* বন্ধুত্ব * গল্পটি চাকচিক্য ময় সমাজের প্রতিচ্ছবি,লিখেছেন ওপার বাংলার কবি,লেখক জয়তী রায় ।

472
ওপার বাংলার কবি,লেখক জয়তী রায়

* বন্ধুত্ব *

            জয়তী রায়

মিনহাজ আজ প্রথমবার বাড়ির বাইরে পা রেখেছে। আজ সে তার মফস্বল শহরের ছোট গন্ডি থেকে চলেছে কলকাতার উদ্দেশ্যে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করাতে, তার বাবা, নিজের অর্থনৈতিক কমজরির কথা না ভেবে মেয়েকে কলকাতার ভালো কলেজে এডমিশন করিয়ে দেন। মিনহাজের ছোটবেলা থেকেই ইচ্চা ছিলো যাদবপুর কলেজে ইংরেজি নিয়ে স্নাতক হওয়ার। আজ সেই স্বপ্ন পূরণের দিন। আজ মিনহাজ চলেছে তার সেই স্বপ্নের গন্তব্যে …….. ।
কলকাতাতে এসে সঙ্গে সঙ্গে হোস্টেলে সিট না পাওয়াতে মিনহাজ ক্লাসের পরিচিত আরও তিনজন বান্ধবীর সঙ্গে মেস করে থাকার কথাতে রাজি হয়ে যায়। পৌলমী, নিশা, তুলি, মিনহাজ-চার হরিহর আত্মা। একসঙ্গে চলেফেরে, ওঠেবসে, ক্লাস করে। তাদের একসঙ্গে থাকা খাওয়ায় বন্ধুত্বের সম্পর্ক গাঢ় হলেও, তাদের স্বভাব সমান ছিল না। পৌলমী ,তুলি ও নিশা, মা-বাবার একমাত্র সন্তান এবং সচ্ছল বাড়ির মেয়ে হওয়াতে তাদের রহন- সহন খানিকটা আভিজাত্য পূর্ণ ছিল। কথায় কথায় জিনিস কেনা, খরচ করা তদের কাছে নিত্যদিনের স্বভাব ছিল। মিনহাজ জানে তার বাবা অনেক কষ্টে তাকে পড়াচ্ছেন তাই এসবের মধ্যে মিনহাজ যায় না। তবে ওরা তিনজনই মিনহাজকে ভালোবাসে।
দিন পার হয়ে যায়, ওদের পড়ার চাপও বাড়ে। কিন্তু ইতিমধ্যে কিছু ঘটনা ঘটে ওদের মধ্যে যা ওদের বন্ধুত্বের উপর প্রভাব ফেলে। বেশকিছু দিন ধরে মিনহাজ খেয়াল করছে তার হিসেবের টাকা থেকে মাঝে মাঝেই টাকা কমে যাচ্ছে। প্রথম প্রথম মিনহাজ ভাবে হয়তো সে গুনতে ভুল করছে বা খরচ করেছে যা সে মনে করতে পারছে না। তাই এখন পয়সার হিসেব মিলাতে পারছে না। কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই জানা গেল শুধু মিনহাজ নয় , সবারই টাকা গায়েব হচ্ছে, যা তারা প্রথমে বুঝতে পারেনি। এই টাকা চুরিকে কেন্দ্র করে চার বন্ধুর মধ্যে একটা মন কষাকষি চাপা ভাবে শুরু হয়ে গেছে।
মিনহাজের পারিবারিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয় বলে মিনহাজের বারে বারে মনে হতে লাগলো সবাই তাকে এর পেছনে সন্দেহ করছে না তো?!এসব ভাবনা চিন্তাতে মিনহাজ মন মরা হয়ে থাকতে লাগলো। স্বতস্ফূর্ত মেয়েটা চুপচাপ হয়ে যাওয়া বিজয়ের চোখে এড়িয়ে গেল না। সে খেয়াল করেছে উচ্ছল প্রাণবন্ত মিনহাজ আজকাল কেমন চুপচাপ ক্লাসে বসে থাকে।
একদিন থাকতে না পেরে বিজয় কলেজে সোজাসুজি মিনহাজকে জিজ্ঞাসা করে ফেলে তার এই মানসিক পরিবর্তনের কারণ। অনেক জিজ্ঞাসার পর মিনহাজ তাদের মেসের ব্যাপারটা বিজয়কে খুলে বলে। এমন কি তার মনের ভাবটাও বিজয়ের কাছে প্রকাশ হয়ে যায় তার কথাবার্তাতেই।বিজয় মিনহাজকে আশ্বাস দেয় দু’দিনের মধ্যে সে এই ব্যাপারের নিষ্পত্তি করবে। এইবলে সে উঠে পরে আর যাওয়ার সময় মিনহাজকে বলে যায় – “শোনো অর্থনৈতিক জোর না থাকা মানে এই নয় যে তুমি চোর, তাই নিজেকে ছোট ভাবা বন্ধ করো, আসছি। ভরসা রেখো আমি এর নিষ্পত্তি করবোই …… ।
মিনহাজের সঙ্গে কথা বলে বিজয় এটুকু ভালোই বোঝে যে টাকা পয়সা চুরি যাওয়ার পেছনে এদেরই চারজনের মধ্যে কারোর হাত আছে আর নয় তো এমন কেউ যে ওদের মেসে হামেশাই যায়। খোঁজ খবর করা শুরু করল বিজয়। মিনহাজদের মেসের সামনেই একটা পানের দোকান আর একটা কনফেকসনারীর দোকান আছে। সেখানে খোঁজ খবর করে বিজয় জানতে পারলো যে ওদের মেসে তেমন কেউ আসে না,একমাত্র বাড়ির লোক ছাড়া। তবে তুলির বাড়ির লোককে কেউ কখনো দেখেনি।বিজয় মিনহাজের কাছ থেকে সবার বাড়ির ঠিকানা নেয়। কথায় কথায় মিনহাজ কে তুলির ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে মিনহাজ স্বীকার করে যে সে তুলির বাড়ির লোকেদের কখনো দেখেনি, তবে তাদের মেয়ের কষ্ট যাতে না হয় সেদিকে তাদের খুব নজর, কারণ কেউ না এলেও, তুলি তার প্রয়োজনের টাকা সব সময়ই পেয়ে যায় ….. কারণ এই ছয় মাস হলো তুলি তিনটে ফোন ভেঙেছে, কিন্তু নতুন ফোন কিনতে ওর কোনো অসুবিধা হয়নি।
বিজয় আজ রসুলপুর থেকে ফিরছে।বিজয়ের আজ মনটা খুব ভালো আছে, সে পেরেছে মিনহাজকে দেয়া কথা রাখতে, আজ সে জানে সত্য কি …..। স্টেশন থেকে সে সোজা চলে এলো মিনহাজদের মেসে।ইতিমধ্যেই সে মিনহাজকে ফোন করে তার আসার কথা আর সবাইকে উপস্থিত থাকার কথা বলে দিয়েছে।ঘরে ঢুকে সবাইকে লক্ষ্য করে বিজয় জানায় যে সে এই মুহূর্তে জানে কে টাকা পয়সার ব্যাপারে জড়িত। বিজয়ের কথাতে সবাই সচকিত হলে বিজয় জানায় কিভাবে সে এই ব্যাপারে জানলো এবং এই ঘটনার নিষ্পত্তি করার কথা ভাবলো। বিজয় সবার উদ্দেশ্যে জানায়, যে এব্যাপারে জড়িত সে যদি নিজে থেকে সবটা স্বীকার করে নেয়, তবে বিজয় কথা দিচ্ছে যে বাকিরা যাতে তার ব্যাপারে জানতে না পারে সে ব্যবস্থা সে করবে। বিজয় কিছুক্ষণ চুপ থেকে ওদের সুযোগ দিলো।কিন্তু কোনো লাভ হলো না, তাই বাধ্য হয়ে বিজয় সব প্রমান টেবিলে নামিয়ে রাখলো সঙ্গে একটা টেপ রেকর্ডার ও। টেপ রেকর্ডার অন করে দিতেই একটা গলা ভেসে উঠলো ……” তুমি তো দেখতেই পাচ্ছ বাবা আমাদের অবস্থা, কোনো রকমে চাষ করে দিন চলে আমাদের।তুলি পড়ায় ভালো বলে শহরে পাঠিয়েছি পড়াতে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল করেছি।” বিজয় কারণ জানতে চাইলে তুলির বাবার গলা শোনা গেলো ” কি বলবো বাবা মেয়ে শহরে গিয়ে এমন সব জিনিস চাইতে লাগলো যা আমার পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। ওর কথা হলো দামি দামি ফোন, জামা কাপড় ,সোনার গয়না, হোটেলে গিয়ে খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি ছাড়া সবার সঙ্গে চলা যাবে না, নয় তো ওকে সবাই ছোট শহরের সস্তা মেয়ে ভাববে।” বিজযের গলা ভেসে ওঠে ” এমন কেনো বলছেন আপনি তো ওকে ফোনের টাকা পাঠিয়েছেন, যখনই ওর দরকার পড়েছে।” শুনে তুলির বাবার বিস্মিত গলা শোনা গেলো…..”আমি তো কোনো ফোনের টাকা পাঠাই নি……আমি তো শুধু ওর মাস খরচের জন্য আট হাজার টাকা পাঠাই। তাও অনেক কষ্ট করে। কখনো কখনো লোকের কাছে ধার করে……।
এই পর্যন্ত হতেই বিজয় টেপ রেকর্ডার বন্ধ করে দিলো। সবাই স্তব্ধ…..সবার কাছে প্রকাশ হয়ে গেলো কে টাকার হেরফের করেছে। বিজয় ,টেবিলে নামিয়ে রাখা ১২০০০/-,১৮০০০/-,১৬০০০/- টাকার ফোন কেনার রসিদ গুলো দেখিয়ে, মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বলে , “তোমাকে কথা দিয়েছিলাম এই ঘটনার নিস্পত্তি করবো…..আর কখনো নিজেকে ছোটো ভাববে না।”

বিজয় রাস্তায় বেরিয়ে এলো। মনে মনে ভাবতে লাগলো শুধুমাত্র নিজেকে বড়লোকের মেয়ে প্রমাণ করতে কি করে কেউ এতটা নামতে পারে। মানুষের মন বোঝা দুষ্কর। মিনহাজের কথা ভেবে বিজয়ের গর্ব হয় যে মিনহাজ কখনো নিজেকে লুকায় নি …..আর সবাই মিনহাজের সত্তাকেই ভালোবাসে। বিজয়ের মনটা কানায় কানায় ভোরে যায় এই ভেবে যে সঠিক মানুষকেই পছন্দ করে …. মনে মনে বলে ওঠে বিজয় ” ভালো থেকো,খুশি থেকো মিনহাজ ……

 

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY