আমিও প্রাণপনে লিখবো … ওপার বাংলার কবি চিরশ্রী দেবনাথ বড় দিন উপলক্ষে লিখেছেন ”বড়দিনের করমচা ”

279

বড়দিনের করমচা

                          চিরশ্রী দেবনাথ

যীশুখ্রিষ্টকে আমি তেমন করে চিনি না। ক্যারল শব্দটিই আমি অনেক বড়ো হয়ে শুনেছি। তবে যতবারই চোখ বন্ধ করে যীশুখ্রীষ্টকে ভাবার চেষ্টা করি, আমার মনে হয় একটি অনেক উঁচু পর্বতশৃঙ্গ, সেই শৃঙ্গে ওঠার মাঝপথে যীশুবাবু দাঁড়িয়ে আছেন। জোব্বার রঙ বদলে গেছে। হালকা সবুজ, মাথায় গোলাপের মুকুট, ঠোঁটে গভীর হাসিটি তেমনই আছে। ধূসর মাঠ থেকে সাদা মেষের দল উঠে যাচ্ছে ধারালো পাকদন্ডি মেয়ে, দুহাত দিয়ে যীশু সরিয়ে দিচ্ছে আকাশ থেকে নেমে আসা অকাল মেঘ। এই যীশু আড়চোখে পৃথিবীর দিকে তাকান। খুব বেশি তিনি কি দেখেন আজকাল?

বড়দিন সম্পর্কিত কোন স্মৃতিই আমার নেই । কিংবা ক্রিসমাস । খুব শীত পড়ে এইসব দিনগুলোতে । কুয়াশা কুয়াশা থাকে। রোদই প্রায় ওঠে না। একে নাকি বলে পৌষের মাস খাটানি। বৃষ্টি হলে সর্বনাশ। শীতের সব্জি নষ্ট। ফুলকপিতে পোকা, লাউ পানসে। শাকের পাতায় পচন। আর এইসব পচন ধরা সব্জি তুলে কৃষকের ঘরণী রাঁধবে ছালন। বৃষ্টির ছালন, পরিশ্রমের হেরে যাওয়ার ঝাল জীবন।

ছোটবেলায় ছুটি থাকতো স্কুল। তারপর একত্রিশে ডিসেম্বর সেই ভয়াবহ দিন, রেজাল্ট আউট। কৈলাসহর খুব শীত পরত, এখনও হয়তো পরে, গায়ে মেখে নিই না আর আগের মতো। সেসব দিনগুলো ছিল পিকনিক পার্টির দিন। গাড়ির সঙ্গে তুমুল গান। বড়দিনের তিন চারদিন আগে বাজারে প্রচুর শীতের জামাকাপড়, রঙচঙে কম্বল, কমলালেবুর ছড়াছড়ি। জনজাতিদের কেনাকাটা। বড় হতে হতে দেখলাম ক্রিশমাস ডানা মেলছে নিজের মতো করে। দোকানে দোকেনে ক্রিসমাস স্টার , ক্রিসমাস বেল , লাইট লাগানো ঝাউগাছ, সবুজ প্লাস্টিকের ক্রিসমাস ট্রি। লাল কোট, সাদা দাড়ির পরিচিত সান্তাক্লজ। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে এই সময়টায় সেমিস্টার পরীক্ষা চলত। আইরংমারায় দারুণ শীত। বড়দিনের অজস্র কুয়াশা নেমে আসত আমাদের মেসবাড়ির ঘাড়ে মাথায়। আমরা তখন যেন অনেকদূরে থাকা কয়েকটি প্রাণী জেগে আছি ছোট্ট ছোট্ট আলোর গুহায় আমাদের একান্ত জেরুজালেম নিয়ে। তারপরের সাতদিন ছিল অর্কেস্ট্রার দিন। নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর জন্য হাত পা ছোঁড়ার আয়োজন। আমাদের কাজ শুধু গভীররাতে আবছা করে ভেসে আসা লতাকন্ঠী , রফিকন্ঠ , কিশোরন্ঠদের শোনা।

প্রত্যেক বছর পঁচিশে ডিসেম্বর এলে, আমার ছাব্বিশে ডিসেম্বর, দুইহাজার চারের কথা খুব মনে পরে। সেই সুনামী, ভারত মহাসাগরের হৃদয় থেকে উঠে আসা ভয়ঙ্কর প্লাবন জল। নাড়কেলসারি ঘেরা এইসব ভারতমহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ তো কয়েকদিন ধরেই মেতে উঠেছিল বড়দিনের উৎসবে, আনন্দে, ক্রিসমাসের ক্যারলে। ঠিক তার পরের দিনই এই ধ্বংসের মত্ততা। এবং এবার বড়দিনের তিনদিন আগেই আবার ইন্দোনেশিয়ায় সুনামী। উৎসবমুখর মানুষকে এক ঢেউয়ের আঘাতে নিয়ে গেছে সমুদ্রে।

প্রকৃতির কাছে মানুষ হেরে গেছে আবার দেবোপম মানুষ সহ। একটি উৎসবের দিনের সঙ্গে এইভাবেই মিশে যায় যেন কান্নার দিন। ভালোবাসার পাশে যেমন অচেনা থার্মোমিটার, যে কোনদিনই কাছে থাকা অনুভবের ওঠানামা নির্ণয় করতে পারে না, মনে করে যাবতীয় শুশ্রুষা নিয়ে আসবে নতুন বছর, আমিও প্রাণপনে লিখবো …

“সব মুহূর্তে কেন আশা করি তুমি আমাকে বুঝে গেছো

কাল সকালে আর কিছু মনে থাকবে না তোমার

পাখির পালক তুলে এনে বলবে

“রেখে দিও”

যদি সে ফেরত নিতে আসে আগামী শীতে “

লিখেছেন ওপার বাংলার কবি চিরশ্রী দেবনাথ

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY