আন্তর্জাতিক নারী দিবস আজ

375
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
প্রতীকী ছবি।

দৈনিক আলাপ ওয়েবডেস্ক:‌ আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। পৃথিবীর সব নারীর অধিকার রক্ষায় ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয় এবং তা যথাযথভাবে পালনের জন্য পৃথিবীর সব রাষ্ট্রকে আহ্বান জানানো হয়।

প্রতি বছর সারা বিশ্বে ৮ মার্চ একটি স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে পালিত হয়ে আসছে। কোনো কোনো দেশে দিনটি সরকারি ছুটি হিসেবেও পালিত হয়। যেমন- রাশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম, ইউক্রেনসহ বেশ কয়েকটি দেশ। আবার চীন, মেসিডোনিয়া, নেপাল ও মাদাগাস্কারসহ অনেক দেশে এ দিনটিতে কেবল নারীরা সরকারি ছুটি ভোগ করেন। যদিও বাংলাদেশে এ দুটি ব্যবস্থার কোনোটিই নেই; তবে র‌্যালি, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের মধ্যে দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে নারী। হাজারও বাধা উপেক্ষা করে, নিজ যোগ্যতায়। কিন্তু সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নারীর ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন। কর্মক্ষেত্র, চলার পথ, যানবাহন এমনকি নিজ ঘরেও তারা শিকার হচ্ছেন এসব নির্মমতার। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা এর বিচারও পাচ্ছেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নারীদের ওপর এ নির্যাতন ঠেকানো গেলে, সব ক্ষেত্রে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হলে এবং নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলালে আরও এগিয়ে যাবে নারী।

এ অবস্থার মধ্যেই আজ বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রজন্ম হোক সমতার-সকল নারীর অধিকার।’

দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৬৯৭ নারী ধর্ষণ, ১৮২ জন গণধর্ষণ ও ৬৩ নারী ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হন। পরের বছর ১ হাজার ৭০৩ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হন। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার ২৩৭ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় ৭৭ জনকে। ধর্ষণের ঘটনায় আত্মহত্যা করে ১৯ জন। বছরটিতে ২৪৫ জনকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হন ৪ হাজার ৬২২ নারী ও শিশু। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা ১১৮।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্যাতনের শুধু সংখ্যাই বাড়ছে না। হিংস্রতা ও বীভৎসতা বাড়ছে। বাইরের মানুষের পাশাপাশি এমনকি স্বজনের হাতেও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে নারী। এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। ধর্ষণ-নির্যাতনের চিত্র ও ভিডিও মুঠোফোন ধারণ করে তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে ইন্টারনেটে। প্রায় ৭০ ভাগ নারী বর্তমানে সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালে গণপরিবহনে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৫৯ নারী। এ সময়ে ১৬টি ধর্ষণ, ১২ গণধর্ষণ, ৯ ধর্ষণ চেষ্টা ও ১৫টি যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এ সংখ্যা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় উঠে আসা সংবাদের ভিত্তিতে। প্রকৃত ঘটনা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি- বিচার পাবেন না এ শঙ্কায় অধিকাংশ নারী তা প্রকাশ করেননি। এছাড়া গণপরিবহনে যাতায়াতকালে নারীরা অসম্মানজনক আচরণের শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই নারী যৌন নির্যাতনের শঙ্কায় গন্তব্যে পৌঁছার আগেই গণপরিবহন থেকে নেমে যান।

বেসরকারি সংগঠন একশন এইডের জরিপে উঠে এসেছে, গণপরিবহনে রাজধানীতে ৮৪ শতাংশ নারী আচরণ বা শারীরিকভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। রাজধানীসহ দেশের বড় শহরগুলোতে দিনের বেলাতেই যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে নানারকম হেনস্তার শিকার হন নারী যাত্রীদের অধিকাংশ। জরিপে পুরুষ যাত্রীদের হাতে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন ৪২ শতাংশ নারী যাত্রী। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫৩ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে নারীর কম অংশগ্রহণ এবং নারীর প্রতি সহিংসতা বিভিন্ন অর্জনকে ম্লান করে দিচ্ছে। সুশাসনের অভাব এর বড়ো কারণ। সরকারকে এই দিকটায় নজর দিতে হবে। কেননা সার্বিক সুশাসন শুধু নারীর অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করবে না, উন্নয়নের জন্যও এটি অপরিহার্য।

সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’—ডব্লি­উইএফ এর বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সব দেশের ওপরে স্থান পায় বাংলাদেশ। পাশাপাশি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের সাবেক শিক্ষক জঁ দ্রেজ তার ‘ঝোলাওয়ালা অর্থনীতি ও কাণ্ডজ্ঞান বইয়ে বাংলাদেশ’ বন্দনায় লিখেছেন—‘সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে ভারত থেকে বাংলাদেশ এগিয়ে। লিঙ্গবৈষম্যের অন্যান্য সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ভারতের চেয়ে ভালো। এমনকি কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণেও ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে।’ এমনকি নারীর কর্মসংস্থানের দিক দিয়ে এগিয়ে থাকা দক্ষিণ এশিয়ায় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

২০১১ সালে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার ছিল ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ২০১৭ সালে ৭০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়। গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬ সালে বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীর অগ্রগতি ছিল ৬২ শতাংশের বেশি যা ২০১৮ সালে দাঁড়ায় ৭১ শতাংশে।

নারীর অগ্রগতির সঙ্গে দেশে দিন দিন বেড়েছে নারীর জন্য বাজেট বরাদ্দ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে নারী উন্নয়নে বাজেটে ছিল ২৭ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। সেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু জানান, দেশে নারীরা এগোচ্ছে- এটি নিশ্চয়ই অহঙ্কারের। কিন্তু যৌন নির্যাতন আর ধর্ষণের ঘটনা যে প্রতি বছর লাফিয়ে বাড়ছে- সেটি কোন অহঙ্কারের? আমাদের সব অর্জন ম্লান হয়ে যাচ্ছে এমন বর্বরকাণ্ডে। তিনি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, দেশে নারীদের কোনো নিরাপত্তা নেই। এখানে রাষ্ট্র, সরকার সমাজ চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। যেখানে নারী ধর্ষণ নির্যাতনের শিকার হবে- সেখানে শুধু প্রশাসন নয়, সংসদ সদস্যসহ প্রতিটি পর্যায়ে থাকা জনপ্রতিনিধিদেরও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

নারী দিবসের কর্মসূচি: মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আজ সকাল ১০টায় রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপনের মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে আলোচনা, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন ও জাতীয় পর্যায়ে ৫ জন শ্রেষ্ঠ জয়িতাকে সম্মাননা দেয়া হবে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বিকাল সাড়ে ৩টায় সংস্থার মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। বিকাল সাড়ে ৪টায় শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের উদ্যোগে নির্যাতন বিরোধী মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হবে।

দিবসটি উপলক্ষে ১৬ থেকে ১৮ মার্চ দেশজুড়ে নারী উন্নয়ন মেলা আয়োজন করা হবে। এছাড়া বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY