‘৭ দফা এ দেশের জনগণের দাবি’

335

বিশেষ প্রতিনিধি: ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের মানুষকে দেশের মালিকানা ফেরত দেওয়ার এবং রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন।

বুধবার বিকালে সিলেট রেজিস্ট্রি মাঠে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি।

ড. কামাল হোসেন বলেন, আমরা ৭ দফা কর্মসূচি দিয়েছি। সংবিধানের ৭নং অনুচ্ছেদে রয়েছে জনগণ দেশের মালিক নেই। কিন্তু বর্তমানে জনগণের সেই মালিকানা নেই। এটা আদায় করে নিতে হবে। আমাদের ১ নম্বর দাবি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। এর সঙ্গে আরও ৬টি দাবি রয়েছে। এসব দাবির কথা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে দিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, ৭ দফাকে হালকাভাবে নেবেন না। এটা অনেক মূল্যবান। এটা জনগণের হারিয়ে ফেলা অধিকার, দেশের মালিকানা ফিরিয়ে আনার দাবি। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল, জনগণ ক্ষমতার মালিক হবে। সেটি বাস্তবায়ন করতে হবে।

গণফোরামের সভাপতি বলেন, দেশের মুষ্ঠিমেয় মানুষের উন্নয়নে উন্নয়ন হয় না। আমরা চাই, ১৬ কোটি মানুষের উন্নয়ন। আমরা ইনশাআল্লাহ বিজয়ী হব। আমাদের বিজয় অনিবার্য।

জনসভা থেকে আবারো কারান্তরীণ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান ড. কামাল হোসেন।

সমাবেশে প্রধান বক্তার বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সিলেটবাসী অনেক ইতিহাসের জন্ম দিয়েছেন। আজ আরেকটি ইতিহাসের জন্ম দিচ্ছেন। এই ইতিহাস হচ্ছে গণতন্ত্র মুক্তির ইতিহাস।

তিনি বলেন, আজ থেকে নতুন লড়াইয়ের শুরু হলো। বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে আমাদের অধিকার। গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে হবে। সরকারকে পরিষ্কার করে বলতে চাই, তফসিল ঘোষণার আগে পদত্যাগ করুন। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন। ইভিএম দেয়া চলবে না। ডিজিটাল চুরি করতে দেয়া হবে না। নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে।

এর আগে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সহিংসতার রাজনীতির বিপরীতে শান্তির বাংলাদেশ গড়তে কাজ করছি। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে আগামী ৪ নভেম্বর বনানী কবরস্থানে গিয়ে ১৯৭৫-এর শহীদদের কবর জিয়ারত করবো। এরপর সংসদ ভবন এলাকায় জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করতে চাই। সেখান থেকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিককৃতিতেও শ্রদ্ধা জানাতে চাই।

জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, আজ দেশ ডাকাতের হাতে পড়েছে তাই দেশকে বাচাতে হবে। এর থেকে বাচতে হলে শুধু নিজেরা মাঠে নামলে হবে না। জনগণকে মাঠে নামাতে হাবে। তিনি বলেন, আমরা সরকার কে বলতে চাই শতবাধা শত্বেও জনতা রাস্তায় নেমে আসছে। এ লড়াই বাচার লড়াই, ভোটের লড়াই, গণতন্ত্রের লড়াই। এ লড়াইয়ে জিততে হবে আমাদের। আজকের এই মাঠে ৬০ এর দশকে অনেক জনসভা করেছি। আজকে বক্তব্য দিবো না দেশ ডাকাতের হাতে পড়েছে। এদেরকে পরাজিত করে বিজয়ের জনসভা করবো এখানে। তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, কাল থেকে আমাদের অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছেন। আর একজনকে গ্রেফতার করলে জনগণকে সাথে নিয়ে রাজপথে নামবো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, আমাদের ৭ দফা এ দেশের জনগণের দাবী। সেগুলো বাস্তবায়ন করতে ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি। কারণ এ সরকার গায়ের জোরে সরকার, তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি। আবারো ভোটার ছাড়া নির্বাচন করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। তিনি বলেন, এ সরকার জনগণকে ভয় পায়। কারণ তারা এদেশের যত মানুষ গুম, খুন, দেশের সম্পদ লুট করেছে তার জবাব দিতে হবে। সেই ভয়ে ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। আপনারা যত ভয় পান না কেন জনগণের দাবী মেনে নিতে হবে। বিএনপির এই নেতা বলেন, ভোটের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালোদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে, সংসদ ভেঙে দিতে হবে, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নিবাচন দিতে হবে, সেনাবাহিনী মোতায়েন করতেই হবে। এছাড়া কোনো নির্বাচন হবে না। বিএনপির এই নেতা বলেন, বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে লাখো লাখো মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে। দেশনেত্রীকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে রাখা হয়েছে। কেনো? আমাদেরকে বাদ দিয়ে তারা আগের মতো নির্বাচনের খেলা খেলতে চায়। সরকারকে বলছি, কেনো আপনারা জনগনকে ভয় পান। ভয় পান এই জন্য যে, সিলেটের কৃতি সন্তান ইলিয়াস আলীসহ শত শত নেতা-কর্মীদের গুম করেছে তার জবাব দিতে হবে। এই সরকার ভয় পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ লুট করেছে, স্বর্ণ লুট করেছে, কয়লা লুট করেছে, শেয়ারবাজার লুট করেছে তার জবাব দিতে হবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, আজ জাতীয় ঐক্যের যাত্রা শুরু হলো। আমরা ঐক্য তৈরি করেছি করাণ যারা ক্ষমতায় আছে তারা জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। তাই তাদের ক্ষমতায় থেকে সরাতে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। তাই সরকারের বিরুদ্ধে সব গণতন্ত্রকামী দল ও মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তাদের পতন অনিবার্য। তিনি বলেন, আমরা সরকারকে বলবো আপনারা সংলাপে আসুন, আলোচনায় না আসলে কিভাবে সংলাপে বাধ্য করতে হয় তা জনগণ জানে। আপনারা বড় বড় মেগা প্রজেক্টের নামে বড় বড় দুর্নীতি করেছে। তাই সব দুর্নীতির বিচার করতে হবে। আমরা ক্ষমতায় আসলে সরকারে সব দুর্নীতির বিচার করবো ও দুর্নীতি লুটপাটের শ্বেতপত্র প্রকাশ করবো।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবু গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আজ ৭ দফা দাবীতে আমাদের আজকের জনসভা। আমরা এ সব দাবী আদায়ে জাতীয় ঐক্য গঠন করেছি। আর আামদের দাবী গুলো শুধু আমাদের নয় গোটা দেশের। কারণ দেশের মানুষ ভোট দিতে চায় তবে তা নৌকায় নয়। তিনি বলেন, নৌকা ডুবে গেছে আওয়ামী লীগ এর সে বিষয়ে খবর নাই। থাকলে তারা আবারো ১৪ সালের ৫ জানুয়ারি মার্কা নির্বাচন করতে চাইতো না। মনে রাখতে হবে শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু ভোট হয় না, তার অধীনে ভৌট চুরি হয়। তাই শেখ হাসিনার অধীনে কোনো ভোট হবে না এ দেশে। নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, আন্দোলন ছাড়া দাবী আদায় হয় না। তাই আপনাদের আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে দাবী আদায় করতে হবে। আপনারা আন্দোলন সংগ্রাম করতে গেলে আক্রমন আসবে। সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। আন্দোলনের মাধ্যমে দাবী আদায় হবে। কারণ বাংলাদেশোর মানুষ আন্দোলন সংগ্রামকে ভয় পায় না। মাঠ ছেড়ে পালিয়ে যায় না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মইন খান বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাকর্মীরা একটি ইতিহাস রচণা করতে সিলেটে এসেছেন। আজ দেশে গণতন্ত্র মৃত। দেশে আইনের শাসন, বিচার ব্যবস্থা, মানবাধিকার নেই। সব ধ্বংস করে দিয়েছে বর্তমান সরকার। তিনি বলেন, আমরা বৃহত্তর ঐক্য গঠে তুলে আওয়ামী লীগকে একঘরে করে দিব। আমরা রাজপথে আছি, দাবী আদায় না করে রাজপথ থেকে ঘরে ফিরে যাবো। আমরা জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে স্বৈরাচারকে বিদায় করবো।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, আমাদের আজকের জনসভায় আসতে গিয়ে জনগণকে পথে পথে আটকে দিয়েছে। এর আগে ২৩ তারিখ আমাদের জনসভা করতে অনুমতি দেয় নি। মনে করেছিলো গায়ের জোরে আমাদের জনসভা আটকে দিবে। কিন্তু পারেনি আজ আমরা জনসভা করছি। তিনি বলেন, আমরা বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। তাকে একটা সাজানো মামলায় কারাগরে আটকে রাখা হয়েছে। আমাদের আগামী দিনের জন্য শপথ নিতে হবে কিভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা যায়। বেগম খলেদা জিয়াকে মেরে ফেলার ব্যবস্থা করেছে হাসিনা সরকার। তিনি এখন হাটতে চলতেও পারেন না। মান্না বলেন, বর্তমান সরকার চোর- ডাকাতের মত ভোট চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু সিলেটে পারেনি। সিলেটের জনগণ তাদের ভোট দিয়ে জনগণের প্রার্থীকে বিজয়ী করেছে। তিনি বলেন, আজ আমাদের শপথ নেয়ার সময়। তাই বলতে চাই এবার কেউ ওয়াক ওভার নিয়ে ক্ষমতায় থাকবে তাহলে সেটি কখনও পূরন হবে না। ওয়াক ওভার নিয়ে কাউকে ক্ষমতায় থাকতে দিবো না। তাই আমাদের সবাইকে লড়াই করতে হবে। সরকারকে তিনি বলেন, এখনো সময় আছে আনাদের সাথে কথা বলেন। নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন। না হলে কিভাবে ক্ষমতা থেকে নামাতে হয় তা আমরা জানি। আমরা একদিনের ভোটের অধিকার বা গণতন্ত্রের চাইনা। প্রতিদিন গণতন্ত্র চাই।

জাতীয় ঐক্যের অন্যতম নেতা সুলতান মো. মনসুর বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে যুক্তফ্রন্ট নেতা আবদুল মালেক রতন বলেন, সারা পৃথিবীর সব সরকার, সব দল শান্তি চায় বলে মনে করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এই জোটটির নেতাদের মতে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চান সহিংসতা। সরকার উসকানি দিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টি করতে চায়। আপনার পাতা ফাঁদে পা দেবো না। হজরত শাহজালাল, শাহ পরান ও ওসমানীর কবর জিয়ারত করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা শপথ নিয়েছেন। এই যাত্রা সফল হবে। আমরা পরাজিত হবো না। গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি বলেন, আজকে থেকে সরকারের ভাটার দিন শুরু হলো।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, সৌদি আরব থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ছাল-বাকল দিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করা হয়েছে। আমরা বলতে চাই, আপনি দ্রুত পদত্যাগ করুন। নইলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে টের পাবেন। জনগণের দাবি মেনে না নিলে আপনাদের ছাল-বাকলও থাকবে না।

সিলেট সিটি কর্পোরেশন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সভাপতিত্বে সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আ স ম আবদুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুলতান মো. মনসুরসহ অন্যরা।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY