সংলাপ নিয়ে আশাবাদী, সহিংসতা কাম্য নয়: বার্নিকাট

218
  দৈনিক আলাপ ওয়েবডেস্ক:  বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট বলেছেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও নতুন রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে অনুষ্ঠেয় সংলাপ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, বিদেশি সহায়তা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে সংলাপ খুবই ভালো বিষয়। আমরা কোনো দলকে সমর্থন করি না।  বাংলাদেশে সব সময়ই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিস্থ ইএমকে সেন্টারে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।  এ সময় তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সহিংসতাকে সমর্থন করে না।  কারণ সহিংসতা গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করে।  যুক্তরাষ্ট্র আশা করে, সকল রাজনৈতিক দল ভয় ও ভীতিহীনভাবে শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের সুযোগ পাবে।  সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে।
বাংলাদেশে প্রায় তিন বছর আট মাস দায়িত্ব পালন শেষে আগামী শুক্রবার দেশে ফিরে যাচ্ছেন মার্শা বার্নিকাট। যাওয়ার আগে গতকাল ব্যস্ত সময় কাটান তিনি।  সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাত্ করেন।  এরপর হাজির হন বিদায়ী সাংবাদিক সম্মেলনে।  তখন পরেছিলেন ঐতিহ্যবাহী জামদানি শাড়ি।
সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলা এক অপার সম্ভাবনার বাংলাদেশকে দেখে যাচ্ছি।  রাজনৈতিক বিষয়গুলো প্রতিটি  দেশেই জটিল, বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়।  কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো সারল্য।  এই মানুষগুলোর কথা চিরদিন মনে থাকবে।  আমি যেখানেই যাব সেখানে বাংলাদেশের কথা বলব।  বাংলাদেশে আসার এবং ছেড়ে যাওয়ার সময় আপনার অভিজ্ঞতার পার্থক্য কি? এমন প্রশ্নের জবাবে বার্নিকাট বলেন, পার্থক্য অনেক।  যখন বাংলাদেশে এসেছিলাম তখন দেশটি সম্পর্কে জানা থাকলেও দেখার দৃষ্টিতে এটা ছিল অচেনা দেশ।  কিন্তু এখন সেই দেশ ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে।  কারণ এদেশের মানুষ এতটা ভালোবাসা দিয়েছে যার তুলনা নেই।  এজন্য আমি বাংলাদেশকে ‘গুড বাই’ না বলে বাংলায় বলতে চাই, ‘আবার দেখা হবে’।
আসন্ন নির্বাচন ও সংলাপ নিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের মাত্র ৪৭ বছরের গণতন্ত্র।  এই সময়ে অনেক দূর এগিয়েছে বাংলাদেশ।  তিনি বলেন, সংলাপই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সৌন্দর্য।  বিদেশি সহায়তা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে সংলাপ খুবই ভালো বিষয়।  তবে সংলাপ শুধু কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নয়, সব পর্যায়ে সব সময়ই চলমান থাকা উচিত।  সংঘাত, সহিংসতা একেবারেই কাম্য নয়। তিনি বলেন, এর আগে তৃণমূল পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা হয়েছে।  এটা স্পস্ট যে, তৃণমূলের কর্মীরা বড় দলগুলোর মধ্যে সৌহাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক চায়, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ চায়।
তিনি আরো কোনো দল বা জোট নয়, যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে।  গণতান্ত্রিক মূল্যবোধই বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের অন্তর্নিহিত যোগসূত্র।  তিনি বলেন, জনমতের প্রতিফলন ঘটবে এমন বিশ্বাসযোগ্য ও অবাধ নির্বাচন প্রত্যাশা করে যুক্তরাষ্ট্র।
সম্প্রতি পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনটি প্রণয়নের আগে প্রায় দু’বছর ধরে সরকার বিভিন্ন্ন পক্ষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে।  ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেছে।  কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, আইনে সেই মতামতের প্রতিফলন পাওয়া যায়নি।  এখন যে আইনটি পাস হয়েছে সেটি মতপ্রকাশের জন্য বিপজ্জনক।  এর ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।  গণতান্ত্রিক চর্চার স্বার্থে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আরও আলোচনার মাধ্যমে আইনটি সংশোধনের পক্ষে মত দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এ সংকট নিরসনে আর্থিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ, স্বেচ্ছা প্রত্যাবাসন এবং জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।  যুক্তরাষ্ট্র এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য কাজ করে যাচ্ছে এবং এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি সহায়তা ও সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্যিক কৌশল সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।  আগামী দশ বছরে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হবে।  এক্ষেত্রে বাংলাদেশও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
কয়েক মাস আগে ঢাকায় তার উপর হামলা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নিয়েছে।  মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সঙ্গেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আলাপ হয়েছে।  তাই যাওয়ার সময় এ বিষয়টি মনে রাখতে চাই না।  তবে শুধু রাষ্ট্রদূত নয়, যে কারও উপর এ ধরনের হামলা কখনই কাম্য নয়।
ঢাকা-ওয়াশিংটন সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে
বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেন্স ব্লুম বার্নিকাট গতকাল মঙ্গলবার সকালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাত্ করেন।  বার্নিকাট ঢাকার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে বলে মন্তব্য করেন।  এ সময় শেখ হাসিনা দেশের বিভিন্ন খাতে তার সরকারের সাফল্যের চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশের উন্নয়ন এবং জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করাই তার একমাত্র লক্ষ্য।  বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
পঁচাত্তরের বিয়োগান্তক অধ্যায়ের পর বাধ্য হয়ে ৬ বছর প্রবাস জীবন কাটিয়ে ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হবার পর দেশে ফিরে আসার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দেশের প্রতিটি প্রান্ত ঘুরে বেরিয়ে মানুষের দুরবস্থা স্বচক্ষে দেখেছি।  সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দেশকে কিভাবে উন্নত করা যায় তা নিয়ে ভেবেছি।  সেই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের আজকের পর্যায়ে উত্তোরণ ঘটেছে।’ দেশের কৃষি খাতের উন্নয়নে তার সরকারের পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আগে এক মওসুমের তরিতরকারি অন্য মওসুমে পাওয়া যেত না।  কিন্তু আমরা এখন বছর জুড়েই সব ধরনের তরিতরকারি পাচ্ছি, এটা আমাদের কৃষি গবেষকদের অবদান।  প্রধানমন্ত্রী এ সময় বার্নিকাটের সর্বাঙ্গীন সাফল্যও কামনা করেন।
বার্নিকাট এ সময় বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নে তার দেশ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।  দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় প্রধানমন্ত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত-উভয়েই সন্তোষ প্রকাশ করেন।
বার্নিকাট বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে ‘চমকপ্রদ’ আখ্যায়িত করে ‘এই প্রজন্মই দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে’ বলে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।  তিনি এ সময় বাংলাদেশের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর পরিশ্রমেরও ভূয়সী প্রশংসা করেন।  এদেশে উত্পাদিত আম এবং লিচুরও প্রশংসা করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ড্যান মজিনা বিদায় নিলে তার উত্তরসূরি হিসেবে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বার্নিকাট।  তার উত্তরসূরি হিসেবে আসছেন মার্কিন মেরিন কোরের সাবেক কর্মকর্তা আর্ল রবার্ট মিলার।
Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY