পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা শুধু নারীকেই শোষণ করছেনা, বরং পুরুষের দায়বদ্ধতাকে বাড়িয়ে তুলছে – কেয়া তালুকদার

0
120
ছবি : সংগৃহীত

আমাদের সমাজে আদিকাল থেকেই একটি শ্রেণী শোষণ করে আসছে আর একটি শ্রেণী শোষিত হচ্ছে ৷ এর মূলে যে যাদুমন্ত্র তাহলো পুরুষতন্ত্র ৷ এর বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে নারী তার স্বাধীনতা ও স্বীকৃতি হারাচ্ছে ৷ সেই সাথে নির্যাতন ও সহিংসতার স্বীকার হচ্ছে এবং নিজের যোগ্যতাগুলোকে কাজে লাগাতে পারছেনা ৷ এখানে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্ত নারীদেরও রেহাই নাই ৷ হয়তো শোষক শ্রেণী বলবেন সবাই এক নয় ৷

কিন্তু পরিসংখ্যান করে দেখা গেছে কিছু পুরুষ ছাড়া অধিকাংশ পুরুষই তাদের পুরুষতান্ত্রিকতার সুযোগ নিয়ে নারীকেই দোষারোপ করে চলছে দিনের পর দিন ৷ সব কিছুতেই তাদেরই অগ্রাধিকার ৷ তারাই অগ্রাহ্য করছে নারীর যোগ্যতাকে ৷ পরিবারের প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করে তাই তার অন্যায় আবদার গুলোকেও মেনে নিতে হয় ৷ ক্ষমতার দাপটে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা কথা বলারও সাহস পায়না ৷ কয়টি পরিবার আছে সমঝোতার মাধ্যমে সংসার চালায় ?

যেহেতু এই সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ প্রধান, তাই পুরুষের দায়িত্ব আয় করা, তাই একজন বেকার পুরুষ কর্মজীবনে প্রবেশ না করা পর্যন্ত বিয়ে করতে পারেনা ৷ তাই ছোটবেলা থেকেই একটা চাপ থাকে পুরুষ তোমাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে ৷ এটি সাংঘাতিক ধরণের মানসিক চাপ ৷ কিন্তু একজন নারী কর্মজীবি না হলেও বিয়ের পীড়িতে বসতে পারে ৷ তারপর বিয়ের খরচ যোগানো, বউকে নিয়ে নতুন বাসা ভাড়া নিয়ে উঠা ৷ আসবাবপত্র গোছানো ৷ এখন অবশ্য নারীর বাবা-মা, যাদের সামর্থ্য আছে তারা সংসার গোছাতে সাহায্য করে ৷ তারপর সন্তানদের লেখাপড়া, স্ত্রীর ও সন্তানদের ভরণপোষণ চালাতে হয় মৃত্যুর আগে পর্যন্ত ৷

এজন্য কিছু পুরুষ সংসারের টাকার যোগান দিতে গিয়ে দূর্নীতি করছে ৷ আবার কখনও ধরা খেয়ে জেলের ভাত খাচ্ছে ৷ সন্তান বড় হলে তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করা ৷ নারী হলে তো কথাই নেই মৃত্যুর আগে পর্যন্ত শ্বশুর বাড়ীর আবদার মিটাতে হয় ৷ তারপর নাতি পুতিদেরও ৷ আর যারা যৌথ পরিবারে বাস করেন তাদের মা বাবা, ভাইবোনদেরও দায়িত্ব নিতে হয় ৷

অনেক পুরুষ আবার বিয়ের পর বউয়ের কথার গুরুত্ব না দিয়ে মাকে গুরুত্ব দেন ৷ এটি নিয়েও সংসারে অশান্তি ৷ আবার অনেকে মাকে গুরুত্ব না দিয়ে বউকে গুরুত্ব দেন ৷ এটিও সমস্যা; আবার দেখা যায়, যেসব পুরুষের আয় কম তাদের প্রতিনিয়ত স্ত্রীর কাছে হেয় হয়ে থাকতে হয় ৷ স্ত্রীর খারাপ ব্যবহার হজম করতে হয় ৷ সব শ্রেণীর পুরুষদের মধ্যে একটা বিষয় কাজ করে তা হলো আমি পুরুষ, আমিই বাদশা ৷ তাই নিম্নশ্রেণীতে স্ত্রীর ভাত রান্না করতে দেরী হলে শারিরীক নির্যাতনের শিকার হতে হয় ৷ এরকম অগণিত শারিরীক ও মানসিক নির্যাতন বিভিন্ন শ্রেণীতে ৷ নিজের ব্যর্থতার দায় নারীর উপর চাপিয়ে দিয়ে সংসারে অশান্তি ডেকে নিয়ে আসছে ৷ পুরুষদের স্বেচ্ছাচারিতা নারীকে করে তুলছে প্রতিবাদী ৷

একবার ভেবে দেখুন আপনারা এই তন্ত্র লালন করে কি সুবিধা পাচ্ছেন ? অতএব তন্ত্রের মন্ত্র ভুলে গিয়ে নারীকে শিক্ষিত ও কর্ম করার সুযোগ দিন ৷ নারীকে সন্তান জন্মদান ও লালনপালনের মধ্যে আবদ্ধ করে না রেখে তাকে বাইরের জগতের সাথে ব্যপ্তি ঘটান ৷ এই নারীরাই সংসার তথা নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে সন্তানদের মানুষ করার পিছনেও অর্থনৈতিক ভাবে অবদান রাখতে পারবে ৷ এতে শুধু আপনার উপার্জনে সন্তান যতটুকু ভালো পড়াশুনা করতে পারতো তার থেকে ভালো কিছু করতে পারবে ৷

দৈনন্দিন জীবনযাপনের যে স্ট্যাটাস সেটাও বদলে যাবে ৷ নারীকে নারী না ভেবে মানুষ ভাবুন ৷ যেসব নারী কর্মজীবি তাদেরকেও অনেক প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে জীবন পার করতে হচ্ছে ৷ পুরুষত্বের বড়াই না করে মানুষ রূপে নিজেকে গড়ে তুলুন ৷ এই পুরুষত্বই আপনাদের দায়বদ্ধতাকে বাড়িয়ে তুলছে ৷ আপনার মানসিক চাপে আপনিই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন ৷ এজন্য নারীদের থেকে পুরুষরাই বেশী হৃদরোগে আক্রান্ত হয় ৷ নারীর প্রতি নেতিবাচক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটান ৷

নারীর বেঁচে থাকার স্বার্থকতা হলো স্বামী আর সন্তানদের নিয়ে ৷ সবার প্রতি সবার সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গীর শুভ উদয় হোক এই কামনা করছি ৷ দুজন মিলে আয় করে সম মর্যাদাবোধের জায়গাটা ঠিক রাখতে হবে ৷

LEAVE A REPLY