দলের লোকেরাও ভোট দেয়নি, ভাবনায় দুই দল

236

দৈনিক আলাপ ওয়েবডেস্ক: অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় সবচে কমসংখ্যক ভোটার ভোট দিয়েছেন শনিবার অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। ভোট পড়ার হার উত্তরে ২৫ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং দক্ষিণে ২৯ শতাংশ।

 

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুই জন করে চার মেয়র প্রার্থী এবং দল দুটির সমর্থিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে প্রার্থীদের ২০ দিনের প্রচারণা-গণসংযোগের সময় প্রতিটি স্থানেই বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী-সমর্থক বা লোকজনের সমাগম দেখা গেছে। কিন্তু বাস্তবে সেই সমাগমের সিকিভাগ প্রতিফলনও দেখা যায়নি ভোটের দিন কেন্দ্রগুলোতে। প্রচারণার সময় সরগরম করা দলের সেই ভোটাররাই গেল কই—এই প্রশ্নই এখন বিশাল হয়ে ঘুরছে আওয়ামী লীগ-বিএনপির ভেতরেই। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দলের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। একইভাবে বিএনপিও আজ বুধবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক ডেকেছে।

নির্বাচনে খুবই কম ভোট পড়া এবং বিশেষত দলের লোকদেরই বেশির ভাগ ভোট দিতে কেন্দ্রে না যাওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমি মনে করি এখানে আমাদের গভীরভাবে ভাবনার বিষয় আছে। আমাদের ভোটের যে পার্সেন্টেজ সেই পার্সেন্টেজ অনুযায়ী, যে ভোট পড়ার কথা ছিল, সেটা হয়নি। মূল্যায়ন করার জন্য আমরা ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং করব। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে এলে এই মিটিং হবে। সেখানে নির্বাচন নিয়ে বীক্ষণ-পরিবীক্ষণ, আমাদের অবজারভেশন, পর্যবেক্ষণ নিয়ে বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা করব। এরকমই চিন্তাভাবনা রয়েছে। নেত্রীও আমাকে পরশুদিন ফোনে যখন কথা হয়, তিনি আমাকে বলেছিলেন ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং করা জরুরি।’

অন্যদিকে, সিটি নির্বাচনের ফলাফল, ভোটের চিত্র, নির্বাচনে নানা অনিয়ম, বিএনপির এজেন্টদের কেন্দ্রে না যাওয়া এবং শরিক দলের ভোটারদেরই ভোট দিতে না যাওয়ার বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে গতকাল বৈঠক করেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। আর দলীয়ভাবে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করতে বিএনপি আজ স্থায়ী কমিটির বৈঠক করা ছাড়াও কিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। তালিকায় নাম নিশ্চিত করেও এবং প্রয়োজনীয় খরচ অগ্রিম নিয়েও যেসব এজেন্ট ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হননি তাদের তালিকা করতে এরই মধ্যে নির্দেশনা দিয়েছেন লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জানা গেছে, তালিকা করার পর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এছাড়া বিএনপির ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটিকে নতুন করে সাজানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন নির্বাচন-পরবর্তী আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে আজ একসঙ্গে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হচ্ছেন।

সিটি নির্বাচনে ভোটারের খরা এবং দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদেরই সিংহভাগ ভোট দিতে না যাওয়ার বিষয়টিকে সাংগঠনিকভাবেও গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। ভোটের চিত্রে সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টিও প্রকাশ পেয়েছে মনে করছে দলটি, এজন্য ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটিকে ঢেলে সাজানোর কথা বলছে। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘মহানগরে আমাদের কমিটিগুলো হয়েছে, পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। ঢাকা সিটিতে ওয়ার্ড পর্যন্ত কমিটিগুলোকে ঢেলে সাজানো দরকার। আগের দিন ঢাকা শহরের নেতারা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, তাদেরকেও আমি শহরের কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ করার কথা বলেছি। অনতিবিলম্বে ঢাকা সিটির ওয়ার্ড, থানার সম্মেলনগুলো করা দরকার। এখানে বড়ো না হলেও সাংগঠনিক দুর্বলতার পরিচয় পাওয়া গেছে। এটা হলো বাস্তবতা, বাস্তবতা অস্বীকার করে লাভ নেই।’

সিটি ভোটে অত্যন্ত কম ভোটারের উপস্থিতির কারণ হিসেবে সাংগঠনিক দুর্বলতার পাশাপাশি আওয়ামী লীগ-বিএনপি পরস্পরকেও দুষছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের আমলে মানুষ নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। নির্বাচনে কারচুপি, দলীয় লোকজন-প্রশাসন-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ, প্রতিপক্ষের এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা ও বের করে দেওয়া, ভোটের আগে এজেন্ট ও দলের কর্মী-সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানো, অভিযোগ আমলে না নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয় থাকা এবং প্রশাসনের দলীয় মনোভাব প্রদর্শনকেই ভোটার উপস্থিতির জন্য দায়ী করছে বিএনপি। আর এবার ভোটে ভোটারের অস্বাভাবিক অনুপস্থিতির জন্য দুই-তিন দিন ছুটি থাকায় অনেকের গ্রামে চলে যাওয়া, গণপরিবহন বন্ধ থাকা এবং নির্বাচন ও ইভিএম নিয়ে শুরু থেকেই বিএনপির নেতিবাচক প্রচারণাকেও দায়ী করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা।

কম ভোটারের উপস্থিতি ও ভোটের ফলাফলের এই চিত্রের জন্য আগাগোড়াই শুধু সরকার, প্রশাসন, আওয়ামী লীগ ও ইসিকে দুষলেও বিএনপি দলগতভাবেও বাস্তবে শক্তভাবে ভোটের মাঠে ছিল না। বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারি দলের চাপ ও কৌশলের কাছে হেরে টিকতে পারেননি দলটির নেতাকর্মীরা। ২০১৫ সালের ঢাকার দুই সিটির নির্বাচনের মতো এবারও দলীয় সব এজেন্টকে কেন্দ্রে পাঠাতে পারেনি বিএনপি। কোথাও কোথাও এজেন্টরা কেন্দ্র পর্যন্ত গেলেও টিকে থাকার মতো সাংগঠনিক সামর্থ্যের যোগান পাননি তারা।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২ হাজার ৪৬৮টি কেন্দ্রে ১৪ হাজার ৪৩৪টি ভোটকক্ষ ছিল। একেকটি কেন্দ্রে গড়ে কমপক্ষে ১৪ থেকে ১৫টি করে ভোটকক্ষ ছিল। এমন ভোটকেন্দ্র পাওয়া যায়নি, যেখানে সবকটি কক্ষে ধানের শীষ প্রতীক বা বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের নির্বাচনি এজেন্ট ছিলেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অভিযোগ—বিএনপির এজেন্টদের ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়েছে, যারা এই বাধা অতিক্রম করে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন, তাদেরকেও সরকারি দলের লোকজন ভয়ভীতি, হুমকি-ধমকি, মারধর করে বের করে দিয়েছে। ইসি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবিষয়ে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং ক্ষমতাসীনদের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে বলে অভিযোগ ফখরুলের।

ভোট দিতে ভোটারদের বেশিরভাগেরই কেন্দ্রে না যাওয়ার বিষয়ে দুই দল নানা যুক্তি দেখালেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে ভোটের প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের অনাগ্রহ তৈরি হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন নির্বাচনে নানা অনিয়মের ঘটনায় নির্বাচন ব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়েছে। জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও ফল নির্ধারণে ভোটারদের গুরুত্ব নেই—এমন একটি ধারণা বদ্ধমূল হয়ে গেছে। সাধারণ্যের পাশাপাশি এই ধারণা এখন খোদ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও জন্মেছে। সরকারি দলের লোকজনের মধ্যেও এই ধরনের ধারণা সৃষ্টির বড়ো দৃষ্টান্ত শনিবারের ভোট।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY