“স্বপ্নতত্ত্ব ” বিশ্লেষণ ধর্মী লিখাটি লিখেছেন শুভ চিন্তার লেখক শারমিন আ-ছেমা সিদ্দিকী।

116
“স্বপ্নতত্ত্ব ” বিশ্লেষণ ধর্মী লিখাটি লিখেছেন শুভ চিন্তার লেখক শারমিন আ-ছেমা সিদ্দিকী।

স্বপ্নতত্ত্ব

শারমিন আ-ছেমা সিদ্দিকী

স্বপ্ন বাংলা শব্দ। এর আভিধানিক শব্দ হচ্ছে খাব। আর ইংরেজিতে বলে ড্রিম ( Dream)। স্বপ্ন বলতে আমরা সাধারণত কোন কিছু নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর ভাবনাকে বুঝে থাকি। বাস্তব অর্থে এটা স্বপ্ন নয়। এটাকে বলে কল্পনা। মানুষ ঘুমের মধ্যে যা কিছু চিত্রায়ন করে তাই হচ্ছে স্বপ্ন।
স্বপ্নের মাধ্যমে মানুষ তার ভালো-মন্দ কি করা উচিত আর উচিত নয় সে সম্পর্কে অবগত হন। আল্লাহর নির্দেশেই এই কাজ সংঘটিত হয়।

সব মানুষই খাব বা স্বপ্ন দেখে থাকেন। কেউ কম আর কেউ বেশি। মানুষ কেন স্বপ্ন দেখে এ সম্বন্ধে অনেকেই খুব গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। আবার কেউ একে অলীক কল্পনা বলে উড়িয়ে দেন। স্বপ্ন যে মনের অলীক কল্পনা নয়, সে সম্পর্কে আলোচনা করছি।

স্বপ্নে দেখা ঘটনাবলী কখনো মনের মধ্যে খুবই সুস্পষ্ট ভাবে অঙ্কিত হয়ে থাকে। আবার কখনো বা এর কিছু অংশ মনের মধ্যে অস্পষ্ট ভাবে জাগরিত থাকে। মানব জীবনের দূর অতীতের কতগুলো বিষয় যেমন খুবই স্পষ্ট মনে থাকে, আবার কতগুলো বিষয় সামান্য মনে থাকে। ঠিক তেমনি স্বপ্নে দেখা বিষয় সমূহের মধ্যে কতগুলো ঘটনা ঘুম হতে জাগ্রত হবার পর স্পষ্ট মনে পড়ে, আবার কতগুলো ঘটনা কিছু কিছু মনের মধ্যে ভাসতে থাকে।

স্বপ্ন ও বাস্তবের মধ্যে অনেক বিষয়ে মিল থাকলেও পার্থক্য থাকে অনেক। তাদের একটি বাস্তব জগতের আর একটি নিদ্রা জগতের। উভয়ের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ আলাদা।
স্বপ্ন কি?
স্বপ্নের মূল তত্ত্ব সম্পর্কে বায়হাকীয়ে যামান হযরত আল্লামা কাজী ছানাউল্লাহ পানিপথী (রা) তাফসীরে মাযহারীতে উল্লেখ করেছেন যে, ঘুম কিংবা সজ্ঞা হীনতার কারণে আমাদের মন যখন দেহের বাহ্যিক ক্রিয়াকর্ম হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন সে কল্পনা শক্তির মাধ্যমে কিছু কিছু আলামত আকার-ইঙ্গিত দেখতে পায় ।এটাই স্বপ্ন।
স্বপ্নের তাৎপর্য:
সুফি সাধকগণের স্বপ্নের বর্ণনা অনুযায়ী স্বপ্নের তাৎপর্য এই যে,ইহজগতে অস্তিত্ব লাভের পূর্বেই “আলমে-মিসাল” যাকে আলমের কবীরও বলা হয় বা উপমা জগতের প্রতিটি বস্তুরই একটি বিশেষ আকার- আকৃতি বা আয়তন রয়েছে। এমনকি ইহজগতে যে সমস্ত বস্তুর মিশাল বা উপমা দেখানো বা বোঝানো সম্ভব নয়, আমলে মিশালে তারও উপমা বিদ্যমান রয়েছে। যেমন জীবন- মরণ, রোগ-ব্যাধি, দিন-মাস-বছর কাল বা কোন কিছু অর্থ ইত্যাদি। যেমন: রাসূলুল্লাহ (সা:) জ্বরকে কালো মহিলার আকার-আকৃতিতে, গরু জবেহ করা কে শাহাদতের আকৃতিতে, হাতের চুড়িকে মিথ্যা নবীর আকৃতিতে দেখেছিলেন।

মূল কথা হচ্ছে নিদ্রিত অবস্থায় মানুষের মন যখন বাহ্যিক দেহের ক্রিয়া-কলাপ হতে মুক্ত হয়ে পড়ে, তখন স্বপ্নের মাধ্যমে কখনো কখনো আলমে মিসালের উপমার জগতের সাথে তার সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে যায় এবং সেখানকার আকার-আকৃতি সে দেখতে পায় আর এগুলো অদৃশ্য জগৎ হতে দেখানো হয়।
সাহাবী উবাদাহ ইবনে ছামেত (রা:) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা:) বলেছেন——
“মুমিনের স্বপ্ন একটি বাক্যালাপ, যার মাধ্যমে সে তার প্রভুর সাথে স্বপ্নে কথোপকথন করতে সক্ষম।”
স্বপ্নের প্রকারভেদ:
সাহাবী আউফ ইবনে মালেক ( রা:) বর্ণিত রাসূল (সা:) বলেছেন— বলেছেন স্বপ্ন তিন প্রকার।
প্রথমত: এক প্রকার হল আদম সন্তানকে চিন্তিত ও আতঙ্কিত করার জন্য শয়তানের পক্ষ থেকে স্বপ্নের মাধ্যমে মানুষের স্মৃতিতে ভয়াবহ ঘটনা বলি জাগিয দেয়া হয়, তাকে তাসাবিলুস শাইতান বা শয়তানের বিভ্রান্তি বলা হয়ে থাকে।

দ্বিতীয়তঃ মানুষ জাগ্রত অবস্থায় কিছু চিন্তা ফিকির করে বা যেসমস্ত ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করে, সেগুলোই স্বপ্নে নানা আকার আকৃতি নিয়ে দেখা দেয়। এটাকে হাদীসসুন- নাফস বা মনের সংলাপ বলে।

তৃতীয়ত: স্বপ্নতত্ত্ব হচ্ছে নবুয় তের ছেচল্লিশতম অংশ। তা মহান আল্লাহর পক্ষ হতে এক প্রকার ইলহাম বা খোদায়ী ইশারা যা কিনা আল্লাহ তা’য়ালা তার গায়েবী বা অদৃশ্য ভান্ডার হতে বান্দাকে সতর্ক করা, সুসংবাদ আনন্দ দানের উদ্দেশ্যে তার মস্তিষ্কে বা দিল-কলবে ঢেলে দেন । এটাকে রুইয়া সালেহা বা সত্য স্বপ্ন বলে।

নবী দানিয়াল (আ:) বলেন, স্বপ্ন জগতের দায়িত্ব পালনে একজন ফেরেশতা নিয়োজিত আছেন। যার নাম সিদ্দিক। তার কানের নরম অংশ বা লতি হতে কাঁধ পর্যন্ত দূরত্ব হচ্ছে সাত শত বৎসরের রাস্তা। তিনি আরশ বা লওহে মাহফুজেয আল্লাহ তা’য়ালার গায়েবী বা অদৃশ্য ভান্ডার হতে আল্লাহর নূরের মাধ্যমে মানুষের দুনিয়া ও আখেরাতের ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটবে — ঘুমন্ত অবস্থায় অবস্থায় অবস্থায় বা মোরাকাবা অবস্থায় আলমেমিসাল বা উপমার জগৎ হতে আকার-আকৃতি বা চিত্রকল্পের মাধ্যমে দেখে থাকেন।

ইহজগতে আল্লাহর নূরের মাধ্যমে যেমন অন্ধকার দূরীভূত হয়,সূর্যের কিরণে যেমন প্রতিটি বস্তুই উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, তদ্রুপ আলমেমিসালের চিত্র ও দৃশ্যগুলোও আল্লাহর নূরের তাজাল্লী বা ফোকাসের মাধ্যমে সিদ্দিক নামক ফেরেশতার সম্মুখে গায়েব হতে ভাসমান হয়ে ওঠে। আর তিনি স্বপ্নের মাধ্যমে মানব স্মৃতিপটে অঙ্কিত করে থাকেন।

স্বপ্নের মূল উদ্দেশ্য:
স্বপ্নের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দুনিয়া ও আখেরাতের ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটবে বা লাভ করবে, সে সম্পর্কে অবহিত করা এবং যেসব ভালো কাজ করেছে বা ভবিষ্যতে করবে তার সুসংবাদ বা পূর্বাভাস দেয়া এবং যেসব মন্দ কাজ করেছে বা করবে সে সম্পর্কে আগাম সতর্ক করা।

কেউ যদি কোনো ভয়-ভীতি পূর্ণ স্বপ্ন দেখে, তবে তা যথাসময়ে ফলবে কিন্তু বান্দার লাভ হলো, আগাম সংকেতের কারণে সে আগে থেকে অবগত থাকলো এবং কিভাবে বিপদ থেকে মুক্তি পাবে সে জন্য আল্লাহর নিকট তওবা করার সুযোগ পাবে এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করতে পারবে।

আর কেউ যদি কোন উত্তম স্বপ্ন দেখে থাকে, তবে সেটাও যথাসময়ে ফলবে কিন্তু বান্দার লাভ হচ্ছে, সে আগাম সংকেত এর কারণে উৎফুল্ল ও আনন্দিত থাকবে এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করতে পারবে।

কোন কোন ওলী-আউলিয়া বলেন — মুমিনের মঙ্গল ও কল্যাণার্থে তাকে স্বপ্ন দেখানো হয়, যাতে সে পূর্ব হতে প্রস্তুত থাকতে পারে। যেমন– ইমাম শাফেয়ী (র:) মিশরে থাকা অবস্থানকালে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র:) সম্পর্কে স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ স্বপ্নে তার সম্পর্কে কঠিন বিপদের সংকেত ছিল। তিনি পত্রের মাধ্যমে আহমদ (র:) কে জানিয়েছিলেন, তিনি যাতে এর জন্য তৈরি থাকেন।

স্বপ্ন বিশারদগণ বলেন, মানুষ যখন ঘুমিয়ে পড়ে বা মোরাকাবায় থাকে, তখন তার আত্মা সূর্য কিরণের মতো সম্প্রসারিত হয় এবং “মালাকুর রুবাইয়া” কে উম্মুল কিতাব বা গায়েবী খাজিনা হতে আল্লাহর নূর বা আলোর মাধ্যমে যা কিছু দেখানো হয়, সে তখন তা দেখতে পারে এবং মুমিন ব্যক্তিদের তা স্বপ্নে দেখানো হয়,সে তখন তা দেখতে পারে এবং মুমিন ব্যক্তিদের তা স্বপ্ন দেখায়। আত্মা বা রূহ এর আসা-যাওয়ার গতি সূর্য কিরণের মতো মুহুর্তের মধ্যে সম্পাদিত হয়। নিদ্রা হতে জাগ্রত হয়ে যখন সে তার ইন্দ্রিয় শক্তি গুলো ফিরে পায়, তখন “মালাকুল রুবাইয়া” তাকে যা কিছু দেখেছিল তা তার স্মরণে এসে যায়।

রুহানি শক্তি বা অনুভূতি শারীরিক শক্তি বা অনুভূতি হতে অনেক বেশি শক্তিশালী। দৈহিক শক্তি বা অনুভূতির মাধ্যমে শুধুমাত্র বর্তমান জিনিসকে অনুভব করা যায়। আর রুহানি অনুভূতি ও শক্তির মাধ্যমে বর্তমান ,ভবিষ্যৎ অনুভব করা যায়।

ইমাম বগভী। (রং:) বলেন— হযরত আলী (রা:) বলেছিলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের রূহ দেহ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কিন্তু দেহের সাথে তার একটা সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে যার মাধ্যমে সে স্বপ্ন দেখতে পায় এবং জাগ্রত হওয়ার সাথে সাথে রূহ তার দেহের মধ্যে পুনরায় ফিরে আসে।

আমীরুল মু’মিনীন হযরত ওমর (রা:) বলেন, মানুষের আত্মা যখন ঊর্ধ্ব জগতে বিচরণ করে তখন আকাশে পৌঁছার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে হুলুম বা মিথ্যা স্বপ্ন বলে যা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে এবং যা কিছু আকাশে পৌঁছার পরে দেখে, তাকে সত্য স্বপ্ন বলে যা আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতার পক্ষ হতে দেখানো হয়ে থাকে।

আমীরুল মু’মিনীন হযরত আলী (রা:) বলেন, আল্লাহ তা’য়ালা প্রত্যেকের রুহ কবজ করেন। আল্লাহর নিকট আকাশে থাকা অবস্থায় যা কিছু দেখে, তাকে সত্য বলে। আর দেহ প্রত্যাবর্তনের সময় (আকাশের নিচে) যা কিছু দেখে এবং ফেরার পথে শয়তান যা কিছুর মিথ্যার প্রবেশ ঘটায় তাকে রুইয়া কাজেবা বা মিথ্যা স্বপ্ন বলে, যা মিথ্যা বলে প্রমাণিত।

পবিত্র হাদীছ শরীফ-এ বর্ণিত আছে যে, নবুয়তের রাস্তা শেষ হয়েছে। কিন্তু পুণ্যবানদের স্বপ্ন অবশিষ্ট আছে।

হযরত রাসূলে করীম (স:) এর উক্ত উক্তি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায়, ঐশীবাণীর মাধ্যমে নবীগণ যেমন বহু অজানিত সংবাদ আল্লাহ পাকের হুকুম আহকাম অবগত হয়ে লোকদের সৎ পথে চালিত করতেন, বর্তমানকালেও স্বপ্নযোগে আল্লাহপাক মানুষকে শুভ-অশুভ জ্ঞাত করে থাকেন।

হযরত নবী করীম (স:) এর একটি বিখ্যাত উক্তি অনুসারে মুমিন ব্যক্তির স্বপ্ন উত্তম নবুয়তের একটি অংশ হিসেবে গণনা করতে কোন রকম দ্বিধার অবকাশ নেই। প্রায় ক্ষেত্রেই সঠিক হয়। নবী করিম (স:) এর র্প্রতি প্রত্যাদেশ নাযিল হওয়ার আগে তিনি অনেক উত্তম স্বপ্ন দেখেছেন আর সে স্বপ্নের মধ্যে অনেক অলৌকিক ব্যাপার ও সংঘটিত হতো।

ওয়ালামায়ে কেউ কেউ বলেন, গাছপালা, তরুলতা, ঘরবাড়ি যাতে পোকায় নষ্ট করতে না পারে সেজন্য ফেরেশতাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যখন এদের সময় শেষ হয়ে আসে এবং মুয়াক্কেল ফেরেশতা চলে যান তখন মৌসুমের স্বভাবের মধ্যে পরিবর্তন দেখা দেয়, আর এ সময়কার স্বপ্নগুলো খারাপ হয়ে থাকে। হযরত দানিয়েল (আ:)বলেন, স্বপ্নের দায়িত্বে নিয়োজিত মুআক্কাল ফেরেশতার ও নাম সিদ্দিককুন তিনিই মানুষের সম্মুখে স্বপ্নের রূপ তুলে ধরেন এবং দুনিয়াতে ভালো-মন্দ তা সংঘটিত হবে, লৌহে মাহফুজে আল্লাহ পাকের গায়েবী খাজানা থেকে আল্লাহপাকের নূর বা জ্যোতির মাধ্যমে তিনি তা বান্দাদের দেখান। এ ব্যাপারে তিনি বিন্দুমাত্র সংশয় বা সন্দেহে পতিত হন না। উক্ত ফেরেশতার উপমায় সূর্যের আলোর মতো— সূর্যের আলো যখন কোন কিছুর উপরে পড়ে, তখন তা আলোর সাহায্যে মানুষের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে এবং মানুষের দৃষ্টিগোচর হয়, ঠিক তদ্রুপ আল্লাহপাকের নূর বা জ্যোতির মাধ্যমে প্রতি বস্তুই তার সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং তিনি তার মারেফাত লাভ করতে পারেন এবং ইহ-পরকালের মানুষের ভাল-মন্দ যা কিছু ঘটবে সে সম্পর্কে বান্দাদের স্বপ্নের মাধ্যমে অবহিত করেন এবং সঠিক পথ দেখান এবং অতীতে যে সমস্ত সৎকাজ করেছে বা ভবিষ্যতে করবে সে সম্পর্কে তাকে সুসংবাদ প্রদান করেন যে সমস্ত গুনাহ করেছে বা উদ্বেগ তাকে সতর্ক করে দেন।

হযরত আবু সা’য়াদ বলেন, আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে সঠিক স্বপ্নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কার্যকলাপ এর তাৎপর্য সম্পর্কে পূর্বাভাস দেয়া হয় এবং তার কাজের পরিণতি সম্পর্কে তাকে সতর্ক করা হয়। কেননা এমন স্বপ্নও আছে যাতে কোনো কিছুর আদেশ-নিষেধ থাকা থাকে বা ধমক থাকে বা কোন কিছু সুসংবাদ বা ভয়-ভীতি প্রদর্শন করা হয়।

হযরত নবী করীম (স:) বলেছেন যে, আমার পরে আর কেউ নবী হবে না সুতরাং কারো প্রতি ওহী নাজিল হবে না কিন্তু মুমিন ব্যক্তিগণ স্বপ্নের সাহায্যেই ওহীর অভাব পূরণ করবে। নবী করিম (স:) এর হাদিস হতে স্বপ্নের গুরুত্ব সম্পর্কে কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।

স্বপ্ন মাত্রই সত্য হয় না। কিন্তু মুমিন ব্যক্তির স্বপ্ন প্রায়ই মিথ্যা হয় না। স্বপ্নও আল্লাহ পাকের নিয়ামত সমূহের মধ্যে অন্যতম। যেহেতু স্বপ্নের ভিতর আল্লাহ পাকের অসীম অনুগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাই একে অবহেলা করা উচিত নয়। স্বপ্ন মানব জাতির ভবিষ্যৎ জ্ঞান হওয়ার দর্শন স্বরূপ।আল্লাহ পাক তার বান্দাদের স্বপ্নযোগে তাদের ভবিষ্যৎ মঙ্গল-অমঙ্গল সম্পর্কে অবগত করে থাকেন। এমনকি, হযরত নবী করীম (স:) নিজেও বহু স্বপ্ন দেখেছেন যা দ্বারা তিনি পরবর্তী জীবনে উপকার লাভ করেছেন। তাই তিনি স্বপ্নকে অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করতেন।

কিছু লোক স্বপ্নকে মোটেই কোন গুরুত্ব দেয় না। তারা বলে থাকে যে, স্বপ্ন হচ্ছে মনের অলীক কল্পনা। কিন্তু তারা জানেনা যে, সৃষ্টির প্রথম হতে আজ পর্যন্ত অসংখ্য পয়গম্বর,আউলিয়া ও পূণ্যবান লোকের কত স্বপ্ন অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হয়েছে।

মানব সৃষ্টির প্রথম হতেই আল্লাহপাক স্বপ্নযোগে ভবিষ্যৎ জানার ব্যবস্থা করেছেন। তাই হযরত আদম (আঃ) হতে আরম্ভ করে প্রায় সকল পয়গম্বরগণ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্বপ্ন দর্শন করে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনেক কিছু অবগত হয়েছেন আমাদের বেলায়ও একই ব্যবস্থা।

স্বপ্নের তাবীর সম্পর্কে জ্ঞানী ব্যক্তি কে ছিলেন?
পূর্ববর্তী নবীগণের মধ্যে হযরত ইউসুফ (আ:) এবং সর্বশেষ নবী রাসুল (সা:) স্বপ্নের তাবীর বা ব্যাখ্যা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ওয়াকেফহাল ছিলেন এবং নবীগণের পর হযরত সাহাবায়ে কেরামগণের মধ্যে হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রং:) সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ ছিলেন। এবং সমস্ত উম্মতের মধ্যে স্বপ্নের তাবীর রহস্য উদঘাটনে ইমাম ইবনে শিরিনের তুলনা স্বয়ং ইমাম ইবনে সিরিন নিজেই। এই বিষয়ে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে বিশেষ পারদর্শিতা ও বুৎপত্তি দান করেছিলেন, যা সর্বজনস্বীকৃত।

এটা আল্লাহ তা’য়ালার বিশেষ অনুগ্রহ বা দান। তিনি যাকে চান, তাকে দান করেন। এমনকি স্বপ্নের তাবীর বা ব্যাখ্যা তার স্বভাব ধর্মে পরিণত হয়েছিল এবং সমস্ত উম্মত তাকে এ বিষয়ে ইমাম ও মুজতাহিদ বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। এর পরপরই হযরত সাঈদ বিন মুসায়িব এর স্থান, যিনি এ বিষয়ে তার কাছাকাছি।
উলামাগণ বলেন স্বপ্ন অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও হতে পারে। অতীতের কোনো কাজ সম্পর্কে স্বপ্ন দারা
তার ত্রুটি-বিচ্যুতি, ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দের প্রতি সমর্থন করা বা শুভ সংবাদ প্রদান করা উদ্দেশ্য হয়।
মানুষ কেন খাব বা স্বপ্ন দেখে?
মানুষের জীবনের ভবিষ্যৎ ধারা কী হবে, তারই আলামত বা ইঙ্গিত স্বপ্নের মধ্য দিয়ে জানতে ও বুঝতে পারে বা মহান আল্লাহ তা’য়ালা জানান। যদি স্বপ্নের তাবীর ভালো না হয়, দুঃখ ও কষ্টময় হয়, তবে মানুষ সাবধান হতে পারে। কেননা হাদীসে আছে, সদকা মানুষকে বালা মুছিবত হতে দূরে এবং কষ্ট বা মুছিবত আসার আগে সংবাদ পেলে ধৈর্যধারণের শক্তি। আর স্বপ্নের তাবীর ভালো হলে খুশি হয়ে আল্লাহর যিকির বা এবাদতে মশগুল হওয়া যায় এবং সুখবরের আভাস যদি আগে পাওয়া যায় তবে দিল আল্লাহর দিকে রজু থাকে।
স্বপ্ন দেখে কি করা প্রয়োজন:
স্বপ্নের কথা উপযুক্ত আলেমের নিকট বলা উচিত। মূর্খ লোকের নিকট বলা উচিত নয়। রাত, সূর্যাস্তের সময়, আযান শোনার সময় স্বপ্নের কথা বলা ঠিক নয়। তাছাড়া শীত ও বর্ষাকালের স্বপ্ন সফল হয়না। এ জন্য স্বপ্ন কারো কাছে না বলাই ভালো। বসন্তকালের স্বপ্ন অন্য সময় চেয়ে উত্তম কিছু স্বপ্নের ফলাফল ৫০–৬০
বছরের ভিতরেও ফলে। এ ফলটা আমাদের সবারই মনে রাখা উচিত।

নিচে কিছু স্বপ্নের তাবীর উল্লেখ করছি:
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) বর্ণনা করেছেন যে, একদিন রাসূলুল্লাহ বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমার উভয় হস্তে দুইটি সোনার বালা রয়েছে। তা দেখে আমি অত্যন্ত ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়লাম। এমন সময় হযরত জিব্রাইল (আ:)এসে আমাকে বললেন যে, আপনার হস্তস্থির বালা দুটির উপর ফুক দিন। আমি তদনুযায়ী তাতে ফুক দেয়া মাত্র বালা দু’টি অদৃশ্য হয়ে গেল।
সাহাবাগণ রাসুল (স:) এর স্বপ্নের তাবীর জানতে চাইলে তিনি বললেন যে, আমার পরে দুজন লোক পয়গাম্বরের দাবী করবে। কিন্তু আমার সাহাবাগণের নিকট তাদের ভণ্ডামি ধরা পড়বে। পরবর্তীকালে রাসূল (স:) স্বপ্ন ও তাবীর সত্য হয়েছিল।

হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রা:) মদীনা শরীফে হিজরতের পূর্বে একদিন স্বপ্নে দেখলেন, একটি অতিশয় উজ্জল চন্দ্র আকাশে নেমে আসলো, তারপর সে চন্দ্র অনেকগুলো নক্ষত্রসহ উড়ে মদিনায় চলে গেল। তারপর মদিনা আলোকিত করে আরও বেশিসংখ্যক নক্ষত্র পুনরায় মক্কায় চলে গেল। এরপর সে চন্দ্র লক্ষাধিক তারকাসহ আবার মদিনায় গিয়ে স্থির হলো।এর কিছুকাল পর তদীয় কন্যা আয়েশা সিদ্দিকার
ঘরের মেঝের ফেটে গেল এবং সে ফাটলের মধ্যে অন্তর্নিহিত হলো পরবর্তীকালে হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রাঃ) এর স্বপ্ন সম্পূর্ণ সত্যি হয়েছিল তা বলাই বাহুল্য।
হযরত ইউসুফ (আ:) যখন জুলেখা বিবির চক্রান্তে মিশরের কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, তখন সে কারাগারে দুজন কয়েদী দুটি স্বপ্ন দেখে। তাদের একজন দেখেছিলেন যে, সে আঙ্গুর চিপে রস বের করছে। আর একজন দেখেছিলেন যে, সে মাথায় রুটি বহন করে যাবার সময় পাখি তা ঢুকরিয়ে খাচ্ছে। তারা যখন পরস্পর পরস্পরের স্বপ্নের বৃত্তান্ত সম্বন্ধে আলাপ করছিলেন, সে সময় হযরত ইউসুফ (আ:) তাদের কথোপকথন শুনতে পেয়ে যে ব্যক্তি “আঙ্গুর চিপে রস বের করছে” খাব দেখেছিলেন, তাকে বললেন যে তুমি শীঘ্রই কয়েদ হতে মুক্তি পাবে এবং বাদশাহের দরবারে পরিবেশনকারী পদে নিযুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি “মাথায় রুটি বহন” করতে দেখেছিলেন তাকে বললেন যে, তোমার প্রাণদণ্ড হবে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই তার এ স্বপ্ন ব্যাখ্যা বাস্তবে পরিণত হলো। প্রথম কয়েদী নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেল আর পূর্ব পদে বহাল হল। আর দ্বিতীয় কয়েদী দোষী সাব্যস্ত হয়ে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হল।

এই ঘটনার কিছুদিন পরেই মিশরের বাদশা আজিজ মিসির নিজে একটি অতি আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলেন। তিনি দেখলেন যে, সাতটি দুর্বল ও শীর্ণ গাভী সাতটি মোটাতাজা গাভীকে গিলে ফেলল এবং সাতটি
শীর্ণ শস্যের শীষ সাতটি মোটাতাজা শীষকে গিলে ফেলল। এ আশ্চর্য স্বপ্ন দেখে বাদশার মনে ভীষণ ভাবান্তর উপস্থিত হল। তিনি এর কারণ বুঝতে না পেরে দরবারের লোকজনদের বৃত্তান্ত বর্ণনা করে এর মর্মার্থ শুনতে চাইলেন। কিন্তু স্বপ্নের তাবীর বা অর্থ কেউ বলতে পারলেন না। সকলেই মনগড়া কথা বলল। কেউ বলল যে, এর কোনো অর্থই নেই। ইহা মনের চিন্তা মাত্র। বাদশা কিন্তু কারো কথায় আশ্বস্ত হতে পারলেন না। তাঁর মনের ভাব দূর হলো না।

ইতোমধ্যে শাহী দরবার এর শাকী (যে পূর্বে কয়েদী ছিল) বাদশা কে বলল যে, শাহেনশাহ জেলখানায় একজন কয়েদী আছে, সে স্বপ্নের ফলাফল এমন সুন্দর ভাবে বলতে পারে যে,তা অবিকল সত্যে পরিণত হয়। প্রসঙ্গক্রমে সে নিজের স্বপ্নের কথা বাদশার কর্ণগোচর করল ও বলল, সে আমার সম্বন্ধে এবং মৃত্যুদন্ডের কয়েদী সম্বন্ধে যা বলেছিল, তা সম্পূর্ণ সত্য হয়েছে। বাদশা একথা শুনে তখনই কয়েদখানা হতে হযরত ইউসুফ (আ:) কে বের করে স্বপ্নের কথা বললেন। তিনি এটাও বললেন যে, তুমি যদি সঠিকভাবে আমারে স্বপ্নের ব্যাখ্যা বলে দিতে পারো এবং তা সত্য হয় তবে তোমাকে এমন ভাবে পুরস্কৃত করবো যা তুমি কল্পনা করতে পারবে না।

হযরত ইউসুফ (আ:) বাদশার স্বপ্নের অর্থ এরূপ বললেন যে, একাধিক্রমে সাত বছর দেশে শস্যাদি মোটেই উৎপন্ন হবে না, সুতরাং দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে। তিনি এটাও বললেন যে, যদি দেশকে রক্ষা করতে হয় তবে প্রথম সাত বছর প্রচুর পরিমাণে খাদ্য মজুদ করে রাখতে হবে, যা দ্বারা পরবর্তী সাত বছরে অজন্মা জনিত অভাব পূরণ করে দুর্ভিক্ষকে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।

হযরত ইউসুফ (আঃ) এর ব্যাখ্যা এবং দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের ব্যবস্থা উভয়ই বাদশার অত্যন্ত পছন্দ হলো। হযর ইউসুফ (আঃ:) এক স্বপ্ন ব্যাখ্যা তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করলেন এবং তাঁর গভীর জ্ঞানের পরিচয় পেয়ে খুশি হলেন। হযরত ইউসুফ (আঃ:) বাদশার নেক নজরে পড়তে প্রধান উজিরের পদ প্রাপ্ত হলেন। এরপর বাদশার মৃত্যুর পর তিনি নিজেই মিশরের বাদশা হয়েছিলেন।
বাগদাদের খলিফা হারুন – অর- রশিদের স্ত্রী বেগম জোবায়দা খাতুন একদিন স্বপ্ন দেখলেন যে, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল হতে অসংখ্য লোক এসে তার সাথে মিলন করে পরিতৃপ্ত হয়ে যাচ্ছে। এ স্বপ্ন দেখে নিদ্রা হতে জাগ্রত হয়ে বেগম জুবায়দা একাধারে ঘৃণায়, লজ্জায় ও চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। তিনি কার নিকট হতে স্বপ্নের তাবীর জানবেন তা চিন্তা করতে লাগলেন।
অবশেষে তার বিশ্বস্ত দাসীকে দেশের প্রধান কাজী সাহেবের নিকট স্বপ্নের তাবীর জানার জন্য পাঠালেন, কিন্তু বেগমের নাম গোপন রেখে দাসীকে তার নিজের স্বপ্ন বলে বর্ণনা করতে বললেন। বাদী বেগম সাহেবের আদেশ অনুযায়ী কাজী সাহেবের নিকট স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন যে, কে এই স্বপ্ন দেখেছে, ঠিক করে বলো।
দাসী পুনরায় বলল যে, আমি নিজেই দেখেছি। তখন কাজী সাহেব বললেন যে, এরূপ স্বপ্ন কখনো তোমার হতে পারে না। প্রকৃত স্বপ্ন দর্শনার্থীর নাম না বললে এই তাবীর বলা সম্ভব নয়। অগত্যা দাসী ফিরে এসে বেগম সাহেবার অনুমতি নিয়ে বলল যে, আমাদের বেগম সাহেবা এ স্বপ্ন দেখেছেন।
তখন কাজী সাহেব বললেন, বেগম সাহেবার দ্বারা এরূপ কোন একটি মহৎ কাজ অনুষ্ঠিত হবে যার দ্বারা পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের লোক উপকৃত হবে। পরবর্তীকালে পানির কষ্ট দূর করার জন্য মক্কা শরীফ হতে মদিনা শরীফ পর্যন্ত বিরাট একটি খাল খনন করে দিয়েছিলেন, যা আজ পর্যন্ত “নহরে জুবায়দা” নামে পরিচিত হয়ে বেগম জোবেদা খাতুনের অক্ষয়কীর্তি ঘোষণা করছে।
উপরে উল্লেখিত মনীষীদের স্বপ্ন এবং এর তাবীরগুলির বিষয় একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে স্বপ্ন এবং এর তাবীরের গতিধারা সম্বন্ধে প্রত্যেকেরই একটা মোটামুটি ধারণা জন্মাবে এবং স্বপ্ন সম্বন্ধে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকবে না।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY