কলামিষ্ট ও প্রবন্ধকার হাসান আহমেদ চিশতী এর সাত সংখ্যাতত্ত্বের কথকথায় সামাজিক জীবন দর্শন নিয়ে এবারের লিখা ”সাত সংখ্যাতত্ত্বের নির্বান সংস্কৃতি”

0
257
কলামিষ্ট ও প্রবন্ধকার হাসান আহমেদ চিশতী

সাত সংখ্যাতত্ত্বের নির্বান সংস্কৃতি

॥ হাসান আহমেদ চিশতী ॥

কয়েক হাজার বছর আগের জৈন ধর্মের প্রবর্তক মহাগুরু “মহাবীর জেন” এর তত্ত্ব হলো- যে কোন একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে অন্ততঃ সাতটি উত্তর আবশ্যক। এ জন্য তাঁর প্রধান সূত্রটি ছিল “সপ্ত ন্যায় ভঙ্গি”। এর বিশেষত্বই ছিল আত্মিক ও আধ্যাতিক। সুতরাং এর দীর্ঘ আলোচনা এখানে অনাবশ্যক। তবে আমরা প্রায়শই স্বাভাবিক জীবনাচরণে বলে থাকি যে, ভাই এই সাত-সকালে কোথায় চললেন বা সাত-সকালে কোথা থেকে এলেন? এখানে সকালটা বোঝা গেল কিন্তু এর সাথে সাত এর সংযোগটা কিভাবে হলো? নানা শব্দ কোষের পান্ডিত্যও এখানে থমকে দাঁড়ায়, তবে ঋষিজ চর্চায় যারা আদিষ্ট তাদের মত হলো সকালটা প্রহর গণনায় সপ্তমীর লগ্নভ্রষ্টা।

ফলে সাত সকালেও উপদ্রব হাজির হতে পারে বলেই প্রার্থনা বা অর্চনা আগেই শেষ করে শঙ্কামুক্ত হওয়ার উপায় করা হয়। তবে প্রথমেই বলে রাখি, এই সাত সংখ্যা তত্ত্বের বুজরুকীতে কিছুটা ঘোর লেগে যাবে নিশ্চিত এবং সকল ব্যাখ্যার সফল প্রায়শ্চিত্ব নিদান দীর্ঘ সূত্রিতায় বহুমাত্রিক বিধায় সংক্ষিপ্ত সারের আলোচনাই এখানে যথাযোগ্য মর্যাদায় আলোকপাত করা হলো। প্রসঙ্গতই পৃথিবী নাকি সাত সুরে বাঁধা। তাইতো কৃষ্ণের বাঁশরীতে সপ্ত সুরের মায়ায় জাড়িয়েছিল রাধা। সাত স্বর এর সারগাম থেকেই সংগীত শ্রুতির মাধুরী মায়ার ইন্দ্রজাল।

ভারতে হেমকু-ের কাছে পান্ডু রাজা সপ্তশৃঙ্গে সাধনায় সিদ্ধীলাভ করেছিলেন বলে জানা যায়। সাত রং এ রংধনু বা ইন্দ্রধনু, যার রং সাতটা- “বেনীআসহকলা”। সুতরাং রং শিল্পে যে বা যাহারা গুণিন শিল্পী তাদের জন্য এই সাত রং এর মাহাত্ম্য হলো চাহিদার সকল মাত্রাই এতে প্রতিস্থাপিত রং এর কারিগরিতে।

এবার ফোক (ভড়ষশ) বা লোকাচারের কিছু গল্পে উল্লেখ থাকে “সাত রাজার ধন”। বিষয়টি ব্যাখ্যান্তরে দেখা যায় যে, কোন এককালে সাতজন ধনপতি তাদের কুলদেবতাকে মহাসংকট উত্তরণকল্পে সর্বস্ব বির্সজন দিয়ে পরিত্রাণ করেছিল তাদের জনপদকে, কিন্তু তাদের কাউকেই আর কোনদিনই দেখা যায়নি। অভিশাপ মুক্ত হয়েছিল সেই জনপদ, আর লোকগাঁথায় চিরস্বরণীয় হয়ে আজও তার প্রচলন গল্পেই রয়ে গেছে। লোকজীবনে এক সন্তানের জনক-জননী তার সন্তানকে ‘এক মানিক সাত রাজার ধন’ বলে আশ্বস্ত হন অর্থাৎ কুল উদ্ধার হয়েছে। এবার বলতে হয় যে, সাতকাল কেটে গেলো সুতরাং এখন আর সাত পাঁচ ভেবে লাভ কি? অর্থাৎ জীবনের নয়নাভিরাম সময়টা যে সাতকালে ছিল তা চলে গেলে বিশৃংখল কিছু চিন্তা-ভাবনার অবকাশ আর থাকে না। এমনকি যার সময় সাত পাঁচ বারোতে টানা সম্ভব হয় না, অর্থাৎ দীর্ঘ সূত্রিতার ভাবনা কমে যায়। কখনও কখনও সাত কপালের ভাগ্যতেই এই সাতকাহন রচিত হয়। এমন করে বলাতে শব্দ যোগ ভাঙ্গতে গেলে দেখা যায় যে, কপালের নাম গোপাল অর্থাৎ দেবতার আর্শিবাদ প্রাপ্তিতে যে ভাগ্যবান এবং সাতকালের কাহিনীর নানা কথাতেই সাতকাহন। অপরদিকে যদি বলি সাত আসমান মাথায় ভেঙ্গে পড়েছে অর্থাৎ চরম বিপদাপন্ন। অন্য কোনও ভাষায় এমন পদ নাই। সপ্তম আশ্চর্য্য অবশ্য এখন কালের ধারায় বৃদ্ধি পেলেও কথ্য প্রচলন একই আছে। কাব্য ধারাতেও সপ্তপদী আবার রাগ এখন সপ্তমে অর্থাৎ প্রচন্ড ক্রোধ হলে তার এমন প্রকাশ বলা হয়। বেদবৈদ্যের ক্রিয়া কর্মেও সাত এর ব্যবহার কম নয়। যেমন সপ্ত ব্যাঞ্জন রোগ উপসমে সহায়ক হয় বা সপ্ত মূলের আরক দিয়েও হতে পারে এবং কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে। প্রকৃতির অপার লিলার এ রহস্য বোঝা বড় দায়, সাত ভায়রা পাখি আছে অনেকটা ভেড়ার মতো রং প্রায়শই সাতটা এক সাথে থাকে। লোকজ ধারার কথা এমন আছে যে, মাছের মধ্যে খয়রা আর সম্পর্কে ভায়রা।

‘‘সাতভাই চম্পা’’ লোকগাঁথা কে না জানে। সুতরাং এসব ক্ষেত্রে সাত সতেরো করার উপায় নাই অর্থাৎ ফাঁকি দেয়া যাবে না। তারার মেলায় সপ্তর্ষি মন্ডল নিয়ে আকাশের পাশাখেলা গুণিনরা খুঁজে থাকেন। বিভিন্ন ধরনের ঝাড় ফুঁক ও বুজরুকীতে কিংবা ধর্মীয় আচরণ পর্বের কায়দা কৌশলের মাত্রা এককে সাত সংখ্যার মাহাত্মপূর্ণ প্রচলন প্রতিষ্ঠিত আছে। ভাগ্য লাভের জন্য সাত ধাতুর মাদুলী বা আংটি কিংবা সাত সুতা একত্র করে ধাগা শরীরে ধারণ করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় এই সুতোর ধাগা বলা হয় যেটাকে, সেটাকে মন্ত্র পড়ে পড়ে ফুঁ দিয়ে সাত গিট্টু দিয়েও অনেকে ধারণ করেন। জীবন সঙ্গিনীকে অগ্নি সাক্ষি রেখে সাত পাঁকে ঘুরিয়ে হিন্দু বিবাহ সম্পন্ন করতে দেখা যায়, যা কিনা সাত পাঁকে বাঁধা হয়ে সারা জীবন একসাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে রইলো। কোনও কোনও ক্ষেত্রে এমন কথাও শোনা যায় যে, এমন মাহাত্মে বিরাজিত যিনি তার সাত খুন মাপ। বাঁধনের ক্ষেত্রেও সাতটায় পূর্ণরূপ পায়। আবার দখলী সত্ত্বের জমিও নাকি সাত দলীলের সমান। সপ্তডিঙ্গা যেন কোন উৎসব এর যাত্রা বহর বলে মনে করা হয়। ‘সাত নড়ি হার কলঙ্ক’ হয়তো দুঃখের কোনও অস্বাভাবিক মাত্রা হতে পারে, যার প্রকাশ ভঙ্গির এই রূপকত্ব ছাড়া উপায় নাই। সাত মাথা কিংবা সাত লাঠির কথাতে বোঝা যায় নিশ্চিৎ সমাধানের সফলতা লাভের প্রকৃষ্ট প্রক্রিয়া।

হস্তরেখায় জ্যোতিষ মহাশয়ও সাত রতি পাথর ধারণে নির্বান লাভের উপায় বলে দেন। আবার সাত ছাওয়ালের মা গঙ্গা পায় না অর্থাৎ সাত সন্তানের মাতা যে পুষ্টিহীন হয়ে পড়ে হয়তো সেটাই লোককথায় বোঝানো হয়েছে। যার সাত কুলে কেউ নেই তার আবার ভয় কিসের, এমন কথাও শোনা যায়। আমাদের জাতীয় জীবনে ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক গুরুত্বও কোন অংশে কম নয়। আবার যে কোন সভা সমিতি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সাত সদস্যের কমিটি নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। ফলে সাত সংখ্যা তাত্ত্বিক বিবেচনায় লোকজীবনে যে পরিমাণ গুরুত্ব বহন করেছে তার হিসাব মিলানো দায়। যেমন- ভীষণ রেগে গেলে সাত হাত মাটিতে পুঁতে ফেলার কথা শোনা যায় ঠিক, তেমনটাই আবার কেউ কেউ ‘সাত চড়ে রা করে না’ অর্থাৎ রাগহীন অবস্থা। সাত জনমের দোহাই আছে, শপথও আছে অতিপ্রেমে এবং সাত দোজখের কথাও আছে।

ধর্মীয় বিধান মতে সাত বছর পর থেকে সন্তানকে শাসন করার বিধান, আবার জন্মের সাত দিনের পর গোসল বা কামান প্রথার প্রচলন আছে। সাত ভাতারী মাগী বলে গালাগালি দিয়ে সাত গুষ্ঠি উদ্ধার করার কথা গ্রাম বাংলায় বেশ চালু আছে। ষাটের দশকে বাংলার গ্রামীন জনপদে সাতগুটির খেলা বলে ছোটদের জন্য একটি জনপ্রিয় খেলার প্রচলন ছিল। আবার সাত সমুদ্র তেরো নদীর কথার প্রচলন ছিল নানা গল্পে। অপরদিকে সপ্ত সিন্ধু আর সপ্তম নৌবহর, লাকি সেভেন, সেভেন ষ্টার, সেভেন আপ এবং সাতধারা আইন খুবই প্রচলিত ব্যাপার আমাদের সমাজে। প্রার্থনা কিংবা দেবতার তুষ্টিতে যতো রকম প্রক্রিয়ায় সাত সংখ্যার বাহারী ব্যবহার আছে তার নথি উদ্ধার করতে গেলে সাত ঘাটের জল খেয়ে লাগতে হবে। সৃষ্টিতত্ত্বে আদম শরীরে সাত পাকের ভিত্তিতেই প্রাণ সঞ্চার করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এমন কি মুসলিম ধর্মের কাবা শরীফে সাত পরিক্রমনের মাহত্ত্বপূর্ণ বিধান রয়েছে। সুতরাং এর গাণিতিক বিজ্ঞান বিষয়ক ব্যাখ্যার উপাখ্যান উপপাদ্য হয়তো ভিন্নরূপ। তবে ভারতে সেভেন সিস্টার নিয়ে যে তারা সাত পাঁচ করছে সে কথায় নাইবা গেলাম। সুতরাং পরিশেষের ঋষিজ ধারায় তাত্ত্বিক বিচার হলো পৃথিবী নাকি সাত স্তরে বা মার্গে প্রতিষ্ঠিত এবং মানব শরীরও আত্মিক বিবেচনায় তাই, ফলে অতিন্দ্রীয় বর্গে ভাবের কথাতে সাতই সাতন্ত্র মার্গে নির্বান লাভের প্রকৃত উপায় বলে জানা যায়।
(লেখক: প্রবন্ধকার, কলামিষ্ট, গল্পকার, কবি, সাহিত্যিক

LEAVE A REPLY