প্রথম হৃদ স্পন্দনের শব্দ, প্রথম উষ্ণতার ছোঁয়া মা, বোস্টন থেকে ডঃ মিলটন রহমান লিখেছেন “মা’র কাছে যাচ্ছি”

0
1452

মা’র কাছে যাচ্ছি

                             ডঃ মিলটন রহমান

 

মনের বৃষ্টি ঝরাতে যেমন আকাশ ভারি লাগে না, তেমনি আমার মন। মন ভারি থাকলেই হোল, কাঁদা যায়। কখনও মনে মনে কাঁদি। বাবা- মা বেঁচে থাকবেন না মনে করে ইদানীং একটু একটু করে অগ্রিম কেঁদে রাখি। নিজেকে নিঃসঙ্গ অসহায় মনে করে কাঁদি। ছবিতে কোন একটা দুঃখের ঘটনা দেখলেও ঝর ঝর করে কাঁদি। এই কাঁদাটা আসলে বাধ ভাঙ্গার মত। মানে, একটা উছিলায় কেঁদে বিভিন্ন কারণে ভারি হয়ে থাকা মনটাকে হালকা করার একটু চেষ্টা। আনমনে গাড়ি চালানোর সময়ও কাঁদি। কারণ রাস্তাগুলো এতো পরিচিত যে অটো –রিফ্লেক্সের মত ঠিক যায়গায় পৌঁছে যায়। খুব একটা ভাবতে হয় না। ফুরসৎ পেয়ে ব্রেনের নিউরন গুলো আড্ডায় মেতে ওঠে। হার্ড ডিস্কের গভীর থেকে সৃতিগুলোকে টেনে আনে। টক-ঝাল-লবন মাখিয়ে কীর্তন খোলা নদীটির পাশে দেখা চানাচুর বিক্রেতার মত খেলে যায়। “কি পাইলাম, কি চাইছিলাম আর কি হইলো” মেলাতে চেষ্টা করে। মৃত্যু ভাবনা, ইহকাল-পরকাল, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ কল্পনা আর সমস্ত জীবন নাটকের জঞ্জালে জর্জরিত মন এখন অস্থির। মিড লাইফ ক্রাইসিসে ভুগছি কিনা সন্দেহ আছে। তবে মধ্য বয়সে মানুষ হঠাৎ কেন ধার্মিক হয়ে যায়, সংসার ত্যাগী হয়, হাঁটুর বয়সী কাউকে বিয়ে করার মত পাগলামি করে এখন বুঝি।

সবার হয় কিনা জানিনা, আমার খুব টেনশন হয়। সময় শেষ, কাজ অনেক বাকী। পরীক্ষার খাতা যদি স্যার (সৃষ্টিকর্তা) আগেই কেড়ে নেন? বাবা-মা’দের জেনারেসনের মৃত্যু সংবাদ পাচ্ছি ইদানীং। অসময়ে ফোন বেজে উঠলেই বুকটা ধক্‌ করে ওঠে। আজকাল নবুয়ত প্রাপ্তির মত মন বলছে যে মানুষ আসলে মরে যায় না। বেঁচে থাকে অন্যের মনে, আর জেনেটিক্যালি বেঁচে থাকে তার বংশধরদের মাঝে। অমরত্বের সন্ধানেই তবে কি এই বংশবৃদ্ধি? যা হউক, আমার জীবনেও স্বাদ আহ্লাদ বলে কিছু আছে। না পাওয়ার মান অভিমানও আছে, মা’র কাছ থেকে দূরে থাকার যন্ত্রণাও আছে। আড়াই বছর হয়ে গেল মা’র কাছে যাওয়া হয় না। ঢাকা’র গরম আর ডেঙ্গুর ভয়ে গ্রীষ্মটা এড়িয়ে যায়। ক্রিস্টমাসে টিকেটের দামও আকাশ ছোঁয়া। বাচ্চা ছেলের মত ঘোঁত ঘোঁত করি। সংসার-চাকুরী-বাচ্চাদের স্কুল সব মিলিয়ে সবার আর একসঙ্গে যাওয়া হয় না। তবে এবার না নিলে সমস্ত জমানো ছুটি বাতিল হয়ে যাবে বলে দিল অফিস। এক বন্ধু বলেই ফেললো, “পোলাপান ভাবীর উপর চাপাইয়া দিয়া একলা যাস কেন? এক লগে গেলেই তো পারস”। বুকে লোম থাকলেও এজিদের মত টিকেট কেটে ফেললাম।

ইস্তাম্বুলে মাত্র দুই ঘনটার ট্রান্সজিট। তাড়াতাড়ি বাংলাদেশ গামি প্লেনের জন্য নির্দিষ্ট গেটের দিকে হাঁটা ধরলাম। কাছাকাছি যেতেই একটা ছোট মেয়ে কোথা থেকে যেন ছুটে আসলো। পিছনে পিছনে তাদের বাবা একেবারে খাঁটি বাংলায় “কই যাও কই যাও” বলতে বলতে ধরার চেষ্টায় মগ্ন। বাবা-মেয়ের চির চেনা ছবিটা যেন আদিকাল থেকে একই থেকে গেল। গেটের দিকে যত এগোচ্ছি বাংলাদেশের মত গমগমে শব্দটাও তত বাড়ছে। সাদাদের দেশে রান্নার গন্ধ শুঁকে যেমন বলে দেয়া যায় বাংলাদেশীদের এপার্টমেন্ট কোনটি ঠিক তেমনি শব্দই বলে দিচ্ছে আমি ঠিক দিকেই এগোচ্ছি। দেখলাম একজন মা তার বাচ্চাকে দুধ খাওয়াচ্ছে। বেশীরভাগই কথা বলছে। কেউ কেউ শুনে যাচ্ছে। ক্লান্ত মুখাবয়বে কোথায় যেন খুশীর ঝিলিক সবার মধ্যে। দেশে যাচ্ছে বলে কি? একপাশে আলাদা করে রাখা কয়েকজনের গলায় দেখলাম বিশেষ ধরণের কার্ড ঝোলানো। মন শুধু ভারি তাদেরই। ধরা পরা অবৈধদের দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে হয়তো। ওদেরকে ইংগিত করে একজন বিরক্ত হয়ে বলল, “এই বেকুবগুলাই আমাগোর মান-সম্মানডা খাইলো”। কেউ একজন বলল,”দেশটার বারোটা বেজে যাচ্ছে”। কেউ কেউ বলছেন, “আরে ভাই বিমানে সার্ভিস যে কত খারাপ”, “কবে ফিরা আসবেন”, “আপনার কি মনে হয়”, “দাদারাই তো সব” সহ বাঙালীর অজস্র অভিযোগের তীর। সত্য সত্যই যেন ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টের বোর্ডিং ব্রিজটা একখণ্ড বাংলাদেশ হয়ে গেছে।

হাসিহাসি মুখ করে বসে পড়লাম। বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষা শুনছি। মানুষের উচ্ছলতায় আর সুখী মুখ দেখে মন রাঙাচ্ছি। দেখছি কথার তোড় আর গলার স্বর উঁচু করে কীভাবে একজন আরেকজনের কাছ থেকে ফ্লোর কেড়ে নিচ্ছেন। মনে হল বলতে না দিলে বাঙালীর হার্টফেল হয়ে যেতে পারে।পেটের ভাতও আর হজম হবে না বোধহয়। একটা বদ চিন্তাও মাথায় খেলে গেল। ধরুন ছোট খাট অপরাধে আর জেল জরিমানা না করে মুখ আর কানে মাসিক তালা মেরে দিলে কেমন হয়? এভাবে জাবর কেটে কেটে ভালই কাটছিল। হুঁশ ফিরল পাশের জনের প্রশ্নে, “ভাইজান কই থেইকা আইতাছেন”? অনাগ্রহ নিয়ে বললাম, “বোস্টন থেকে” । তবে ভদ্রলোক কোথায় থাকেন, কতদিন সেখানে আছেন ইত্যাদি বলে চললেন। আমার মনোযোগ নেই দেখে অনুযোগের সুরে বললেন,”ভাইজান, ডিস্টার্ব করলাম না তো?”। না পেরে এবার এক প্রস্থ  রেডিমেড মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে তুলে তাকালাম। কানাডার মানুষটিও নিজেকে একই গোলার্ধের বলে কানেক্ট করতে লাগলেন। সস্তা টিকেটের কথা, ফেব্রুয়ারির ঠাণ্ডার কথা, গরম গরম ট্রাম্পের কথা আরও কতো যে মিল! ভালই কাটছিল সময়। এক পর্যায়ে পাশের আরেকজন আমাকে ইংগিত করে বললেন, “ভাইজান কি ঢাকা হইয়া কলকাতা যাইবেন?” বাংলাদেশী বলতেই সে “সরি, ভাইজান, দাদাগো মত সুন্দর কইরা কথা কন বইলা কলকাতার ভাবছিলাম। আপনেরে দ্যাখলেই কেমন জানি চেনা চেনা লাগে। টিভিতে  বুদ্ধিজীবী গোর আলোচনায় কখনও আছিলেন নাকি?” দেশ হারিয়ে হয়ে গেলাম “কলকাতার লোক” আর চরিত্র হারিয়ে হলাম “বুদ্ধিজীবী”! একসাথে দুটো পচা খেতাবে মন বিগড়ে গেল। ঐ বদ ছেলেটাকে মনে মনে আচ্ছামত পিটিয়ে বাকী সময়টা রাশভারী হয়ে বসে থাকলাম।

প্লেনে উঠে মনটা আরও বিগড়ে গেল। দেখলাম আমার পাশের ছিটে সেই বদ ছেলেটা দাঁত বের করে হাসছে। আঠা না চাইতেই সৃষ্টিকর্তা আজকাল সুপার গ্লু কেন যে দিয়ে দিচ্ছে বুঝি না। ছিটের দিকে তাকিয়ে আরও বিরক্ত হলাম। মহাশয়ের শুঁটকা পটকা দেহটার জন্য তার ছিটটা যেন একেবারেই ছোট। হাতটা হাতল পেরিয়ে আমার ছিটের উপর রাখা, আর ঠ্যাঙখানা উঁচু করে সামনের ছিটে ঠেকা দিয়ে খালি খালি নড়া চড়া করছে। বসার ডাইন্যামিকটা মানে ডান না বাম কাঁতে বসলে ইকোনমি ছিটে রাজার মত বসা যাবে তা হয়তো বুঝে ওঠার চেষ্টা করছে। সোজাসাপ্টা তার হাতটি সরিয়ে নিতে বললাম। আমার জায়গা ছাড়লো ঠিকি কিন্তু নড়াচড়া থামালো না। একসময় সে ঘুমিয়ে পড়লো। তবে ঘুমের মধ্যেও থেকে থেকে তার হাত আমার দিকে তেড়ে আসতে থাকলো। তার ঘুমন্ত মুখ দেখে নিজ বাচ্চাদের কথা মনে পড়ায় মায়াও লাগলো। অত্যাচার মেনে নিলাম। বিমানবালা খাবার নিয়ে আসলে ছেলেটি জাগল। আমার দেখাদেখি কিনা সেও পাস্তার মেন্যুটি বেঁছে নিল। খাবার মধ্যেই হঠাৎ ছেলেটির গুঁতা খেলাম। রেস্ট রুমে যাবে কিনা ভেবে কান থেকে ইয়ার পিসটা সরিয়ে ঘুরে তাকালাম। অবাক করে দিয়ে বলল “পাস্তাটা ভালই বানাইছে, কি বলেন ভাইজান? আমার হাতের পাস্তাও আমার বসে খুব পছন্দ করে। খরিদ্দাররাও টিপস দেই মেলা। বসও আমারে নিজের পোলার মতই দ্যাহে। এই দ্যাহেননা আমার টিকেটটা পর্যন্ত কাইটা দিছে। এই আইফোন্‌ডাও হের থেইকা। হে সব সময় আমারে সেনেহো করে”। রাজনীতিবিদদের মত “এবার পাইছি মাইক” ধরনের মানসিকতা সত্ত্বেও কথা বাড়তে দিলাম। কারণ তার গদগদ হয়ে বলার ভঙ্গিতে কোথায় যেন একটা যাদু আছে। অনেকটা আদুরে আহ্লাদী বাচ্চাদের মত। জানলাম তার বয়স পঁচিশ। সত্যি সত্যিই সে এক রেস্তোরাঁর বাবুর্চি। থাকেন ইটালির মিলান শহরে।

তবে এগারো বছর ধরে সে মিলানে আছে শুনে বিশ্বাস হচ্ছিল না। আসলে মেলাতে পারছিলাম না। আবার জিজ্ঞেস করতেই ছেলেটি যে গল্প বলল তা শুনে আমার বুকের ভেতরে এক ধরণের কষ্ট হতে লাগলো। চার ভাইবোনের সংসারে সে দ্বিতীয়। দালালকে কয়েক লাখ টাকা দিয়ে বাস- ট্রেন- ও কিছুটা সমুদ্রপথে পনের দিনের যাত্রার পর সে ইটালিতে পৌঁছায়। চৌদ্দ বছরের কিশোর তখন। দেশে থাকলে হয়তো ক্লাস এইটে যেত। বর্তমান রেস্তরাঁর মালিক তখন থেকেই তার দেখাশোনা করে আসছেন। এমনকি গত বছর ইটালির পাসপোর্ট পেতেও সাহায্য করেছে। তাই এগারো বছর পর কৈশোরে ফেলে আসা দেশের সন্তান ফিরছে যৌবনে। ইতিমধ্যেই বাবা-মাকে নতুন ঘর তুলে দিয়েছে। দেশে টাকা পাঠিয়েছে নিয়মিত।বোনদের বিয়ে দিয়েছে। আমি নিশ্চিত তার আত্মা শারীরিক মানুষের চেয়েও বোনদের বিয়ের প্রতিটি মুহূর্তে জড়িয়ে থেকেছে। ঝরে পরা চোখের জলে তারা সুখী হউক এমন দোয়াই ছিল নিশ্চয়ই। দুঃখজনকভাবে কয়েক বছর আগে তার পিঠাপিঠি ভাইটি মারা গেছেন। তবে চোখ জুড়িয়েছে ভাগ্নেভাগ্নিদের ছবি দেখে। আশ্চর্যজনকভাবে ছেলেটিকে একটুও দুঃখী মনে হয়নি, বরং সুখীই মনে হয়েছে। তার সরলতা, তার উচ্ছলতা, তার ছেলে মানুষের মত বলার ভঙ্গিতে আমার চোখের কোন বার বার ভিজে উঠছিল।

দেশ ছাড়া মানুষের সংখ্যা এখন অনেক। কিন্তু বুকের ভিতর থেকে দেশকে ছাড়ানো মানুষও কি অনেক? হয়তো আছে। তবে আমি নিশ্চিত প্রবাসীদের মধ্যে এ সংখ্যা অতি নগণ্য। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য দেশ ছাড়া স্বার্থপরতা হলেও হতে পারে। মানুষের জন্য দেশ না দেশের জন্য মানুষ এই নিয়ে তর্কও করতে পারি। এই রকম বিভিন্ন বিদ্রোহী চিন্তা মাথার ভিতরে ঘুরপাক খেতে খেতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম। মানুষের শব্দ আর ক্যাপটেনের কথায় ঘুম ভেঙে গেল। তলপেটের সুড়সুড়িতে বুঝলাম নিচে নামছি। একজন জানালা তুলে দিলে লালের আভা দেখলাম উপরে। নিচের ঢাকা তখনও অন্ধকার। এক ধরণের অস্থিরতা আর কিচির মিচির শব্দে প্লেনের ভিতরেই বাংলাদেশের অতি পরিচিত গমগমে শব্দটা বাড়তে থাকলো। পাশের ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম কে আসবে নিতে। বলল, “মায়ে আইবো। মাইক্রো ভাড়া কইরা আমারে নেওনের জন্য ঢাকা আইছে”। অস্থিরভাবে নড়ে চড়ে একটু পরে বাচ্চা ছেলের মত স্বগোক্তি করলো, “কতদিন পর মায়েরে পামু”। আমার ভেজা চোখ তখন অনর্থক তাকিয়ে রয় বাইরে। প্রথম হৃদ স্পন্দনের শব্দ, প্রথম উষ্ণতার ছোঁয়া, প্রথম ভালোবাসার তৃষ্ণা হয়তো আজীবন থেকে যায়। আমার ভিতরের বাচ্চা ছেলেটিও ছটফটিয়ে ওঠে। সেও অস্থির মা’র কাছে যাচ্ছি বলে।

(বোস্টন থেকে  ডঃ মিলটন রহমান, ২৩ অক্টোবর ২০১৭)   

LEAVE A REPLY