বরে বললেন,মনের উপর বা ব্রেনের  চাপ প্রয়োগ করে কোন কিছু করা উচিৎ নয়।যেমন চিন্তা করে গল্প,কবিতা বা উপন্যাস  লেখা যায় না।এক্ষেত্রে কলম চলে আপন গতিতে।আবার কাউকে উপহার দিতে গেলে ভেবে-চিন্তে দিতে হয়।অনেক চিন্তা করেও প্রয়োজনীয় কথা মনে করতে পারি না।

আবার কখনো অপ্রয়োজনীয় কত কথা মনে পড়ে,কত স্মৃতি মনে ভেসে ওঠে।পৃথিবীতে অনেক সত্য আছে যা না জানাই ভাল,আবার সব প্রশ্নের উত্তর পেতেই হবে এমন ভাবাটা ও ভুল। অদ্ভুত  জীবন মানুষের।কথা  শেষ হতেই  জোরে ব্রেক কষলো বাস।।চালক সাজেককে লক্ষ্য  করে কিছু বলল।সাজেক চালকের কাছের সিটেই বসেছিল। উঠে  দাঁড়িয়ে  আমাদেন ইশারায় ডাকল সাজেক।দাঁড়িয়ে পাশ ঘুরে জানালার পাশে রাখা হাত ব্যাগটা তুলে নিয়ে বাঁ পাশে তাকাতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস  করতে পারলাম না। বিদ্যুতের শক খাওয়ার মত অবস্থা হল!        (চলবে……)

LEAVE A REPLY