ভারতের লেখিকা-অগ্নিমিতা দাসের সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের বিশ্লেষণধর্মী লেখা“সজ্জন গড়”

24
অগ্নিমিতা দাসের সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকের বিশ্লেষণধর্মী লেখা “সজ্জন গড়”

সজ্জন গড়
কলমে_ অগ্নিমিতা দাস

সজ্জন গড় দূর্গ কে মনসুন প্যালেস বলা হয়। উয়পুরের ফতে সাগর লেককে কেন্দ্র করে মহারানা সজ্জন সিং( ১৮৭৪_১৮৮৪) মেবারের বংশোদ্ভুত এই দূর্গের নির্মাতা। ১৮৮৪ সালে এই দূর্গটি নির্মাণ করা হয়। মেঘেদের রাজ্যে মাথা উঁচু করে এই অট্টালিকা দাঁড়িয়ে থাকে, শুধুমাত্র ভেজা ভেজা তুলোর মতো মেঘের স্পর্শ পাওয়ার জন্য। আরাবল্লী পর্বতের চূড়ায় থাকা এই দূর্গটি মহারানা নির্মাণ করেন মেঘ আর পাহাড়ের মিলন দেখবেন বলে। ওই দূর আকাশের মধ্যে থাকা অট্টালিকা থেকে মহারানা নিজের দেশ চিতোর দুচোখ ভরে দেখতেন। মহারানা সজ্জান সিংএর এই দূর্গটিকে পাঁচতলা করার অভিপ্রায় ছিলো। কিন্তু মহারানার আকস্মিক মৃত্যুতে সেটা হয়ে উঠে নি। বর্তমানে এই দূর্গটি রাজস্থান গর্ভমেন্টের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ১৯৮৩ সালে জেমস বন্ডের ” অক্টোপাসি” চলচ্চিত্রের জন্য আফগান রাজা কামাল খানের বাসস্থান হিসেবে এই সজ্জন গড়টি ব্যাবহৃত হয়ছিলো। ভাবতেই অবাক লাগে রহস্যরোমাঞ্চের জনপ্রিয় নায়ক এই মহলে অভিনয় করেছিলেন।


মহারানার মৃত্যুর পর এই মহল ” মুনসুন প্যালেস” নামে পরিচিত হয়। রাজারাজড়ারা
পাহাড়ের কোলে থাকা মেঘেদের রাজ্যে ভুঁইফোড় এই প্রাসাদকে শিকার করার পর বিশ্রামাগার হিসেবে ব্যাবহৃত করতো।
পাহাড়ে খাঁজে খাঁজে গভীর জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতো বাঘ, ভাল্লুক, হরিণ, শম্বর , তাদের শিকার করে এই” মনসুন প্যালেসে” ফুর্তি করতো। বর্ষাকালে কালো শাল মুড়ানো মেঘেদের দেখতে দেখতে তাদের অবিশ্রান্ত চোখের জলে সিক্ত হয়ে মন ভরে যেতো।
বর্তমানে জয়পুর গর্ভমেন্ট পাহাড়ের উঠার জন্য পাকদন্ডির পাকা চ‌ওড়া রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে।গাড়ি করে ওই পাকদন্ডীর রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দুপাশের সবুজ প্রকৃতি দেখতে দেখতে হঠাৎ কচি কদাচিৎ ময়ূরীর কর্কশ ডাক শোনা যায় বা ঝলসে উঠে সবজেনীল পাখার বাহার । পাহাড়ে উঠতে উঠতে কানে যদি বাজে” রিমঝিম ভিঙ্গে শাওন” তখন মনটা উদাস হয়ে যায়। গাড়ি যখন পাহাড়ী চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সুউচ্চ প্রাসাদে পৌঁছায় তখন চোখ জুড়িয়ে যায়। শ্বেতপাথরের তৈরি এই মহলের সাদা সিঁড়ির কোনায় কোনায় রাখা বিশাল পাথরের পাত্রের মধ্যে রয়েছে গোলাপের পাপড়ি।
প্রাসাদ থেকে মেঘরা যেনো হাতছানি দিয়ে ডাকে আর পাহাড়ের সবজে জামা দেখতে দেখতে কখনো মন অবুঝ মন সবুজ হয় যায় বৈকি! প্রাসাদের বাগানে যত্ন করে রাখা গাছের কেয়ারি আর রঙিন ফুলের রঙের চোখ ঝলসে উঠে । মন বলে যে কাল‌ই হোক অর্থাৎ ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত।


সত্যি মেঘ আর পাহাড়ের মিলন , বাহারি ফুলের ছটা দেখতে দেখতে প্রেমীযুগলদের নিজেদের মনে মনে মেবারের রাজা রানী ভাবতে ক্ষতি কি! নীল ক্যানভাসে যখন লাল তুলির আঁচড় পড়ে, তখন সেই রক্তিম আভা শ্বেতপাথরের দূর্গে পরে এই অপরূপ শোভা সৃষ্টি হয়। পড়ন্ত বিকেলের সোনা রোদ গায়ে মেখে ওই দূরের মেঘ দেখতে দেখতে ” মেঘদূতের” বিরহী যক্ষের কথা মনে পড়ে যায়।
এখন ও হয়তো কোন টুরিষ্ট মেয়ে ফুলের রাজ্যে আর মেঘের কোলে ছবি তুলতে তুলতে ভাবে এই প্রাসাদটা কি খুব চেনা চেনা লাগছে। ধুর সে তো এই প্রথম স্বামীর সাথে হানিমুনে এসেছে। তবু ও তার মনের কোথায় যেন এই দূর্গের কোনায় কোনায় থাকা অনেক অজানা কথা বুঝি উঁকি দিচ্ছে। কানে ভাসছে ঘনঘোর শ্রাবনের ধারায় রাজার সাথে ভিজতে ভিজতে নুপুরের ছুনছুন শব্দ। কখনো পেঁজা তুলোর মতো মেঘকে ছুঁতে দেখতে দেখতে সখীদের সাথে উচ্চকিত হাসি।
স্বামীর ডাকে হয়তো চটক ভাঙ্গে। আসলে এই সজ্জন গড় এমন‌ই এক দূর্গ যেখানে আসলে মনটা কোথায় যেন হারিয়ে যায়। প্রকৃতির শোভায়, মেঘেদের আনাগোনা শ্বেতপাথরের দূর্গের রাজাদের তরবারি , রানীদের ছবি দেখতে দেখতে মনে কল্পনার ডানা মেলতে বাধ্য। এইভাবেই মন কল্পনার পক্ষীরাজে উঠে কখনো মেবারের রাজা, রানী হয়ে যায়।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY