কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল’র ১ম মৃত্যু বার্ষিকীতে কলামিস্ট মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস এর ”কমরেড জসিম মন্ডল তোমাকে লাল সালাম”

960
বিশ্ব ইতিহাসের কিংবদন্তি --মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কমরেড জসিম উদ্দিন মন্ডল'

কমরেড জসিম মন্ডল
           তোমাকে লাল সালাম।

                  মো: সরওয়ারুজ্জামান মনা বিশ্বাস

আজ ২রা অক্টোবর /১৮ তারিখে অত্র এলাকার বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা কমরেড জসিম মন্ডলের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী। দিবসটি যথাযোগ্য পালন করার জন্য ঈশ্বরদীর নাগরিক কমিটি একটি প্রস্তুতি সভা করে ব্যাপক কর্মসুচী গ্রহন করেছে। যদিও কর্মসুচীর বিবরন এবং দিবসটির কর্মসুচী থেকে নাগরিক কমিটি দেশের বর্তমান বাস্তবতায় জনগনকে কি মেসেজ দিবেন বা দিবসটির মুল প্রতিপাদ্য কি হবে সে বিষয়ে বিস্তাবিত তথ্য নাই, তারপরেও বিষয়টিতে আমি আনন্দিত । দেশের নষ্টভ্রষ্ট রাজনীতির মাঠ এবং অবক্ষয় রোগে আক্রান্ত ও জরাজীর্ন সমাজ থেকে প্রকৃতির নিয়মে ধুঁকে ধুঁকে বেচে থাকা আদর্শবান মানুষগুলি একে একে বিদায় হচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু তা যেন কোন ভাবেই পুরন হচ্ছে না। আর এই কারনেই সমাজের অবক্ষয়ের ধারা যেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে প্রবাহমান, ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের কেন্ত্রবিন্দু থেকে সমাজের তৃনমুল পর্যায় পর্যন্ত সকল ব্যাবস্থাপনাই ( টোটাল সিস্টেম) যেন অন্ধকার থেকে গভীরতম অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গুম, খুন, মুক্ত চিন্তা, মুক্তবুদ্ধির চর্চা,বাক স্বাধীনতা সহ সকল বিরোধী মতামত অবদমনের প্রচেষ্টা, গনতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সমুহের স্বীয় দায়িত্ব পালনের অক্ষমতা,, সমাজের প্রায় রন্ধে রন্ধে মাদকের উপস্থিতি, সকল পর্যায়ে ঘুষ দুর্নীতি, ব্যংক বীমা সহ সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লুটপাট যেন অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। এ রকম একটা পরিস্থিতিতে কমরেড জসিম মন্ডলের মৃত্যু্ু বার্ষিকীতে স্মরন সভা, তার বর্নাঢ্য জীবন নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ বা আয়োজন নি:সন্দেহে প্রশংসার দাবী রাখে। তাই অনুষ্ঠানটির আয়োজকদের জানাই আন্তরিক মোবারকবাদ এবং ধন্যবাদ সেই সংগে কমরেড জসিম মন্ডলের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা । জীবিত কালে উনাকে দেখলে এবং মৃত্যুর পরে উনাকে মনে হলেই ১৯৪৮ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় কমুনিষ্ট পার্টির কংগ্রেসে সম্পাদক বিটি রনদীভের বিখ্যাত উক্তি, ” ইয়া আজাদী ঝুঠা হ্যায় লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়, সাচ আজাদী ছিনকে লও। ” মনকে বেশ আন্দোলিত করে। আমার বিশ্বাস, এই উক্তিটি তিনি মনে প্রানে ধারন এবং লালন করতেন।

কমরেড জসিম মন্ডলের সাথে আমার ব্যাক্তিগত সম্পর্ক খুব একটা ছিল না। প্রথম আলাপের ঘটনাটি আমার মনে পড়ছে এবং তা এখানে আলোচনার চিন্তা করেছি।

১৯৭৫ সালের সম্ভবত মে মাসের প্রথম সপ্তাহের একটি তারিখ। ঈশ্বরদীর তৎকালিন সময়ের বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী, রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব এবং সমাজসেবক জনাব মাহমুদুর রহমানের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে তাঁর সংগে আমার প্রথম দেখা এবং সামান্য পরিচয়। উনার মত ব্যাক্তির সাথে আমার কোন রাজনৈতিক আলাপ হবে তা চিন্তাতীত সত্বেও কিভাবে যেন আলাপের সুত্রপাত হল। আমার দুই একটি কথায় তিনি আমাকে রাজনৈতিক সচেতন বা কর্মী মনে করে বেশ গভীর আলোচনায় লিপ্ত হলেন।আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল তৎকালিন সময়ে অর্থ্যাৎ ১৯৭৫ সালের ২৫ শে জানয়ারী সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী নিয়ে। তাঁর মত ছিল এই সংশোধনী স্বাধীনতার মুল চেতনা সাম্য, গনতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায় বিচারের সাথে সাংঘর্ষিক। এই সংশোধনীর মাধ্যমে আজীবন আন্দোলন সংগ্রাম করে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মহানায়ক হিসাবে বঙ্গবন্ধু যে ভাবমুর্তি অর্জন করেছিলেন তা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং হয়েছে।

আমার জিজ্ঞাসা ছিল, স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে অদ্যাবধি আপনারা অর্থ্যাৎ আপনার দল আওয়ামী লীগের সংগে আছেন এমন কি বাকশাল নামক দলটিতে আপনার দল একিভুত হয়েছেন। ৭২ সালের সংবিধানে মুল স্তম্ভ হিসাবে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রর অন্তর্ভক্তি, বাকশাল গঠন এবং চতুর্থ সংশোধনীর পরে দেশে সমাজতন্ত্র ও শোষিতের গনতন্ত্র প্রতিষ্টার যে প্রত্যয় বঙ্গবন্ধু ঘোষনা করেছেন তা আপনাদের নেতৃবৃন্দের পরামর্শে এবং আপনাদের রাজনীতিই এগিয়ে নিচ্ছেন। আপনি বিষয়টি ব্যাক্তিগত আলোচনায় আনলেও তা নিয়ে কেন আন্তপার্টি লড়াই এবং পত্রিকায় বিবৃতি দেন নাই। তিনি বলেছিলেন তোমার কথা কিয়দংশ মাত্র সত্য। তাঁর বক্তব্য ছিল, বঙ্গবন্ধু কোন ভাবেই কমিউনিষ্ট নন সুতরাং তার নেতৃত্বে এ দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে বা সে ধারা এগিয়ে নিবে কোনটাই সম্ভব নয় এতে বরং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্থই হবে। কিন্তু তিনি যদি সুস্থ গনতন্ত্র অনুশীলনের ধারা অক্ষুন্ন রাখতেন তাহলেই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এগিয়ে যেত। তিনি বলেছিলেন আন্তপার্টি লড়াই আমি করছি এবং করেছি। পার্টির সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত থাকা এবং ঐক্যকে সংহত করার কারনেই আমি কোন বিবৃতি দেই নাই। শেষের বক্তব্যটিই আমাকে মোহিত করেছিল। কারন বাংলা দেশে বামপন্থি এবং কমিউনিষ্টদের ইতিহাস সম্পুর্ন তার বিপরীত। যে কোন রননীতি বা রনকৌশলে তাঁরা একমত হতে না পারলেই গনতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার তোয়াক্কা না করে পার্টিকে বিভক্ত করেন। তাইতো বদরুদ্দিন ওমর সাহেব বলেছেন, বাংলা দেশে বহু লেনিন থাকলেও কমিউনিষ্টের সংখ্যা খুবই কম।

আমার কথাগুলির সারসংক্ষেপ হল দেশের রাজনৈতিক বা সামাজিক সবক্ষেত্রেই আদর্শবান ব্যাক্তির উপস্থিতি দৃশ্যমান নয় বিধায় এই সমাজে গড়ে উঠা তরুন, যুবকগন সমাজে বিচরনকৃত দুর্নীতি পরায়ন এবং অনাদর্শবান মানুষকেই লক্ষ্য করে বা অনুসরন করে গড়ে উঠছে বলেই সামাজিক বা রাজনৈতিক কোন ক্ষেত্রেই আদর্শবান মানুষ পাওয়া যায় না। ফলশ্রুতিতে রাজনীতিতে অস্থিরতা এবং সামাজিক অবক্ষয়, ঘুষ, দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস, ধর্ষন কোনটাই প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। অর্থ্যাৎ আইনী ব্যাবস্থাই হউক আর ক্রস ফায়ারই হউক কোন কি্ছুতেই তা প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না বা যাবেও না।যতক্ষন না সমাজে আদর্শ নাগরিকদের সন্মানজনক বা প্রতিনিধির পর্যায়ে না আনা যায়। আমাদের ইসলাম ধর্মেও সমাজের কলুষতা দুর করতে কেতাবের চেয়ে মহামানব বা আদর্শবান মানুষকেই বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বিধায় ১০৪ খানা ঐশী কেতাব হলেও এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নবী বাসুল পয়গম্বর প্রেরন করা হয়েছে। এখানেই শেষ নয় নবুওয়তের যুগের শেষে চলমান বেলায়েতের যুগেও নায়েবে রাসুল, ওলীআল্লাহগন সমাজে সব সময়ই বিদ্যমান থাকেন যাঁরা কিনা মানুষকে চরিত্রবান এবং সৎপথে চলার দীক্ষা দিয়ে থাকেন। এতে প্রমানিত হয় সমাজ, রাজনীতি,ধর্ম এবং সবক্ষেত্রেই আদর্শবান মানুষ গুরুত্বপুর্ন।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY