“নারীর আবাসন সমস্যা” বিশ্লেষণ ধর্মী লিখা লিখেছেন কেয়া তালুকদার

141
কেয়া-তালুকদার-readers-opinion-doinik-alap
কেয়া তালুকদার

নারীর আবাসন সমস্যা

                                                  – কেয়া তালুকদার

দিনশেষে রাতে ঘুমানোর জন্য একটা নিরাপদ আশ্রয় দরকার ৷ বিশেষ করে একটা নারী কখনো ঘরের বাইরে রাত কাটাতে পারেনা ৷ কারণ নারী যদি ঘরের বাইরে গিয়ে বাড়ী আসতে রাত করে তাহলেই নারী চরিত্রহীনা ৷ রাস্তাঘাটে চলাফেরায়ও নারী নিরাপদ না ৷ কখন এসে রাক্ষসের দল ঘামচিয়ে ধরবে তার কোনো ইয়ত্তা নেই ৷

এখন তাই নারীরা নিজেদের রক্ষার্থে নাকি কুম্ফু ক্যারাতে শিখছে ৷ নারীরা পড়াশুনার জন্য নিজ বাড়ীর বাইরে গিয়ে হোস্টেল অথবা মেসে থাকে ৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে সবার সীট বরাদ্ধ দেয়া সম্ভব হয়ে উঠেনা ৷ এছাড়াও সেখানে ঘটে নানা রকম আবাসিক সমস্যা ৷ খেতে হয় পানির মত পাতলা ডাল আর পানির মত ঝোলের সাথে এক টুকরা মাংস ৷ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব ৷ মেয়ে মেয়েতে ঝগড়া বিবাদ, বিদ্যুত, পানি ও গ্যাস সংকট, সিনিয়র বোনরা জুনিয়র বোনদের উপর প্রভাব খাটায়, বিনোদনের অভাব ইত্যাদি ৷ জিনিসপত্র চুরি হওয়ার মত ঘটনা ঘটে।

ছাত্রী মেসেও ঘটে নানা ধরণের অপরাধমূলক কার্যক্রম ৷ মাদক, খুন, আত্মহত্যা, হত্যা, অপহরণ ও গুম ৷ এছাড়াও হোস্টেল আর মেসেও চলে আধিপত্য বিস্তারের মত ঘটনা ৷ পড়াশুনার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা খুব কঠিন ৷ কোন নারী যদি বাসা ভাড়া নিয়ে একা থাকতে চান তখন বাড়ীওয়ালাদের নানান প্রশ্ন বিয়ে হয়েছে কিনা? বিয়ে মনে হয় চরিত্র রক্ষার মূল চাবিকাঠি ৷ আবার মুখের উপরেই বলে দেয় অসামাজিক কাজকর্ম করা যাবেনা ৷ সমাজের কিছু নারীর জন্য সব নারীকেই এই প্রবাদ শুনতে হয় ৷ গান জোরে শোনা যাবেনা ৷ ইলেকট্রিক যন্ত্র ব্যবহার করা যাবেনা ৷ রাত করে ফেরা যাবেনা ৷ কোনো পুরুষ অতিথি দেখা করতে আসলে সন্দেহ করে ৷ বাসা পরিষ্কার পরিছন্ন রাখার জন্য নানা উপদেশ ৷ কিছু নষ্ট হলে নিজেই ঠিক করে নিতে হবে ৷ মাস শেষে ভাড়া দিতে দেরী হলে অকথ্য ভাষায় গালি গালাজ ৷ বাসা ছেড়ে দেয়ার হুমকি ৷ বাড়ীওয়ালা অথবা বাড়িওয়ালার ছেলে কর্তৃক নির্যাতনের স্বীকার ৷ এছাড়াও পাড়ার বখাটে ছেলের উৎপাত তো আছেই ৷

আরো পড়ুন: “দায়িত্ব” বিশ্লেষণ ধর্মী লিখা লিখেছেন রিটন মোস্তাফা

একটা নারী যেন একটা যৌন প্রাণি, দেখলেই কিছু পুরুষদের মুখের লালা পড়তে থাকে ৷ সামলাতে পারেনা ৷ বাবা মাও তাই নারীদের পড়াশুনার জন্য বাইরে পাঠাতে ভয় পায় ৷ প্রথমেই ভাবে সে যেখানে যাবে সেই জায়গাটা কতটুকু নিরাপদ ? এজন্য অনেক নারীরই নিজ জেলার বাইরে গিয়ে পড়াশুনা করার সুযোগ হয়ে উঠেনা ৷

এবার আসা যাক পড়াশুনার পর আবাসন সমস্যা নিয়ে ৷ একটা নারী পড়াশুনার পর অবশ্যই ঘরে বসে থাকতে চাইবেনা ৷ অবশ্য পড়াশুনা চলাকালীন অনেক নারীদেরই বিয়ে হয়ে যায় ৷ অনেক মানুষের ধারণা নারীর রূপলাবণ্য থাকতেই বিয়ে দিয়ে দেয়া প্রয়োজন ৷ কারণ বিয়ের বাজারে অসুন্দর নারীর মূল্য অনেক কম ৷ এখনো ঘটা করে বাজার বসিয়ে নারীকে দেখতে আসে বরপক্ষ ৷ সেই বাজারে নারীকে দিতে হয় নানা পরীক্ষা৷

নারী বিয়ের পর চাকুরী করতে পারবে কিনা নারী পক্ষ থেকে সেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে হয় ৷ নারী তার নিজের যোগ্যতায় চাকুরী করবে কি করবেনা সেটা তার নিজস্ব ব্যাপার ৷ আমাদের দেশের প্রগতিশীল পুরুষরা নারীকে চাকরী করতে দিতে চাননা নিজের আয় মোটামুটি মানের থাকলেই ৷ কারণ নারী তো একটা দাসী, এই দাসী যদি বাইরে চাকুরী করতে যায় তাহলে ঘর সামলানো, বাচ্চা মানুষ করবে কে ? যৌতুকের স্বীকার হতে হয় কাউকে কাউকে ৷ যারা বিয়ের পিড়িতে বসেনা তারা হন্য হয়ে পড়ে সোনার হরিণ একটা চাকুরীর জন্য ৷

আরো পড়ুন: চাওয়া-পাওয়ার প্রেক্ষাপটে জীবনের কথা নিয়ে তারুণ্যের প্রতীক – রিটন মোস্তাফা লিখেছেন “জীবন্ত লাশের খুনি”

কোথায় থাকবে এটা একটা চিন্তা ? কারণ প্রতিষ্ঠানের হোস্টেলে পড়াশুনার পর থাকতে দেয়না ৷ তখন বাড়ী ভাড়া করে থাকতে গেলে আবার একই সমস্যা ৷ কর্মজীবি হোস্টেলেও এই নারীদের থাকার সুযোগ নেই ৷ বান্ধুবী অথবা আত্মীয়ের বাড়ী থাকবে এটাও সমস্যা ৷ পড়াশুনার দিকে মনোযোগ দিবে না নিজের আবাসনের চিন্তা করবে এই নিয়ে পড়ে মুশকিলে ৷ আবার অনেক বাড়ীওয়ালা পুরুষ ছাড়া বাড়ী ভাড়া দেয়না ৷ পুরুষ যেন নারীর একটা নিরাপত্তার সাইনবোর্ড ৷ অনেকে তাই সহপাঠীদের নিজের ভাই বানিয়ে একটা ফ্লাট ভাড়া নিয়ে থাকেন ৷ এখন নতুন করে শুরু হয়েছে জঙ্গীবাদের সমস্যা, ফলে বাড়ীওয়ালাও ভয় পান বাড়ী ভাড়া দিতে।

কর্মজীবি হোস্টেলে ডিভোর্সী অথবা বিবাহিত নারীদের থাকার সুযোগ আছে ৷ সেখানেও সীট পেতে অনেক প্রতিযোগিতা করতে হয় ৷ এই হোস্টেলের সংখ্যা খুবই নগন্য ৷ প্রতিটি জেলায় কর্মজীবি হোস্টেল থাকা দরকার সরকারীভাবে ৷ এছাড়াও অফিস কর্তৃক কর্মজীবি নারীদের থাকার ব্যবস্থা করলে নারীদের অনেক সুবিধা হয় ৷

আত্মীয়ের বাড়ীতে উঠে চাকুরীতে যোগদান করলে তারা ভাবতে থাকে কবে বাসা ছেড়ে ভাড়া বাসায় উঠবে ?
এতকিছুর পরেও যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরীক্ষা দিয়ে নারীরা এগিয়ে চলছে ৷ সংকটাপন্ন সময়গুলোকে সঙ্গী করে ৷ নিজের উপার্জন করা অর্থ দিয়ে নিজের ও সংসারের প্রয়োজন মেটাচ্ছে ৷

নারীর চলার গতিকে সাবলীল করতে প্রতিটি পরিবার ও সমাজের মানুষের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার ৷ সব বাঁধা পেরিয়ে…

“নারী তুমি অপরাজিতা ফুলের মতই থাকো অপরাজেয়”

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY