টু বি কন্টিনিউড
-নাসরিন আক্তার
১,
বিছানার পাশ টেবিলে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠতেই বই থেকে মুখ তুলে নিহা। মোবাইলের স্কিনে চোখ না গিয়ে চোখ যায় দেয়াল ঘড়িটার দিকে। ঘড়িটা মধ্যরাতের নির্দেশ করছে ।ও জানে এত রাতে ঐ বাদরটা ছাড়া আর কেউ ফোন করেনি। বিরক্ত নায় বরং একটা মিষ্টি উষ্ণতায় ভরে উঠে মন। কিছুক্ষণ আগেই একপশলা বৃষ্টি ঝরে গেছে তার রেশ ধরে আকাশ অনবরত ঝরিয়ে যাচ্ছে মিহি বরফের কুঁচি। এমন রাতে নিহার ঘুমাতে ইচ্ছে করেনা । তাই মুখের সামনে মেলে ধরে আছে কবিতার বই।এমন মুহূর্তে কবিতা পড়তে ভালোই লাগে নিহার। ঘণ মেঘপুঞ্জের সাথে মিলিয়েই দাদু ওর নাম রেখেছিলেন নিহারিকা। সে নামটাই আদরে আহ্লাদে ছোট হয়ে নিহা হয়ে গেছে।
নিহা শুয়ে থেকেই আলতো করে মোবাইলটা কানে ধরে , কল ধরতেই ও পাশ থেকে ভাড়ী গলায় তুহিন বলে উঠে — এত রাত জেগে কি করা হচ্ছে মহারানীর? ফোন ধরতে এত দেরি কেনো?
— বসে বসে তোর ফোনের অপেক্ষা করছিলাম, হলো! তবে শাহাজাদা আপনি জেগে কেনো?
— এই যে তোকে ফোন করবো তাই।
বলেই হো হো করে হেসে উঠে।
— এত রাতে কি করছিলি!
— শুয়ে শুয়ে তোকে ভাবছিলম
- তাই! কি ভাবছিলিরে?
তুহিন কিছুক্ষণ ভেবে বলে
–কি ভাবছিলাম! শোন তোকে একটা গল্প শুনাই । গল্পটা মন দিয়ে শুনবি, বুঝলি।
নিহা ফোনটা কানের উপর রেখেই পাশ ফিরে বালিশে আয়েস করে মাথা রাখে - বল শুনছি,
লম্বায় পাঁচফুট চার ইঞ্চি তুহিন দেখতে যেমন হ্যাণ্ডসাম গলার স্বরও আরজেদের মত গমগমে। বাংলায় মাষ্টার্স করে বেরিয়েছে দুবছর হলো। পত্রিকায় টুকটাক লেখালেখি করে। গল্পও বলে দারুণ সাজিয়ে গুছিয়ে। তুহিন গমগমে গলায় গল্প বলা শুরু করে - – ধর একটা গ্রাম্য স্কুল মাস্টারের রান্না ঘর। মাটির মেঝে, একপাশে সাদা ধাধবে মাটি দিয়ে নিকানো চুলা। সদ্য রান্নাকরা গরম ভাত, সজনে আলু দিয়ে শিং মাছের ঝোল আর লাল মরিচ দিয়ে বেগুন ভর্তা। মাদুর পেতে খেতে বসেছে মাষ্টার। তার দুই পাশে আদরের দুই ছেলে মেয়ে। মাথার উপর আধ ঘোমটা তোলা আঁচল টেনে মাস্টারের বউ পরম যত্নে ওদের প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে।
গল্পের মাঝে নিহা বলে উঠে-
এটা কি তোর নতুন কোনো উপন্যাসের প্লট?
- কথার মাঝে বামহাত ঢুকাবিনা । চুপ করে গল্পটা শোন-
- আচ্ছা আর কথা বলবো না, বল। তুহিন আবার বলতে শুরু করে — ঘরের এক কোনে সদ্য কল থেকে ভরে আনা পানি ভর্তি মাটির কলস চৈত্রের খরতাপ দুপুরে তেষ্টাকে আরো বাড়িয়ে দেয়। ছনে ছাউয়া ঘরটাকে ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়টি সুপুরি গাছ।
–হ্যালো! হ্যালো! নিহা আছিস ?
— আছিতো, বলে যা – - একটু হু হা করিস্ নয়তো মনে হয় বাতাসে কথা বলছি।
- শুনছি, আর চোখ বন্ধ করে কল্পনা করছি তোর সুশীতল রান্না ঘর।
- শোন এবার গল্পের মূল অংশে আসছি, মনযোগ দিয়ে শুনবি বুঝলি।
- হুম শুনছি বল,
তুহিন আবার গল্পে ফিরে যায় –
ওরা চার জন ছাড়াও ঐ রান্না ঘরে তখন আরো একজন ছিলো। সাদা ধবধবে, তুলোর মতো নরম শরীর আর রাজ্যের মায়া ভরা শান্ত দুটি চোখ তার । সে গোবেচারা মুখ করে বার বার এর ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছিলো আর মাষ্টারের ছেলে মেয়ের তুলে দেওয়া , মাছ- ভাত চেটেপুটে খাচ্ছিলো। তবে দেখে যতটা ভোলাভালা মনে হয় সে আসলে মোটেও সে রকম না, সুযোগ পেলেই গরম দুধের হাড়িতে মুখ দিয়ে চুক চুক করে সবটুকু দুধ সাবার করে দিতে পারে বুঝলি! - – এই কি বলছিস! সে কে?
- সে নরম তুলতুলে আদরে একটা সাদা বিড়াল।
— মানে? - মানে হলো গল্পের সেই সাদা বিড়ালটা হলি তুই।
নিহা, রাগ না করে হা হা করে হেসে উঠে তুহিনের গল্প বলার ধরণ দেখে। এই কথাটা বলতে কত সুন্দর করে গল্প বলে গেলো অবলিলায়।
নিহা হাসতে হাসতে বলে - এটা বলার জন্যে এত বড় গল্প সাজালি?
- আরে একটা জিনিস পুরোপুরি বুঝাতে হলে তাকে তো সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করতে হবে তাই না! আর আমি ছাড়া তোর এই দুমুখো চেহারা কে জানে বল!
এবার নিহা খেকিয়ে উঠে –
আমি বিড়াল হয়ে কি করেছি তোকে বল! খাঁমচে দিয়েছি নাকি কামড়ে দিয়েছি।
— দিসনি তবে দিতে কতক্ষণ? ( মনে মনে বলে তুই যে আমার কি করেছিস তা তো আমিই জানি)। তোর সাথে বেশ মিলেছে না! তুই যেমন আদুরে আদুরে ঠিক তেমনি তবে মাঝে মাঝে একটু হিস্রও।
- তুই তো বাদরের চাচাতো ভাই হনুমান।
মোবাইল রাখ বলছি। বলেই কপট রাগে নিহা মোবাইল রেখে দেয়। ঐ বাদরটাকে এতটা লাই দেওয়া চলবে না তাই এই দূরত্ব তৈরী করা।
২,
নেহা মোবাইল রেখে দিলেও জোনাক জ্বলা মিহি আলোর সুতায় রাতের প্রহর সেলাই করে তুহিনকে নিয়েই। ভার্সিটিতে দেখা প্রথম দিন হতে আজ পর্যন্ত সব যেনো ছবির ফ্লেমের আর্কাইভের মতো একে একে চোখে ভেসে উঠে। দুধে আলতা গায়ের রঙের সাথে যোগ হয়েছে পটল চেড়া গভীর মায়াবী চোখ, গোলাপের পাপড়ীর মতো ঠোট। এক কথায় সুন্দরীর কোঠায় এনে দাঁড় করায় নেহাকে। নেহা আর তুহিন ঢাকা ভার্সিটিতে দুজন দুই ডিপার্টমেন্টে দু বছর যাবত পড়ছে অথচ দেখা হয়নি কেনো এটা নিয়ে তুহিনের অক্ষেপের শেষ নেই। বলে —
দেখ আমরা এই বর্ণিল ঝগড়াময় জীবন থেকে রিতিমতো দুবছর পিছিয়ে গেলাম।
এটা সত্য ঝাগড়া ছাড়া ওদের যেমন সকাল হয় না আবার রাতও হয় না।
নেহা এবার বুকের কাছে বালিশ টেনে পাশ ফিরে শোয়। চোখ বন্ধ করে যেনো তুহিনকেই কাছে টানে, মনে পরে যায় তুহিনের সেই বোকা বোকা কথা গুলো। অবশ্য তুহিনকে যখন তখন বোকা বানাতে নেহা’র বেশ লাগে। সেদিন তুহিন ওকে অন্য একটা মেয়ের সাথে তুলনা করে কথা বলায় সত্যি সত্যিই ওর রাগ হয়, আর রাগলেই গভীর কালো চোখে বর্ষা নামে। কথা হচ্ছিলো পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়িতে বসে।
রাতের আঁধারে বালিশে মুখ লুকিয়ে নেহা হেসে ফেলে। সত্যিই বেচারা সেদিন ঘাবড়ে গেছিলো। বার বার কান ধরে ক্ষমা চাইছিলো আর বলছিলো আর কখনো এমন হবে না। এক পর্যায়ে নেহা’র হাত দুটি চেপে ধরে বলে —
অনেক সাহস সঞ্চয় করে তোর হাত দুটি ধরেছি এবার ক্ষমা করে দে!
সেই যে হাত ধরা তারপর,,, প্রয়োজনে অপ্রোজনে একে অন্যের জন্য পায়ে পায়ে পথ চলা। কথা -খুনসুটি ঝগড়া কি না হয় ওদের। তবুও কোথায় যেনো একটা অদৃশ্য বাধা এসে ওদের সম্পর্কের মাঝে রাশটেনে ধরে । সমাজ- সংসার , ধর্মকে উপেক্ষা করে ওরা সে দেয়াল ডিঙ্গাতে পারে না।
৩
হালকা ঝড়ো বৃষ্টিতে তুহিনের মনআকাশেও শরতের মেঘের আনাগোনা। জানালার গ্রীলে হেলান দিয়ে গিটারে টুংটাং সুর তুলে। সেই সুরে ঝঙ্কারকে মনে হয় শীতের পাতাঝরা রিক্ত হৃদয়ের হাহাকার। ও বুঝে না সব বুঝেও নেহা কেনো ওকে এড়িয়ে চলে। কেনো এত কষ্ট দেয়। মাঝে মাঝে মনে হয় নেহা বুঝি শুধুই ওর। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় নেহা যেনো দূরের কেউ। এতদিনেও ঠিক বুঝেনা নেহাকে। মন খারাপ হতে হতেও হঠাৎ একদিনের কথা মনে হয়ে নিজের মনেই হেসে উঠে তুহিন ।
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ, একটু একটু শীত পরেছে। বছরের প্রায় ছ’মাসই নেহাকে গরম পানিতে গোসল করতে হয়। দুপুর একটা, চুলোয় গোসলের গরম পানি বসিয়ে কিচন থেকে বেরোতেই মোবাইল বেজে উঠে। ভ্রু কুচকে মোবাইলটা হাতে নেয় নেহা, জানে ও’- এই অসময়ে ফোনটা কে করতে পারে…
মোবাইল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে-
-পেত্নী কি করস?
-বান্দর, তোর কি কোনদিন সময় জ্ঞান হবে না! এই সময় কেউ ফোন করে?
-তোকে ফোন করতে কি আমাকে দিন, তারিখ, মাসের হিসেব করতে হবে? নাকি অ্যাপয়েন্ট নিতে হবে?
-তোর কি মনে হয়?
-ওকে, এরপর থেকে অ্যাপয়েন্ট নিয়েই ফোন করবো সম্মানীয়া।
-বান্দর!!!
-জানতাম বকা খাবো, তার জন্য প্রস্তুতও ছিলাম। তোর বকা না খেলে আমার পেট ভরে না।
-তুই তো বকা খাওয়ার জন্যই ফোন দিস।
-সত্যি বলছি তোর বকা না শুনলে আমার ভালো ঘুম হয় না। এবার বল, আজ খাওয়া দাওয়া কি তোর বাসায়?
-খাওয়া ছাড়া আর কোন গল্প নাই?!
-খাওনই জীবন খাওনই মরণ। দুগা ভাতের লাইগ্যাই তো বাইচা আছি।
-শোন তাইলে, বেগুন ভর্তা, শোলমাছ ভুনা, ফুলকপির সবজি।
-ইসরে, কতদিন শোলমাছ খাই না।
শোলমাছ ভুনা দিয়ে ভাত খেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বাসায় আম্মা শোলমাছ খায় না, তাই কেনাও হয় না।
-বেশি করে পেয়াজ, রসুন আর ঝাল দিয়ে, জিরার বাগাড়ে(ফোঁড়নে) শোলমাঝ ভুনা দারুণ লাগে।
-হ, এক্কেরে কইতরের মাংসের লাহান।
-কবুতরের মাংস আমার খুব পছন্দ। আমার এখন কবুতরের মাংস খেতে ইচ্ছে করছেরে ।
-ঢাকার বাজারে তো কবুতর পাওয়া যায়, একটু দরদাম করে কেনা লাগে আরকি।
-হুম যায় তো। শোন তুই একদিন দুইটা কবুতর নিয়া বেড়াতে আয়, তোকে আলু ভর্তা দিয়া ভাত খাওয়াবো।
-কি বললি পেত্নী !
-সত্য বললাম, মচমচে ভাজা শুকনা মরিচ, কাচা পেয়াজ আর সরিষার তেল দিয়ে লাল লাল করে মেখে আলু ভর্তা।
-হায় আল্লাহ্, কয় কি পেত্নী?! দুইটা কবুতরের বিনিময়ে আলু ভর্তা!!!
-তো! যে যেটা খেতে পছন্দ করে তার জন্য সেটা। আচ্ছা যা সাথে একটা ডিম ভাজিও দিবো আর সাথে দুইটা শুকনা মরিচ ভাজা।
-ওরে আল্লাহ্!!! ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি!
বলতেই এপাশে নেহা টুপ করে ফোন কেটে দিয়ে মুখে একটু দুষ্ট হাসি নিয়ে বাথরুমে ঢুকে যায়। ওপাশে তুহিন কপাল কুচকে মোবাইলের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে, যেনো কেউ এখনি ওর সামনে থেকে একবাটি কবুতরের মাংস সরিয়ে নিলো।
সম্পর্কের বয়স পাঁচ বছর। গভীর, কঠিন বন্ধুত্ব, কখনো তুই কখনো তুমিতে ওরা বিচরণ করে। মিষ্টি কথার চেয়ে ঝগড়াই হয় বেশি। অথচ দুজনাই জানে দুজনকে কতটা ভালোবাসে। তুহিনের ইচ্ছে করে যখন তখন নেহার হাত দুটি ধরে ওর লাজুক লাজুক আনত চোখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। আর নেহাও জানে তুহিন ওর কতটা নির্ভরতার জায়গা তবুও দূরত্ব ওদের মাঝে বিরাট এক প্রশ্নবোধক চিহৃ এঁকে দাঁড়িয়ে থাকে। থাকতে হয়…
এই দূরত্বে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ডিঙিয়ে কেউই সামনে আগাতে পারে না।




















