ভারতের প্রতিভাময়ী ব্যাক্তিত্বের অধিকারী, অনিন্দিতা ব্যানার্জি টামটার সাথে মুখোমুখি অগ্নিমিতা দাস

22
অনিন্দিতা ব্যানার্জি টামটার সাথে মুখোমুখি অগ্নিমিতা দাস

আমি অমুকের মেয়ে অমুকের বৌ বলে এই চেয়ারটা পাই নি। নিজের যোগ্যতায় ডিসার্ভ করেছি। সেইজন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি কিন্তু কাউকে প্রতিযোগী বলে মনে করি নি।
অনিন্দিতা ব্যানার্জি

দশভূজা _ রাজ্যের সর্বশিক্ষা মিশনের গভর্নিং বডির মেম্বার থেকে সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার বোর্ডের সদস্য, পরিবার ইন্ডিয়ার কর্ণধার, বর্তমানে যাদপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাল কম্পেলন্টস( ICC) কমিটির মেম্বার , পশ্চিমবঙ্গের ” মা” কিচেনের গর্ভনিং বডির মেম্বার,সম্প্রতি চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারপারসন । এ হেন প্রতিভাময়ী ব্যাক্তিত্বের অধিকারী, অনিন্দিতা ব্যানার্জি টামটার সাথে মুখোমুখি অগ্নিমিতা দাস
১) আপনি বহুদিন ধরে বড় বড় সংস্থার সাথে যুক্ত, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিন চব্বিশ পরগনার চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারপারসন হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন, সেই সম্বন্ধে যদি কিছু আলোকপাত করেন?
উঃ_ কোথা থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। তবে বলতে বসলে তো মহাভারত হয়ে যাবে। কিছুই করিনি সেইরকম। সমুদ্রের জল এক টুকরো আঁজলা ভরে নিয়েছি। পাঠকের হয়তো বিরক্ত লাগতে পারে কর্মক্ষেত্র নিয়ে যে প্রশ্ন করেছো সেখানে আমাকে এইকথাগুলো বলতেই হবে।
আমি প্রায় দশ কি বারো বছর আগে রাজ্যের সর্বশিক্ষা মিশনের গভর্নিং বডির মেম্বার ছিলাম। আগে কর্পোরেট সেক্টরে ছিলাম, সেই এক্সপিরিয়েন্স এখানে কাজে লাগিয়েছিলাম। কর্পোরেটের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম হয়। ওদের একটা সীমিত বাজেট থাকে। আলাদা আলাদা ইউনিটে। তখনকার দিনে সর্বশিক্ষা মিশনের‌ কোটি কোটি টাকার বাজেট ছিলো। বড়ো বড়ো জেলার আধিকারিকরা আসতো। কতটা স্টেট গর্ভমেন্ট দিচ্ছে কতটা সেন্ট্রাল গভর্মেন্ট দিলো তার একটা অঙ্ক কষা চলতো। আমার বেশ ভালো লাগতো। রাজ্যের মধ্যে গভর্নিং বডির দুজন মেম্বার ছিলো, একজন পলিটিক্যাল অন্যজন ননপলিটিক্যাল। আমি নন পলিটিক্যাল সদস্য ছিলাম, আমি তাই প্রথমেই প্রচারের আলোয় না এসে নিজের মতো কাজ করতে পেরেছি। আন_ বায়াসড হয়ে কাজ করতে পেরেছি। নিজের মতো কাজ করেছি, মনের আনন্দে, কাজ করার তাগিদে। সেখানে হয়তো অনেক মতামত দিয়েছি যে এখানে বাজেট একটু বাড়ালে ভালো হয় বা এখানে একটু অন্যরকম করলে! ঠিক কি ভুল সেটা জানি না তবে মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সেই মতামত হয়তো তুচ্ছ কিন্তু সেটা পেশ করার সুযোগ পেয়েছি।
পশ্চিমবঙ্গের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ফেয়ার বোর্ডের মেম্বার ছিলাম। এই দুটোই ছিলো পলিসি মেকিং বডি।
সি. আই. আই তে কাজ করেছি। পার্টনার শীপ সাম্মিট প্রোটোকলে ছিলাম। আমাকে সাউথ আফ্রিকার প্রতিনিধিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো। ওখানের একজন সাউথ আফ্রিকান মিনিস্টারের সাথে কাজ করতে করতে অনেক মজার মজার অভিজ্ঞতা হয়। আমি কাজ করতে শেষে ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি আসলে ওই দেশের ন‌ই, বিদেশী। এতটাই বন্ডিং তৈরি হয়ে গিয়েছিলো।কাজ করতে করতে এমন অনেক মানুষের সাথে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। কিছু কিছু সম্পর্ক এখন ও অক্ষুন্ন আছে, এটা ও আমার পরম পাওয়া।
তোমার কথায় তাবড় সংস্থায় পার্টনারশিপ সামিট ও দেখেছি। আবার বিট্রানিয়া বিস্কিটের কারখানাতে ও ছিলাম।আমি এখনো চোখ বুঝলে সেই গন্ধটা অনুভব করি, তবে তখন কারখানায় মেয়েদের অধীনে কাজ করার কথা ভাবতে বোধহয় একটু কষ্ট হতো। পরে ওদের সেটা কেটে গিয়েছিলো। কিন্তু ওদের সাথে কাজ করতে আমার খুব ভালো লাগতো ওদের আকন্ঠ ভালোবাসা পেয়েছি। যাদবপুরে ইন্টারনাল কম্পেলনটস কমিটির মেম্বার হ‌ওয়ার সুবাদে সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্টের কেস সলভ করতে করতে এতটাই পটু হয়ে গেছি যে চাইলন্ড ওয়েলফেয়ার কমিটিতে চেয়ারপারসন হিসেবে এসে এই ধরনের কেসগুলোর সমস্যা মেটানো আমার কাছে খুব সহজ হয়। তাছাড়া আমার রয়েছে আমার নিজস্ব হাতে গড়া ” পরিবার” । পথশিশুদের নিয়ে গড়ে তোলা এই প্রজেক্টের সাথে আমার হৃদয়ের বন্ধন রয়েছে।

বর্তমানে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির চেয়ারপারসন হিসেবে নিযুক্ত হয়ে সেইভাবে সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানোর সুযোগ কম পাচ্ছি। এটা পুরোপুরি ইমপ্লিমেন্টিং বডি।
যেহেতু গর্ভমেন্টের ব্যাপার তাই অনেক জায়গায় মেপে কাজ করতে হয়, বাড়তি কিছু করার ইচ্ছা থাকলে ও হাত পা বাঁধা।
তবু ও এখানে ও কিছু করে যাওয়ার ইচ্ছা আছে, যেটা আসলে তাবড় হয়। আমি না থাকি, আমার দেখানো পথ ধরে যেনো পরবর্তীরা আলোর দিশা পায়। এক‌ই গতিতে কাজ না করে একটু অন্যরকম করে বাচ্ছাদের নিয়ে ভাবা। একটু অন্য আঙ্গিকে। চেষ্টা করবো বাচ্ছাদের জন্য নতুন কিছু করতে।
আসলে কি জানো তো! তাবড় তাবড় কোন সংস্থাই হয় না সেই সংস্থাকে তাবড় করে নিতে হয় নিজের দক্ষতায়, পরিশ্রমে নিষ্ঠায়।
২) আপনার পথশিশুদের নিয়ে ” পরিবার” নামক সংস্থা সম্বন্ধে যদি কিছু বলেন? এই পরিবারের কোন সাফল্যের গল্প যদি বলেন?

উঃ _ আমার পথশিশুদের নিয়ে কাজ শুরু ছাব্বিশটা বাচ্চা নিয়ে। এখন সেটা হাজার ছাড়িয়ে গেছে।আমি তখন পার্মানেন্ট জব ছেড়ে , কনসালটেন্সিংতে কাজ করি। আমি বরাবরই একটু বেশিই স্বচ্ছল ভাবে বড় হয়েছি, স্বামী আই. পি. এস হবার সুবাদে অর্থনৈতিক চাপ কোনদিন ছিলো না। তাই নিজের মতো করে নিজের ” পরিবার” কে গড়ে তুলতে পেরেছি। একদম কিছু লেখাপড়া না জানা বাচ্চাকে আমি নার্সারিতে ভর্তি করিয়েছি। ব্রিজ কোর্স এসবের মধ্যে না গিয়ে নর্মাল ভাবে লেখাপড়া শুরু করিয়েছি। যে বাচ্চাটার দশ বছর বয়স সে যদি নার্সারিতে পড়ে তার ক্যাচিং ক্যাপাসিটি অন্যদের থেকে স্বাভাবিক ভাবে বেশি হবে। আমি এইভাবেই পড়াশোনা করিয়েছি।
বাচ্ছাদের শুধু পড়াশোনা নয়, সুনাগরিক গড়ে তোলার জন্য কোলকাতা পুলিশ ” নবদিশা ” বলে একটা প্রজেক্ট তৈরী করে।


এখন তো ” CCL” শব্দটার সাথে পরিচিত হয়েছি তখন তো ছিলাম না। গার্ডেনরীচ এলাকায় দেখা যেতো বাচ্চাগুলোকে চকোলেট, কোল্ডড্রিংক্সের লোভ দেখিয়ে ভারি ভারি লোহার রড সরানোর কাজ করানো হতো। এই ভাবে বাচ্চাগুলো পরবর্তীকালে ক্রিমিনাল তৈরি হয়ে যেতো। সেইজন্য এই প্রজেক্ট চালু হয়েছিলো যাতে বাচ্ছারা পুলিশ কাকুদের সান্নিধ্য থাকে, তাদের সাহায্য করে। বাচ্চাগুলোকে মূল স্রোতে ফিরানো চেষ্টা। পুলিশকাকু ওদের পরিবার, সেখানে ওদের বাবা মাকে ও নিযুক্ত করা হতো। সেখানে বাচ্চারা বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতো না, সুন্দর সংস্কার পেতো।” পরিবার” প্রায় সাত কি আটটা পুলিশ স্টেশনে এই প্রজেক্ট চালু করে। ২০০৯ ” রাইট টু এডুকেশন” নিয়ম অনুযায়ী আমাদের সব বাচ্ছাদের স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিলো। প্রচুর বাচ্ছাদের লেখাপড়া শেখানো, মানসিক এবং শারীরিক ভারসাম্যহীন বাচ্ছাদের সাথে কাজ করেছি।এই সব পরিবারের মা বাবারা তো সচেতন নয়, তারা এক‌ই বৃত্তে থাকতে অভ্যস্ত। সেখান থেকে বের করে কিছু করার মতো চ্যালেন্জ নিয়েছি। ভীষন আনন্দ হতো! যে কাজ অন্তর থেকে মনের আনন্দে করতে হয় সেটা কখনোই বোঝা হয়ে যায় না।
সাকসেস স্টোরি অনেক আছে। একবার একটা খুব নামী কেক শপে গিয়েছিলাম। তখন শপ বন্ধ হবে, একজনের বার্থডে ছিলো , কিন্তু পড়ে ছিলো গুটিকতক কেক পেস্ট্রি। একটা ছেলে দেখলাম তৎপর হয়ে ওই কেক পেস্ট্রি দিয়ে গোল গোল করে বড়ো একটা কেক বানাতে শুরু করলো আমি ও তখন ওকে উৎসাহ দিচ্ছলাম। ছেলেটা অদ্ভুত দক্ষতায় কিছু সময়ের মধ্যে একটা সুন্দর গোল গোল করে কেক বানিয়ে দিলো। বিল হয়ে যাবার পর ছেলেটা আমার পা ছুঁয়ে বলল” ম্যাম আমায় চিনতে পারছেন? ছেলেটার নাম চন্দন, খুব ভালো পড়াশোনায় ছিলো। ক্লাস ফাইভে ওকে পেয়েছিলাম , টুয়েলভ পাশ করে গ্র্যাজুয়েশন করেছিলো। আজ সে তোমার কথায় তাবড় কেক কোম্পানিতে কাজ করে। একবারে ফুটপাতে থাকতো। এইরকম আরো একটা গল্প আছে। ” পরিবারে” “আমরা করবো জয় ” বলে একটা নৃত্য প্রতিযোগিতা হয়। সেই সময়ে আমাদের একটা এগ্রিমেন্ট ছিলো “পদাতিক ওয়ার্ল্ড” স্কুলের সাথে, প্রতিযোগীতায় ফার্স্ট, সেকেন্ড থার্ডদের ওরা তিনমাসের প্রশিক্ষণ দিতো। জয় বলে একটা ছেলে ছিলো, আক্ষরিক অর্থেই চেহারায় একটা চোয়াড়ে ছাপ ছিলো, কানে দুল, চুল লাল বেগুনি, সোনালী। কিন্তু নাচতো দুর্দান্ত। ও পদাতিক ওয়ার্ল্ড স্কুলে ট্রেনিং গিয়ে এতো ভালো পারফরমেন্স করলো যে ওকে ছমাসের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিলো। সিমক ধীওয়ারের কাছে ও ট্রেনিং নেয়, ওর গ্রুমিং এতো ভালো হয়েছিলো যে ওর ভাব চালচলন পুরো পাল্টে গিয়েছিলো। জয় পরে ডান্স ইন্সট্রাকটার হয়েছিলো। এইরকম অনেক জয়ের বিজয়ের গল্প আমার ভান্ডারে আছে, যা বলে শেষ করা যাবে না। তবে এই গল্পগুলো আমার জীবনের বড়ো পাওয়া। এই সাফল্যগুলো বুকের মাঝে চেপে ধরে রাখতে খুব ইচ্ছে করে।
৩) জীবনের আদর্শ মানুষ কে?
উঃ আমার বাবা।

৪) কর্মজীবন শুরু কিভাবে?

উঃ (একটু হেসে) ওয়ার্ক ইন ইন্টারভিউ দিয়ে অমৃতবাজারের সাব এডিটার।

৫) বড় পরিবার থেকে আসা কন্যা আবার আই. পি এসের বৌ হয়ে অন্যদের সাথে কাজ করতে কেমন লেগেছে? প্রতিযোগীতার মুখে পড়তে হয়েছে?

উঃ আমি ছোট বেলা থেকে বাবার কাছ যে শিক্ষায় বড় হয়েছি তাতে আহ্লাদ ছিলো কিন্তু প্রশয় ছিলো না। সবার সাথে মিশেছি, সবরকম বন্ধুদের সাথে। আমার বাবা বলতেন তোমাকে ফলা ও করে বলতে হবে না, তোমার অন্যের প্রতি ব্যাবহার , আচরণ, রুচি বুঝিয়ে দেবে তুমি কোন পরিবার থেকে এসেছো। যে কোন কর্মজগতে প্রথমে আমাকে সবাই অন্য গ্রহের বাসিন্দা ভাবতো, পরে সে ধারনা ভাঙতো। আমি কাজের জায়গায় সবার সাথে মিলেমিশে কাজ করতে ভালোবাসি। অফিসের পিওন থেকে শুরু করে অধীনস্থ অনেক কর্মচারীদের সাথে আমার স্নেহ ও ভালোবাসার সম্পর্ক।


আমি যে ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছিলাম তাতে কর্মজগতে সবাইকার কাছে বেশি করে প্রমান করতে হতো আমি যোগ্য। আমি অমুকের মেয়ে অমুকের বৌ বলে এই চেয়ারটা পাই নি। নিজের যোগ্যতায় ডিসার্ভ করেছি। সেইজন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি কিন্তু কাউকে প্রতিযোগী বলে মনে করি নি। কে ও যদি আমায় প্রতিযোগী ভেবে থাকে সে ব্যাপারে আমার কোন ধারনা নেই।
৬) রাগ হলে কি করেন?
উঃ রাগ হলে মনে মনে উল্টো কাউন্টিং শুরু করি। বেশি করে হেসে কথা বলি। ইমোশনগুলো সব ভুলে পুরো ডিপ্লোম্যাটিক হয়ে যাই। এতে শরীরের ক্ষতি হয় না। তখন আমার ” আমিটাকে ” মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে ফেলি।
৭) সবচেয়ে আনন্দের মূহুর্ত?
উঃ ছেলেমেয়েদের কোন প্রাপ্তি।

৮) সবচেয়ে কষ্টের মূহুর্ত?
উঃ বাবা,মা, বন্ধুসম দাদার মৃত্যু।
৯) ইলিশ না গলদা?
উঃ অবশ্যই ইলিশ।
১০) বর্ষার বৃষ্টিতে কোনদিন ভিজেছেন?
উঃ রাস্তায় কোনদিন ভিজি না, আমি একটু পিটপিটে, বর্ষার জল পায়ে লাগলে আমার এলার্জি হয়। তবে মনে হয় বাড়ির ছোটবেলায় ছাদে ভিজেছি।
১১) জীবনের প্রথম প্রেম?
উঃ জীবনের প্রথম যাকে ভালোবেসেছি সেই আমার জীবনসঙ্গী। তাই প্রথম আর শেষ প্রেম এক‌ই। তবে রূপালী পর্দায় অনেকের প্রেমে পড়েছি। ঋত্বিক রোশনের প্রেমে তো আমি বেশ গদগদ।

১২) ছেলেবেলার কোন স্মৃতি যা আজ ও জাবর কাটতে বেশ লাগে?

উঃ ছেলেবেলার স্মৃতির সবটাই বাবাকে নিয়ে। আমি একমাত্র আদরের কন্যা ছিলাম। একবার মনে আছে হোম সায়ান্সে কি করে বাসন মেজে ঘষে পরিস্কার করতে হয় হাতে কলমে শিখিয়েছিলো। বাড়িতে একটা পরিস্কার বাটিকে সিঙ্কে বসে মাজছি। এমন সময় বাবা ঘরে ঢুকে মেয়েকে বাসন মাজতে দেখে , বাটিটা ছুঁড়ে দেয়, মাকে খুব বকাবকি করে। আহ্লাদের কন্যাকে নিয়ে কাজ ফেলে সারাদিন বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিলো, কত কিছু খাইয়েছিলো। এইরকম হাজারো স্মৃতি রয়েছে। সেই স্মৃতিগুলো আমি মনের আলমারিতে যত্নে রেখে দি‌ই। মাঝে মাঝে বার করি আর জাবর কাটি।
১৩) রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা খেতে খেতে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে না বড়ো ক্যাফেতে বেশি কমফোর্টেবল?
উঃ বয়সের সাথে সাথে ভালো লাগাগুলো পাল্টাতে থাকে। ফুচকা দেবভোগ্য জিনিস। সাউথ সিটির ফুচকা নয়, রাস্তার তেঁতুল গোলা ঝাল ঝাল ফুচকার মজাই আলাদা। তবে টিন‌এজে কলেজের বন্ধুদের সাথে রাস্তায় ফুচকা খেতে খেতে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়েছি। কিন্তু এখন বোধহয় পুরনো বন্ধুদের সাথে ভালো রেস্তোঁরা বা ক্যাফেত‌ই কমফোর্টেবল।

১৪) কাছের বন্ধু?

উঃ কাছের বন্ধু প্রচুর। যার নাম বলতে ভুলে যাবো, সে রাগ করবে।
১৫) অবসরে কি করতে ভালোবাসেন?
উঃ _অবসরে গান শুনতে, মাঝে মাঝে নাচ করতে বা ভালো লাগার মানুষের সাথে আড্ডা দিতে ভালোবাসি।
১৬) ছুটিতে দেশের মাটিতে না বিদেশে কাটাতে ভালোবাসেন?

উঃ বিদেশে ঘুরতে ভালোবাসি। দেশের মাটিতে অনেক ঘেরাটোপের মধ্যে থাকতে হয় । বিদেশে নিজের মতো হাত পা মেলে ঘোরা যায়! নাচো, মজা করো। কোন রিপোর্টার পিছু পিছু ঘুরবে না।

১৭) আপনি তো শুনেছি রত্নগর্ভা, ছেলে তো ছোট থেকেই তুখোড় পড়াশোনায় বর্তমানে ব্যাঙ্গালোরের ন্যাশনাল ল স্কুলের গেষ্ট লেকচারার , মেয়ে অল্প বয়সেই ডাক্তার, সম্প্রতি পেটেন্ট ও পেয়েছে! এই সাফল্যের নেপথ্যে মা হিসেবে আপনার অবদানের কথা যদি একটু বলেন?

উঃ আমার দুই সন্তান। একটি ছেলে একটি মেয়ে। মেয়ে বড়ো। ডেন্টিস। (BDS) করার পর PG করেছে prosthodontics ওপরে। । এখন যে কলেজ থেকে পাশ করেছে সেখানেই অধ্যাপনা করে মানে ( BDS) দের পড়ায়। সম্প্রতি ওর নিজস্ব একটা পেটেন্ট পাস হয়েছে ।ছেলে NUGS থেকে পড়াশোনা করেছে । পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে ( LLM) পড়েছে। এখন ন্যাশনাল ল স্কুলে পড়ায়। রত্নগর্ভা কি না জানি না! তবে ঈশ্বরের কৃপায় সবার ভালোবাসায় আশীর্বাদে ওরা নিজের নিজের জীবনে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা হয়েছে বা এখনো চেষ্টা করছে। ছোট থেকেই ওরা লেখাপড়ায় ভালো ছিলো। আমি আমার মা বাবার কাছ যে যত্ন, যে শিক্ষা পেয়েছি, তাই আমি আমার সন্তানদের দেওয়ার চেষ্টা করেছি। সব মা বাবা নিজেদের উজাড় করে দেয় সন্তানদের শুভকামনায়, কিন্তু কজন তার মর্যাদা দেয়। তাই আমি বাড়তি কিছুই করিনি , আর পাঁচটা মায়ের মতোই সন্তানদের পাশে থেকেছি, যত্ন নিয়েছি। সন্তানরা যোগ্য হয়েছে সেটা তাদের কর্ম তাদের প্রচেষ্টা।

১৮) আপনার জীবনসঙ্গী ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র, একজন নামকরা আইপি. এস অফিসার , আপনার কর্মকান্ডে তার সহযোগীতা কতটুকু পান?

উঃ ধুর! কিসু পাশে থাকে না। ( হাসতে হাসতে ) কুন্দন সারাজীবন ভীষন ডিসিপ্লিন লাইভ লিড করেছে। এখনো করে, তবে আমার সব ব্যাপারে ওর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা থাকেই। নিজের স্বামী বলে বলছি না মানুষ হিসেবে অনবদ্য। তবে আমি একটু খেয়ালী নিজের মতো চলতে, কাজ করতে ভালোবাসি। ও ঠিক উল্টো তবু ও সব কাজেই ছেলেমেয়েদের মতো বাবার ও আমাকে পাশে চাই। হম্! আমার সব কাজকে ও খুব উৎসাহ দেয়। কুন্দন জানে আমি যে কাজটা ধরবো সেটা পারফেক্ট ভাবে করবো এবং সেটা শেষ করেই ছাড়বো। আমার এই আমিটাকে , কাজ করার স্পৃহাটাকে আই পি. এস অফিসার কুন্দলাল টামটা ভালো যেমন বাসে তেমনি মনে মনে তারিফ ও করে।
১৯) একজন সফল নারী হিসেবে যদি কিছু বার্তা দেন? আপনার লক্ষ্য পৌঁছনোর জন্য আপনার অদম্য ইচ্ছাশক্তির কথা যদি একটু বলেন?
উঃ _ ( একটু ভেবে) আমি আগে পরের প্রশ্নের উত্তর দেবো, কেননা না হলে আগেরটার উত্তর দেওয়া যাবে না।
আমার প্রথমত কোন লক্ষ্য ছিলো তাই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য কোন তাড়া ও ছিলো না। লোকে বড় বড় পদক্ষেপ নিতে ভালোবাসে। আমি বরাবরই একটু খামখেয়ালী ধরনের। নিজের মর্জির মালিক। তাই গুটিগুটি পায়ে নিজের মতো করে এগিয়েছি।
আমি প্রথমে অমৃতবাজারের সাব এডিটর ছিলাম। ইংলিশ নিয়ে পড়েছিলাম, ভালো লেখালেখি করতাম। ওটা নিয়ে এগোবো ভেবেছিলাম , এম. ফিল করবো বলে ঠিক করে ফেলেছিলাম, করা হয় নি। ছেলে তখন চার মাসের, মেয়ে দু বছরের। এডিটারের চাকরি করলে শিফটিং ডিউটি করতে হতো। বাড়িতে ছোট বাচ্ছা রেখে আমি ওটা কন্টিনিউ করতে পারি নি। ওদের সময় দেবো বলে দশটা পাঁচটা জব করেছি। সেই সময় এম. বি. এ করে ফেলি।
কিন্তু কাজ করতে গিয়ে দেখলাম ওটা দশটা পাঁচটায় সীমাবদ্ধ থাকে না। নিজে ও দায়িত্ব নিতে ভালোবাসতাম, মন দিয়ে কাজ করতাম। তাই সময়টা নিয়ে সমস্যা হতো। সেই সময় আকস্মিক ভাবে আমার বাবা মারা যান। বাবা আমার জীবনের বন্ধু, ভালোবাসা সব সব কিছু ছিলো। তাই সেই সময়টা দমচাপা কষ্টটাকে ভোলার জন্য ফুটপাতের ছাব্বিশটা বাচ্চা নিয়ে শুরু করি আমার “পথশিশুদের নিয়ে স্কুল। প্রথমে সপ্তাহে তিনদিন করে পড়াতাম। তারপর কেমন একটা নেশা চেপে গেলো, দেখলাম স্কুলের হেডমিস্ট্রেস হতে গেলে বি. এড করতে হবে। করে ফেললাম। ” পরিবার” বড়ো হতে লাগলো। এই বাচ্চারা যে সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে আসে সেখানে দাঁড়িয়ে অনেক সময় আইনী জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। তাই ” ল” ডিগ্রিটা করে ফেললাম। মনের জোর না থাকলে সব সামলে লেখাপড়া করা যায় না।
তাই অদম্য ইচ্ছাশক্তি জেদ থাকলে হয়তো সব কিছুই সম্ভব হবে।
আমি সফল এখনো হতে পারি নি সেই অর্থে তাই সফল নারী হিসেবে নয় তবে এইটুকু বলবো যে স্বপ্ন দেখবে সেটা যেন তোমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় পূর্ণ করার জন্য। সংস্কৃতে একটা শ্লোক আছে_ শিকার না করলে ঘুমন্ত সিংহের মুখে তো হরিণ প্রবেশ করে না। তাই সব নারীদের বলবো, ঘরকন্যা সন্তান থাকবে সেইগুলো সামলে ও মনের ইচ্ছাগুলো যেন পূরন করে। নিজের মনের কথা শোনা উচিত না হলে নিজেই নিজের প্রতি অন্যায় করা হয়

ওই যে গুরুদেবের একটা কবিতার লাইন আছে” অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন তৃণদম সহে”!
নিজের ইচ্ছাগুলো যেন রান্নাঘরের কোলজিরে, পাঁচফোড়নের শিশির মধ্যে হারিয়ে না যায়।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY