লেখক শেখ মোঃ মজিদ বিন মোর্তুজা এর বিশ্লেষণ ধর্মী ভিন্ন মাত্রার গল্প“কবুল কোরবানী!”

372
লেখক শেখ মোঃ মজিদ বিন মোর্তুজা

কবুল কোরবানী।

                        শেখ মোঃ মজিদ বিন মোর্তুজা

আজ থেকে প্রায় ২০/২২ বছর আগের কথা।সেটা ছিলো সিমুর নানা বাড়ীর প্রথম কোরবানী।
হুম!সেটা কোরবানী হয়েছিলো কিনা বলতে পারবো না।তবে বিশ্বাস করি।হয়তো আল্লাহ্ তা কোরবানী বলে কবুল করে নিয়ে ছিলেন।কারণ,তাতে সেচ্ছায় জীবন দানের মুজিযা ছিলো——
যাহোক,তখন সিমুর নানা বাড়ী অনে-কগুলো গরু ছিলো।আর তার মধ্যে যে গরুটা সবচেয়ে সুন্দর ও বড় ছিলো।তার নাম ছিল কালু।কালুর গায়ের রঙ কালো ছিলো।তাই,সবাই তাকে কালু বলে ডাকতো।কালুকে দেখে সবাই ভয় পেতো।কারণ কালু ছিলো খুবই উঁচু,লম্বা ও বলিষ্ঠ——
তাই কালু চাইলে অনায়াসেই সবাইকে আঘাত করতে পারতো।বা সবার মুখের খাবার কেড়ে খেতে পারতো।কিন্তু না!কালু কখনোই তা করতো না।কারণ,কালু ছিলো খুবই ভদ্র—-
তবে,কালুর একটা বদ অভ্যাস ছিলো।সে সারাদিন যা-ই খাক না কেন,দিন শেষে তার শেষ খানা সিমুর নানীর হাতের হওয়া চাই। তা না হলে তার নাকি পেট’ই ভরতো না।আর,দিনের শেষে সিমুর নানীর হাতে শেষ খানা খেলে—–তবেই নাকি সে গোয়ালে গিয়ে নাক ডেকে ঘুমাইতো—–
একদিন,বিকেল বেলা সিমুর নানা ও নানী কালুর গোড়ার পাড়ে গিয়ে কালুকে সাক্ষি রেখে আল্লাহর নামে তাকে কোরবানী করার জন্য নিয়ত করলো—
হুম!সেদিন সিমুর নানা ও নানীর মুখে কোরবানীর কথা শুনতেই কালু খাওয়া বাদ দিয়ে তাদের মুখের দিকে তাকালো।আর সিমুর নানী কালুকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো।কালু বুক থেকে মাথা নামিয়ে নিয়ে সিমুর নানীর পায়ের সাথে কিছু সময় মুখ লাগিয়ে নীরব রইলো।তারপর কালু তার মাথা তুলে সিমুর নানার কাঁধে-কাঁধ রাখলো——-
সেদিন সিমুর নানীর সাথে সাথে সিমুর নানাও খুব কেঁদে ছিলো। কিন্তু,আশ্চর্য বিষয় ছিলো এইযে—-সেদিন কালু কিন্তু বিন্দুমাত্রও কাঁদেনি।বরং সেদিন সন্ধ্যায় কালুকে যখন সিমুর মেঝো মামা খাওয়া দাওয়া শেষে ঘরে তুলতে গেলো।
তখন কালু তার হাত থেকে ছুটে গিয়ে সারা বাড়ী আনন্দে ছোটা ছুটি করেছিলো——
ঈদের দিন সকাল বেলা সিমুর ২/৩ মামা মিলে কালুকে ভালো করে সাবান দিয়ে গোসল করালো।কালুর বড় বড় শিংয়ে আদর করে তেল মাখিয়ে দিলো।গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিলো——
আর সিমুর নানী চাল্ ডাল ভুষির সাথে নুন-ভাত,লালী-পানি মিশিয়ে কালুকে খেতে দিলো।কালু খেয়ে দেয়ে চুপ করে ঘুমিয়ে পড়লো।আর বাড়ীর সবাই ঈদের নামাজে গেলো——-
নামাজ থেকে এসে খাওয়া দাওয়া করে সিমুর মামা-খালুরা সবাই মিলে কালুকে নিয়ে জবাইয়ের স্থানে গেলো।কালুর পায়ে দড়ি লাগালো—–
তারপর!তারপর সিমুর মা-খালারা এসে কালুকে চুমো খেলো। কিন্তু কালু কোনো সাড়া শব্দই করলো না।শুধু বাড়ীর দিকে তাকিয়ে রইলো——-অার সিমুর নানা এসে যখন কালুকে বুকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেলো।তখন কালুর চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি পড়তে লাগলো।
অতঃপর সিমুর মামা-খালুরা সবাই মিলে কালুকে জবাই’র জন্য টান দিয়ে মাটিতে শোয়ালো।
তারপর হুজুর কালুকে জবাই করার জন্য কালুর কাছে আসতেই কালু দড়ি ছিঁড়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়লো—–
আর কালু দড়ি ছিঁড়ে লাফ দিয়ে উঠে পড়তেই সবাই ধর!ধর! বলে চিল্লায়ে উঠলো।কিন্তু,না!শত চিল্লাচিল্লি করেও কেউ আর কালুকে আটকাতে পারলো না।তবুও কালুকে ধরার জন্য সবাই সারা বাড়ী দৌড়া-দৌড়ি করলো——
কিন্তু কালু কাউকে ধরা দিলো না।বরং সে দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে সোজা সিমুর নানীর ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালো।
সিমুর নানী তখন কালুর নামে নফল নামাজ পড়তে বসেছিলো।
সিমুর নানী নামাজ শেষ করে কালুর সামনে এসে দাঁড়ালো।কালু মাথা নিচু করে সিমুর নানীর পায়ের কাছে মুখ রাখলো——-
সিমুর নানী কালুকে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমো দিয়ে বল্লো-
কি হইছে বাবা!শোয়া থেকে উঠে এসেছো কেন?তুমি নিজেকে কোরবান করতে রাজি না?কালু কোন কথা বললো না (নড়া-চড়া করলো না)।
তারপর সিমুর নানী কালুর মুখটা সামনে এনে কালুকে বললো-
সোনা,তোমাকে না আল্লাহর নামে দান করেছি!এখন তুমি যদি এমন পাগলামো করো।তাহলে আল্লাহ নারাজ হবে।তুমি কি চাও আল্লাহ নারাজ হোক?
এ কথা শুনে কালু ডানে-বামে মাথা নেড়ে বললো-না।তখন সিমুর নানী বললো-তাহলে যাও বাবা,এবার গিয়ে নিজে নিজেই শুয়ে পড়!
অতঃপর কালু সিমুর নানীর পায়ের সাথে মুখ লাগিয়ে সোজা জবাইয়ের স্থানে চলে গেলো।কালুর সাথে সাথে সিমুর নানীও গেলো।
কালু সেখানে গিয়ে একা একাই শুয়ে পড়লো।সবাই কালুকে শক্ত করে জাতা দিয়ে ধরলো।কালুর হাত-পা দড়ি দিয়ে বাঁধলো।কিন্তু
তখনো কালু চোখ মিলে সিমুর নানীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো——-
কালুর চোখে চোখ পড়তেই সিমুর নানী,চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া ভালোবাসার অশ্রুজল হাত দিয়ে মুছে কাঁদা কাঁদা কণ্ঠে কালুকে বললো-এবার চোখ বন্ধ করো সোনা—-।
তখন কালু একবার চোখের পলক ফেলে তার চোখ দুটি বন্ধ করলো—
অতঃপর হুজুর আসলো।বিসমিল্লাহ,আল্লাহু আকবার বলে ছুরি- তে চুমো দিয়ে আল্লাহর নামে কালুকে জবাই করলো।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY