সেই অদ্ভুত দৃষ্টি যেন আমাকে গ্রাস করছে ধীরে ধীরে আর আমি মিশে যাচ্ছি সহস্র তারার মাঝে!!!। লাকী ফ্লোরেন্স কোড়াইয়া এর ভিন্নমাত্রার ধারাবাহিক রহস্যময় গল্পের ৩য় ও শেষ খন্ড ‘’তিনি একজন’’

308
লাকী ফ্লোরেন্স কোড়াইয়া

”তিনি একজন”

-৩য় ও শেষ খন্ড

লাকী ফ্লোরেন্স কোড়াইয়া

পাখির কিচির মিচির শব্দে ঘুম ভেংগে গেল।চোখ মেলে প্রথমে চমকে উঠলাম।লাফ দিয়ে উঠে বসলাম।কোথায় আছি বোঝার চেষ্টা করলাম।মনে পড়ল গতরাতের কথা।ফুলের মিষ্টি সুবাস পেলাম।কি ফুল মনে করতে পারলাম না।দূরের শালবনের চিকন মসৃণ মেঠো পথটা অস্পষ্ট ভাবে ধরা দিল।ভোরের এই মিষ্টি হাওয়া আর নির্জন রাস্তায় হাঁটার লোভ সামলাতে না পেরে ফ্রেশ হয়ে শালটা গায়ে জড়িয়ে বেড়িয়ে পড়লাম।খানিকক্ষণ হাটাঁহাঁটি করলাম সাদা মসৃণ মেঠোপথ ধরে। সাতটা পঁচিশ বাজতে দেখে ফিরে এলাম বাংলোতে।দো’তালাতে উঠতে যাবো,এমন সময় পিছন থেকে রোহানের গলা শুনতে পেলাম।আপা,কফি চলবে?পিছন ফিরে রোহানকে গুড মর্নিং দিয়ে বললাম,কফি হলে মন্দ হয় না।আমরা কফি নিয়ে বসতেই ওরা সবাই নিচে নেমে এল।সুতরাং একসাথে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম।সাজেক খুব দ্রুত নাস্তা শেষ করে অসিতকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল।সীতা,রুহি আর আমি রোহানের সাথে বাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
সন্ধ্যার সময় রোহান জানালো পাশেই কলেজের মাঠে পূজোর উৎসব হবে।আমরা সবাই গেলাম রোহানের সাথে।কলেজের মাঠে পা দিতেই মনে হতে লাগল জায়গাটা বেশ পরিচিত।আগে কখনো এসেছি কিনা মনে করার চেষ্টা করলাম।না মনে পড়ছে না।হঠাৎ একটা পরিচিত কণ্ঠ কানে এল।মনের বা ব্রেনের উপর চাপ প্রয়োগ করে কোন কাজ করা উচিত নয়।আর এর ফলও ভালো হয় না।কে বলল?সাথে সাথে ঘাড় ঘুরালাম।কেউ নেই তো!পরক্ষণেই বুজতে পারলাম সামনের মঞ্চ থেকে ভেসে এসেছে কথাটা।মঞ্চে নাটক হচ্ছে।একজন সাধু তাঁর এক শিষ্যকে উপদেশ দিচ্ছে।কিন্তু আমার মন সেদিকে দিতে পারলাম না।কথাটা তো গতকাল রাতে তিনি আমায় বলেছেন।তবে আজ……কি মনে হতেই হাত ঘড়িটার দিকে তাকালাম।সময় টা ও যেন ঠিক মিলে গেল।সন্ধ্যা ৭:২৫ মিনিট। বুঝতে পারলাম না কেন ৭:২৫ মিনিটে আটকে যাচ্ছি!তবে এটা কী অদ্ভুত কোন ঘটনা?কেউ লক্ষ্য করছে কিনা জানি না। বুঝতে পারছি না।আমি ঘামতে শুরু করলাম।নীলদাঁড়া বেয়ে ঘাম নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।পরিবেশটা অসহ্য মনে হচ্ছে।মুহুর্তেই যেন সব পালটে গেল।চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল।আসেপাশে কেউ নেই। সামনে আলোকিত মঞ্চ।মঞ্চে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন।মাঠে আমি একা।তিনি বলে চলছেন,পৃথিবীতে অনেক সত্য আছে,যার উত্তর না জানাই ভাল।আবার সব প্রশ্নের উত্তর পেতে হবে, এমন ভাবাটা ও ভুল।অদ্ভুত জীবন মানুষের!আগের মতই অদ্ভুত আবেগী কণ্ঠে বললেন,আপনার এবারের লেখাটা সত্যি খুব ভালো হবে।কাঁপুনি দিয়ে জ্বর অনুভব করলাম।হয়তো জ্ঞান হারাচ্ছি।হঠাৎ কাঁধে প্রচন্ড ঝাঁকুনি অনুভব করলাম।চমকে ফিরে তাকালাম।যেন কতবছর পর ঘুম থেকে জেগে উঠলাম।কি রে ফ্লোরা,কোন জগতে আছিস্?এত মনোযোগ দিয়ে কী দেখছিস শূন্য মঞ্চে?কেমন একটা হাস্যকর কণ্ঠেই জিজ্ঞেস করল সীতা।কী জবাব দিব,ভেবে পেলাম না।বললাম-হুম,চল যাওয়া যাক।বাংলোতে ফিরে ওদেরকে জানিয়ে দিলাম আমি রাতে খাবো না।বলেই চলে এলাম উপরে আমার রুমে।প্রচন্ড ক্লান্তিতে যেন শরীর ভেংগে আসছিল।বিছানায় গাঁ এলিয়ে দিতেই একরাশ সাদা কালো ঘুম এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল ঘুমের অতল পুরীতে।
পরদিন যখন ঘুম ভাঙলো,আমি নিজেই অবাক!সকাল৯:০০ টা!ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই রুহি বলে উঠল,যাক্ বাবা,বেঁচে ফিরলি তাহলে!মানে? ভ্রু বাঁকা করে জানতে চাইলাম।সীতা বলল,একশবার ডাকাডাকি করেছি।মোবাইল টা দেখ,কতবার কল করেছি!মনে পড়ল,গতকাল রাতে তো মোবাইল ব্যাগ থেকে বের ই করা হয়নি।সে যা হোক,নাস্তা করে সবাই একসাথে বেড়িয়ে পড়লাম।অনেক ঘুরাঘুরি করলাম।ছবি তুললাম।দুপুরে বাংলোতে ফিরতেই সাজেক ফোন করে জানালো ওদের ফিরতে দেরি হবে।অজ্ঞতা আমরা লাঞ্চ সেরে নিলাম।রুহি ও সীতা ও চলে এল আমার রুমে।হঠাৎ আমার মোবাইল টা বেজে উঠল।রোমানা জানালো গত সপ্তাহের প্রোগ্রামের রিপোর্ট টা মেইল করে দিতে।আমি রিপোর্ট টা পাঠিয়ে দিলাম।ইতিমধ্যে ওরা ঘুমিয়ে পরেছে।আমিও চোখ বন্ধ করলাম।সাজেকের ফোনে ঘুম ভাঙলো।আমরা নিচে নেমে এলাম।দেখলাম ওরা তিনজন কফি নিয়ে অপেক্ষা করছে।সবাই মিলে দারুণ মজা করে খেতে লাগলাম।কফি খেতে খেতে মনে হল আজ খবরের কাগজ পড়া হয়নি।রোহানের থেকে কাগজটা চেয়ে নিয়ে পাশের টেবিলে চলে এলাম।ওরা কি নিয়ে গল্পে মজেছে।চারদিকে বেশ অন্ধকার মনে হল।কয়টা বাজে দেখার জন্য ঘড়িতে চোখ রাখলাম।আবার ও আৎকে উঠলাম।৭:২৫মিনিট! মনটা স্বাভাবিক করার জন্য খবরের কাগজে চোখ দিলাম।ঘেঁটে পড়তে লাগলাম।হঠাৎ একটি হেডলাইনের উপর।হেডলাইনটিতে লেখা “প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী”। পাশে একজনের ছবি।সুন্দর চেহারার একজন মানুষের ছবি।বয়স ৩৫-৪০ হবে।বুদ্ধিদীপ্ত চোখ,গভীর দৃষ্টি ঠোঁটের কোণে লেগে আছে এক চিলতে রহস্যময় হাসি,যেন এক্ষুণি কথা বলে উঠবেন।নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছি না!আমার দেখা সেই তিনি!যার সাথে মাত্র দুইদিন আগে আমার কথা হয়েছে।সেই “অদ্ভুত রহস্যময় মানব “।নি:শ্বাস বন্ধ করে পড়তে লাগলাম।বড় করে লেখা-আজ বি এল কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবীর আহমেদ এর প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী।এক বছর আগে আজকের দিনে সন্ধ্যা ৭:২৫ মিনিটে এক বাস দুর্ঘটনায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।বি,এল কলেজ মানে গতকাল আমরা যে কলেজেে অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলাম।এটা কি করে সম্ভব? অস্পষ্ট গলায় বলে উঠলাম।ওরা ফিরে তাকালো।ঝাঁকুনি দিয়ে জ্বর অনুভব করলাম।ওরা এগিয়ে আসতেই বলতে লাগলাম,গত পড়শু দিন বাসে উনার সাথে কথা বললাম!গতকাল মঞ্চে ও উনাকে দেখলাম!সেই চোখ,সেই মুখ,সেই হাসি…..ওরা হয়তো কিছু বলাবলি করছিল।শুনতে পাচ্ছি অনেক দূর থেকে একটি কণ্ঠ, আপনি তো লেখক,জানি এবার আমাকে নিয়ে লিখবেন।আপনার এবারের লেখার উপকরণ আমি-আবীর আহমেদ।লিখুন।জীবনে অনেক ঘটনা ই ঘটে যার সাথে বাস্তবের কেন মিল থাকে না।আবার সব প্রশ্নের উত্তর ও পাওয়া যায় না।সত্যি বলছি,আপনার এবারের লেখাটা অন্যরকমই হবে।নির্মল এক রহস্যময় হাসির রেখা যেন ছড়িয়ে পড়ল ছবির চারপাশে।আমর মাথাটা দুলে উঠল।চোখ ঝাপসা হয়ে এল।অনুভব করলাম আমি যেন হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছি।হয়তো ওরা আমাকে দু’তালায় নিয়ে যাচ্ছে।বাস্তব থেকে বিচ্ছিন্ন হলাম।স্পষ্টই দেখতে পেলাম কোন এক জোছ্না রাতে উনি আমার মুখোমুখি।উনার সেই অদ্ভুত দৃষ্টি যেন আমাকে গ্রাস করছে ধীরে ধীরে আর আমি মিশে যাচ্ছি সহস্র তারার মাঝে!!!

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY