তারুণ্যের লেখক ও কবি আনজানা ডালিয়া এর হৃদয় বিদারক অনুগল্প “ভালোবাসার ফসিল ”

1
111
তারুণ্যের লেখক ও কবি আনজানা ডালিয়া

ভালোবাসার ফসিল

                                       আনজানা ডালিয়া

জমকালো এক হলুদের অনুষ্টানে তাদের পরিচয়।প্রথম দর্শনেই খুন।একজন আধুনিকতার ষোলকলায় পরিপুর্ন ডাকাতিয়া নারী শোভা।অপরজন মধ্যবিত্তের আঁটসাট ছোঁয়ায় আমুল ঋদ্ধ যুবক সিহাব।শোভা বিত্ত বৈভবের শ্রোতে ভাসা সিটি কলেজের ছাত্রী আর সিহাব শশব্যস্ত টিউশন বিক্রী করা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র।
রূপ আর রুচির বিচারে শোভা অনন্যা।বলা যায় লাখে একটা।তার পটলচেরা চোখ, কমলাকায় তনু,মেঘমেদুর কেশ,সৃজিত ব্যাক্তিত্ব আর চালচলন যেন কোনো স্বর্গচ্যুত দেবীর মর্তাগমনসদৃশ।অপরদিকে মেধার বিচারে সিহাব দ্বিতীয় শেরে বাংলা।ব্যবসা প্রশাসনের ছাত্র সিহাব বরাবরই সেমিষ্টার সেরা।ডাকসাইটে পরিচিত।

রমনীমোহন ও বটে।আর এ মোক্ষম রমনীমোহন শক্তি দিয়েই সে অকুস্থল উৎসবের সর্বজনাকর্ষক ও চোখ তাঁতানো সুন্দরী শোভার অনুরাগশ্রী নজরে চলে আসে।সিহাব ও ঠিক পায় তার মর্মরে শোভা যেন হাই হিলের খটখট আওয়াজ তুলে আবছা ছন্দে হাটছে।তবে ভদ্রগোছের শিষ্টাচার শীলিত।সিহাব থাকে নীরব,অনগ্রসরমান।তার চিন্তনে বোধ জাগে যে সে সর্বস্বই বামন।অতএব চাঁদের পানে হাত নয়।কিন্ত শোভা যে নাছোড়বান্দা।

অতএব সেই থেকে শুরু।হৃদয়ের আঁকুপাঁকু উঠে আসে মুঠোফোনে।চলে হৃদয় কর্ষন।জানতে চায় তারা জীবনকে মাপতে চায় মর্ম কুহরের গভীরতা।বসন্ত জাগা রজনীর নিঃসঙতা কাটে ফোনালাপে -নিস্পন্দ পৃথীবির নিদ্রিত চৌহদ্দি জুড়ে চলে তাদের তৃষিত স্বপ্নের বিচরন।প্রণয়ের দুরত্ব গুছিয়ে তারা লতাগুল্মের মতো ঝাপটে ধরে একে অন্যকে। পৌছে যায় প্রানের কাছাকাছি।বিশ্বাসের খুটি গাড়ে তারা স্বপ্নের শেষ সিমানায়। আদিম তৃষ্ণার আধিক্য কামনায় তারা যেন বনে যায় লোকালয়ের গাঁটবাঁধা পরিপুরক।এভাবেই চলে তাদের অবগাহন আর আবেগঘন রমনাচরন।শোভা জিগ্যেস ছড়ায় কবে আসবে তাদের সামাজিক পরিচিতি আর কবেই বা সত্যতা পাবে তাদের আড়ালের মুখোশ।তখন সিহাব বুলি আওড়ায়- এইতো কদিন।

অতঃপর বাঁধা হবে স্বপ্নের ঘর। রাঙানো হবে যাযাবর জীবন, সাজানো হবে শাশ্বত সংসার।অতঃপর বাউরী হাওয়ায় লালিত শোভা অবিমিশ্র খোয়াবে বুক বাঁধে।অনেক চড়াই উৎরাই মাড়িয়ে সিহাব অর্জন করে স্নাতকোত্তর সনদ।চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তার অভাবনীয় কৃতিত্বের ছাপ।সাথে সাথে তার মাঝে ভর করে এক আড়ালিকরন প্রবনতা।ইদানিং শোভার কাছে তার সমভিব্যাবহার কেমন জানি ঘোরময় ঠেকে।অকস্মাৎ সে উধাও তল্পিতল্পাসহ সিহাব যেন কায়াহীন নিরুদ্দেশ।শোভা তাকে খুঁজে ফেরে সর্বত্র।আর নিরাশ হতভম্ব হয়।কোথাও নেই তার স্বপ্নদ্রষ্টার টিকিটি।ইতিমধ্যে তার অধ্যুষিত নিরাপদ অস্তিত্ব গেঁড়ে বসেছে এক নুতন অস্তিত্বের বীজ।হয়তো কিছুদিন পরেই তার আগমন ঘটবে মহীরুহ হয়ে।দেখবে ধরিত্রি।কিন্তু স্বীকৃতি দেবে কে? সমাজ যে রব ছড়াবে।শোভা ভেবে পায়না কুল।হঠাৎ সিটি কলেজের ঠিকানায় দুই লাইনের চিরকুট – আমি এখন কানাডায়।পারলে ক্ষমা কোরো।

চোখ মুদতেই শোভা ঢলে পড়ে সিঁড়িতে।ওখান থেকে ঠাঁই হয় বোন নোভার বাসায়।রাতে ব্যথা আসে।মাতৃজঠর খুলতে থাকে তার প্রসবন মুখ।শেষ রাতে কেঁদে উঠে এক ছোট শিশু।অপবাদ ঢাকতে কালো আঁধারির ভোরেই অশুচি অস্তিত্বকে নির্বাসন দেয় নর্দমায়।মায়াবিদ্ধ এক দরদী অশুচি বীজটিকে পাঁজরে চেপে পৌঁছে দেয় ক্লিনিকে।শোভা কালো কাঁচের ফোঁকর গলে নিঃশব্দে সব হজম করে।একসময় নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনা শোভা।সেও ছুটে যায় ক্লিনিকে। শিশুটিকে ঘিরে ভীড়। শোভা ভীড় ঠেলে তাকায়।সহসাই বুকটা নীল কষ্টে জমে উঠে।কিন্তু মুখ ফুটে বেরোয়না এ আমার ভালোবাসার ফসিল।এ আমার নয় মাস শরীরে ধরে রাখা সাতরাজার ধন।

1 COMMENT

  1. বাস্তবতা এমই।তবে ইদানিং মেয়েরা সচেতন হচ্ছে।
    শোভার মত এমন ভুল ভালোবাসায় কেউ যাতে আর না জড়ায় এটাই কাম্য। সর্ব‌োপরি স্বার্থক লেখিকা।

LEAVE A REPLY