প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ শেষ, এবার ভোটারদের পালা

250
নির্বাচন কমিশন
ছবি: সংগৃহীত।

বিশেষ প্রতিনিধি: জমজমাট প্রচার-গণসংযোগ, ভোটারের দ্বারে দ্বারে প্রার্থীদের বিরামহীন ছোটাছুটি শেষ। দলের প্রার্থীর জন্য কর্মীদের দৌড়ঝাঁপ ফুরিয়েছে। এবার পালা ভোটারদের। দীর্ঘদিন পরে নৌকা ও ধানের শীষের সরাসরি ভোটযুদ্ধের অপেক্ষায় নগরবাসী। জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সুযোগ পাচ্ছে রাজনৈতিক শক্তিগুলো।

আজ শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) সকাল আটটা থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শুরু হবে। বিরতিহীনভাবে যা বিকাল চারটা পর্যন্ত চলবে। ভোটগ্রহণ শেষে শুরু হবে ভোটগণনা। সবশেষে ঘোষিত হবে ফলাফল।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা শুক্রবার সন্ধ্যায় নির্বাচন ভবনে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেছেন, কোনো ধরনের আশঙ্কার কিছুই নেই। ভোটের পরিবেশ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ থাকবে। ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে আসতে পারবেন এবং ভোট দিয়ে ফিরতে পারবেন। পোলিং এজেন্টদেরও নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলেছেন সিইসি।

১৩ মেয়র প্রার্থী

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৯ দলের ১৩ মেয়র প্রার্থী ভোটযুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন।

উত্তর সিটির ৬ মেয়র প্রার্থী হলেন: আওয়ামী লীগের মো. আতিকুল ইসলাম (নৌকা), বিএনপির তাবিথ আউয়াল (ধানের শীষ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) আহম্মেদ সাজেদুল হক (কাস্তে), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ (হাতপাখা), পিডিপির শাহীন খান (বাঘ) ও এনপিপির মো. আনিসুর রহমান দেওয়ান (আম)। এই সিটিতে সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ৫৪টি পদে ২৫১ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের ১৮টি পদে ৭৭ জন লড়ছেন।

দক্ষিণে মেয়র পদে সাত প্রার্থী হলেন: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নুর তাপস (নৌকা), বিএনপির ইশরাক হোসেন (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টি—জাপার মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলনের মো. আবদুর রহমান (হাতপাখা), এনপিপির বাহরানে সুলতান বাহার (আম), বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো. আকতার উজ্জামান ওরফে আয়াতুল্লা (ডাব) ও গণফ্রন্টের আব্দুস সামাদ সুজন (মাছ)। দক্ষিণ সিটিতে সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলরের ৭৫টি পদে ৩২৭ জন এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের ২৫টি পদে ৮২ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

ভোটকেন্দ্র ও ভোটার

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা এক হাজার ৩১৮টি। ভোটার ৩০ লাখ ৯ হাজার জন।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ভোটকেন্দ্র এক হাজার ১৫০টি। ভোটার ২৪ লাখ ৫২ হাজার জন।

ইভিএমে ভোটগ্রহণ

এবারই প্রথম ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সব কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণ করা হবে।

নিরাপত্তার চাদরে রাজধানী

নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে পুরো নগরী। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়েছে নিরাপত্তা চৌকি। ভোটারদের নিরাপত্তা আর ভোটদান নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ৩ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সাধারণ ভোটকেন্দ্রে ১৬ জন ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে ১৮ জন মোতায়েন রয়েছেন। গড়ে দুই সিটির ২ হাজার ৪৬৮ কেন্দ্রে পুলিশ এবং আনসার ভিডিপির সদস্যই থাকছেন ৪১ হাজার ৯৫৬ জন। আর পুলিশ, এপিবিএন ও ব্যাটালিয়ন আনসারের সমন্বয়ে গঠিত ১২৯টি মোবাইল ফোর্সে থাকবেন ১ হাজার ২৯০ জন, ৪৩টি স্ট্রাইকিং ফোর্সে থাকবেন ৪৩০ জন, রিজার্ভ স্ট্রাইকিং ফোর্সে থাকছেন ৫২০ জন। প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে টিম হিসাবে দুই সিটিতে র্যাবের টিম থাকছে ১৩০টি। গড়ে ১১ জন করে এতে মোট ১ হাজার ৪৩০ জন র্যাব সদস্য আছেন। এছাড়াও দুই সিটিতে র্যাবের ১০টি রিজার্ভ টিম থাকছে, এতে ১১০ জন সদস্য থাকছেন। আর রিজার্ভসহ দুই সিটিতে ৭৫ প্লাটুন বিজিবি দায়িত্ব পালন করছেন। গড়ে ৩০ জন করে মোট ২ হাজার ২৫০ জন বিজিবি সদস্য থাকছেন। সবমিলে দুই সিটিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় অর্ধলক্ষ সদস্য মাঠে আছেন। দুই সিটিতে বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার পর্যন্ত নির্বাচনি অপরাধ দমন ও সংক্ষিপ্ত বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মাঠে থাকবেন ১৭২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৬৪ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট।

পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার পরামর্শ

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ভোটের দিন নগরবাসীকে ছবিযুক্ত আইডি কার্ড সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ।

বহিরাগতদের ঢাকা ছাড়তে এবং অপ্রয়োজনে কাউকে ঢাকায় না আসার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব প্রধান বলেন, “অনেক প্রার্থীর আত্মীয়স্বজন অন্য জায়গা থেকে ঢাকায় এসে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। আপনাদেরকে অনেক ধন্যবাদ। আমরা আশা করবো এখন আপনারা ঢাকা ছাড়বেন।”

যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

নির্বাচন উপলক্ষে শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ কিছু উদ্যোগের সঙ্গে যান চলাচল সীমিত করার উদ্যোগও নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।

৩০ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ঢাকা শহরে কোনো মোটরসাইকেল চলতে পারবে না। অটোরিকশা, গাড়ি, বাস, ট্রাক, পিকআপ, মাইক্রোবাস, এসইউভি, টেম্পু, ট্যাক্সি ক্যাব এবং অন্যান্য যন্ত্রচালিত যানবাহন ৩১ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে।

তবে, অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ডাক ও টেলিযোগাযোগের মত জরুরি সেবা সরবরাহের গাড়ি এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে। নির্বাচন কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে যানবাহন ব্যবহার করতে পারবেন প্রার্থী, প্রার্থীদের এজেন্ট, সাংবাদিক, নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা।

এছাড়াও, বৈধ টিকিট বা কাগজপত্র দেখানো সাপেক্ষে এয়ারপোর্ট, রেল স্টেশন, বাস টার্মিনাল এবং নদী বন্দরগামী যাত্রীরা চলাচল করতে পারবেন।

সিটি ভোট দেখবে ১০ দূতাবাস

ঢাকার দুই সিটি ভোট পর্যবেক্ষণ করবেন বিভিন্ন দেশের ৭৪ বিদেশি পর্যবেক্ষক। ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৯টি দেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) প্রতিনিধি ঢাকা সিটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবেন। এরমধ্যে আমেরিকার ২৭ জন, ব্রিটিশ ১২ জন, সুইজারল্যান্ডের ছয় জন, জাপানের পাঁচ জন, নেদারল্যান্ডসের ছয় জন, ডেনমার্কের তিন জন, নরওয়ের চার জন, অস্ট্রেলিয়ার দুই জন, কানাডার চার জন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পাঁচ জন পর্যবেক্ষক সিটি ভোট পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। এই ৭৪ জনের মধ্যে ৪৬ জন বিদেশি এবং ২৮ জন বাংলাদেশি। তবে এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তারা বলছেন, বিদেশি কোটায় দেশীয়রা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন না। এছাড়া ভোট পর্যবেক্ষণে ইসির অনুমতি পেয়েছেন বিভিন্ন দেশীয় সংস্থার অন্তত ১০১৩ জন পর্যবেক্ষক।

ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা

ঢাকার দুই সিটিতে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা রয়েছেন ৪৫ হাজার ৮০৩ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৮ প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ১৪ হাজার ৪৩৪ সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও ২৮ হাজার ৮৬৮ পোলিং কর্মকর্তা রয়েছেন। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটিতে ১ হাজার ৩১৮ জন প্রিসাইডিং ও ৭ হাজার ৮৫৭ জন সহকারী প্রিসাইডিং ও ১৫ হাজার ৬৯২ পোলিং কর্মকর্তা ভোটগ্রহণ করবেন। অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ১ হাজার ১৫০ প্রিসাইডিং, ৬ হাজার ৫৮৮ সহকারী প্রিসাইডিং ও ১৩ হাজার ১৭৬ পোলিং কর্মকর্তা ভোট নেবেন।

কুয়াশায় ঢাকা থাকবে ভোটের সকাল

আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, আজ মধ্যরাত থেকেই শীতের প্রকোপ বাড়তে পারে। এর সঙ্গে পড়বে কুয়াশা। রাজধানী ঢাকা থেকে কুয়াশার চাদর সরতে সরতে স্থান ভেদে সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় হয়ে যেতে পারে।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY