জনসভা থেকে ৭ দফা ঘোষণা ,আলটিমেটাম দেবে বিএনপি

153

দৈনিক আলাপ ওয়েবডেস্ক: রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা থেকে সব দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে সরকারকে আলটিমেটাম দেবে বিএনপি।

এতে সংসদ নির্বাচন ঘিরে দলের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে ৭ দফা ও ১২টি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ঘোষণা দেয়া হবে।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে দফাগুলো মেনে নেয়ার দাবি জানানো হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি মেনে না নিলে আন্দোলনে নামবে বিএনপি। জনসভা থেকে এ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা দেয়ার সম্ভাবনা আছে। নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্য, সন্ত্রাসবাদকে মদদ না দেয়া, ভবিষ্যতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট, জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেয়াসহ আগামী দিনের করণীয় তুলে ধরা হবে এদিনের সমাবেশে। বিএনপি এককভাবে জনসভা করবে। জোটের শরিক এবং বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ার দলগুলোকেও আমন্ত্রণ জানানো হবে না। পুলিশের অনুমতি সাপেক্ষে শনি বা রোববার জনসভা হবে। দলীয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বিএনপির জনসভা থেকে যে বার্তা দেয়া হবে, আগামী নির্বাচনের আগে রাজনীতিতে তা ভিন্নমাত্রা পাবে। জনসভায় কোনো রাজনৈতিক দলের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা তুলে ধরার নজির খুব বেশি নেই। এজন্য বিএনপির এই অনুষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়াও দেশি-বিদেশি মহলের বিশেষ দৃষ্টি থাকবে। দলের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও তাকিয়ে আছে জনসভার দিকে।

সূত্র জানায়, এককভাবে জনসভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর আপত্তির বিষয়টির সুরাহা করতে চাইছে দলীয় হাইকমান্ড। এ জন্য জামায়াতের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের করণীয় নির্ধারণের পরিকল্পনা নিতে চাইছে বিএনপি। জোটের শরিকদের না চটিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের সংশ্লিষ্ট দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে চাইছে তারা। এ কৌশলের অংশ হিসেবেই কাউকে আমন্ত্রণ না জানিয়ে এককভাবে জনসভা করবে দলটি। সে লক্ষ্যে ব্যাপক জনসমাগমের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। এই জনসভায় ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে সর্বোচ্চসংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতি নিশ্চিতের মাধ্যমে রাজধানীতে বড় ধরনের শোডাউন করতে চায় বিএনপি।

এদিকে শনিবারের জনসভার জন্য পুলিশ এখনও বিএনপিকে অনুমতি দেয়নি। দলের প্রচার সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী যুগান্তরকে বলেন, বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল বৃহস্পতিবার ডিএমপিতে গেছে। ভারপ্রাপ্ত ডিএমপি কমিশনার জানিয়েছেন, শনিবার সম্ভবত তারা অনুমতি দিতে পারছেন না। তিনি রোববার জনসভা করার জন্য আবেদন দিতে বলেছেন। এ্যানী বলেন, রোববার শুধু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার জন্য আমরা ইতোমধ্যে আবেদন করেছি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, জনসভা থেকে আমরা আমাদের নীতিনির্ধারণী বক্তব্য দেব। আমাদের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা, কর্মসূচি এগুলো আসবে। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিএনপি দাবিগুলোর সঙ্গে সরকারের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির মিল আছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সব দল নিয়ে একটি বৃহৎ জাতীয় ঐক্য গড়ার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে আমরা ঐক্য প্রক্রিয়ায় খুব কাছাকাছি এসে গেছি।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ইতিমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন ২০৩০ রূপকল্পে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে কিভাবে দেশ পরিচালিত হবে তা তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য, ভবিষ্যতে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টসহ সবকিছু উল্লেখ আছে। এর সঙ্গে আরও কিছু বিষয় যোগ করে আমরা জনসভায় দলের একটি কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করব। তিনি বলেন, সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে বিএনপি কিছু শর্ত দিয়েছে। শর্ত না মানলে আন্দোলন কর্মসূচি ছাড়া বিএনপির বিকল্প নেই।

দলীয় সূত্র জানায়, নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির দাবি-দাওয়া ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য চূড়ান্ত করতে বেশ কয়েকদিন ধরে দলের নীতিনির্ধারকরা বৈঠক করছেন। এর আগে দলের থিঙ্কট্যাঙ্ক ও দল সমর্থিত সুশীল সমাজের কাছ থেকে বিএনপির ভবিষ্যৎ রূপকল্পের ব্যাপারে পরামর্শ নেয়া হয়েছে। সবকিছু পর্যালোচনা করে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে একটি খসড়া দাবি ও লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। খসড়া দাবি ও লক্ষ্য কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং লন্ডনে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অবহিত করে তাদের অনুমোদনও নেয়া হয়েছে, যা জনসভায় ঘোষণা করা হবে।

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ৭ দফা দাবি : ১.(ক) বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নিঃশর্ত মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার। (খ) সব বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মুক্তি, সাজা বাতিল ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার। (গ) নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন মামলা না দেয়ার নিশ্চয়তা আদায়। (ঘ) পুরনো মামলায় কাউকে গ্রেফতার না করা। (ঙ) কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সাংবাদিকদের ন্যায্য আন্দোলন এবং সামাজিক ও গণমাধ্যমে মতপ্রকাশের অভিযোগে গ্রেফতার ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তির নিশ্চয়তা আদায়। ২. ভোটের তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দেয়া। ৩. আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন করা। ৪. আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা। ৫. নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত এবং সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে তাদের ওপর কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ না করা। ৬. সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সশস্ত্র বাহিনী নিয়োগ নিশ্চিত করা। ৭. নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার বিধান নিশ্চিত করা।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গেলে ১২ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য : ১. রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা। ২. সব প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসানে জাতীয় ঐকমত্য গঠন। ৩. রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দলীয়করণের ধারার বদলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ৪. রাষ্ট্রক্ষমতায় গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। ৫. স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা নিশ্চিত করা। ৬. স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবচ দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনীকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী ও কার্যকর করা। ৭. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ৮. দুর্নীতি প্রতিরোধে দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠানগুলোকে যথাযথভাবে সংস্কার ও কার্যকর করা। ৯. সব নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা। ১০. সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব এবং কারও সঙ্গে বৈরিতা নয় এ মূলনীতিকে অনুসরণ করে জাতীয় মর্যাদা এবং স্বার্থ সংরক্ষণ করে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করা। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সৎ প্রতিবেশীসুলভ বন্ধুত্ব ও সমতার ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ইত্যাদি ক্ষেত্রে আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার কার্যকর উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ১১. কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদকে মদদ না দেয়া এবং কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেয়া। ১২. সর্বনিম্ন আয়ের নাগরিকদের মানবিক জীবন নিশ্চিত করে, আয়ের বৈষম্যের অবসানকল্পে অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ এবং শ্রমজীবী জনগণের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা।

ঢাকা বিভাগের সহসাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম আজাদ বলেন, জনসভার জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলার মধ্যে নরসিংদী, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ জেলা এবং এসব জেলার সব উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় থেকে নেতাকর্মীদের ঢল নামানো হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ঢাকা মহানগর বিএনপি ও কেন্দ্রীয় অঙ্গসংগঠনের নেতাদেরও সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY