“একলা বাতাস” ধারাবাহিক গল্পটি ( ২য় পর্ব ) লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সারথি–আবির হাসান সায়েম

57
“একলা বাতাস” ধারাবাহিক গল্পটি ( ২য় পর্ব ) লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সারথি–আবির হাসান সায়েম

“একলা বাতাস”

আবির হাসান সায়েম

মরিয়ম বেগম চুলা ধরানো চেষ্টা করছেন, পারছেন না। যতবার আগুন ধরাতে যান ততবারই বাতাস এসে আগুন নিভিয়ে দেয়। আকাশটা প্রচন্ড মেঘলা । মরিয়ম বেগম নিজের মনে বলে উঠলেন, আইজ মনে হয় ঝড় নামব।
দূর থেকে হাসির শব্দ শুনা যাচ্ছে। রইজ উদ্দিন সাহেব বাথরুমে বসে হাসছে। তিনি সকালে বাথরুমে যান একটা বই নিয়ে। সারাদিন লোকটা ওই একবারই হাসেন। মরিয়ম সাহেব গত সতেরো বছরে মোট বারোবার লোকটাকে হাসতে দেখেছেন। কি আছে এমন বইটাতে মরিয়ম বেগমের জানতে ইচ্ছে করে। সে পড়তে পারেন না। কাওকে বলবেন পড়ে শুনাতে, এমন মানুষও নেই। ঝপঝপিয়ে বৃষ্টি নামল।
বাইরে গাড়ির হর্ণে আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। রান্নাঘরের বেড়ার ফাঁক দিয়ে মরিয়ম বেগম দেখলেন, গাড়ি থেকে একজন লোক নামল। লোকটার বয়স ভালোই, মাথায় একটা চুলও নেই। সে উঠানে লাফালাফি করছে। একটা মধ্যবয়ষ্ক লোক ছোট ছেলেদের মতো বৃষ্টিতে লাফাচ্ছে এই দৃশ্য মরিয়ম বেগম তার সারা জীবনেও দেখে নি। তিনি নিজের মনেই বলে উঠলেন, আস্তাগফিরুল্লা।
ইলা আর রাকিব গাড়িতে বসে আছে। ইলা হাসছে আর রাকিব ঘুম থেকে উঠে এমন অদ্ভুত একটা দৃশ্য দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেছে। তাদের বাবা উন্মাদের মতো নাচছে। ইলার বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে না। কিন্তু আজ খুব ইচ্ছে করছে ভিজতে। সাদেকও গাড়ি থেকে নেমে পরল। একটা ছবি তোলা দরকার। মা’কে দেখানো যাবে। ইলা ক্যামেরাটা খুজে পাচ্ছে না। দরকারের সময় কিছুই খুজে পাওয়া যায় না। ঘর থেকে একটা মহিলা দরজার সামনে এসে দাড়ালো। মহিলাটাও কৌতুহলী চোখে তাকিয়ে আছেন। রফিক সাহেবের চোখ ওই মহিলাটার দিকে পরতেই, তিনি থমকে দাড়ালেন। মুখটা গম্ভীর হয়ে গেলো।
ঘরের সামনে কিছুটা জায়গা রাখা হয়েছে, বারান্দার মতো। সেখানে রইজ উদ্দিন এবং রফিক সাহেব পাশাপাশি বসে আছেন। বৃষ্টি এখনো থামে নি। উঠানে পানি জমতে শুরু করেছে । রইজ উদ্দিন বললেন,
“কেমন আছো রফিক?”
“জ্বি ভালো আছি। আপনার শরীরটা কেমন?”
“আপাতত ভালো। বৌমা রে নিয়া আসলা না? ”
” তার একটা জরুরী কাজে আটকা পরেছে, তাই আসতে পারে নাই। ”
“ওহ আচ্ছা। আসার আগে একটা চিঠি লিখতা। এতোদিন পর আসছ। প্রথমবার আমার নাতিরা আসছে। ব্যবস্থা কইরা রাখতাম।”
” এমনেই লিখি নি। আপনি আমাকে মিথ্যা চিঠি লিখেছেন কেনো? ওই মহিলা তো মরে নি। মিথ্যাটা না লিখকেও পারতেন।”
” আমি মিথ্যা না লিখলে কি তুমি আসতা? অনেকসময় আমাদের মিথ্যা বলার লাগে, বাধ্য হইয়াই বলা লাগে। ”
“আমি আজই চলে যাবো। এই মহিলা যে বাসায় থাকবে সে বাসায় থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। ”
রইজ উদ্দিন কিছুক্ষণ পর একটা হেসে বললেন,
” চইলা যাইবা বললেই তো যাওন যায় না। আসছ নিজের ইচ্ছায়,যাইবা আমার কথা মতো। ভাবসিলাম তোমারে বলমু না, আমার ক্যান্সার ধরা পরসে। পাকস্থলীর ক্যান্সার। সদরে গেসিলাম, সেখানে ডাক্তার বললেন, আপনার কাছে বেশি দিন নাই। বড়জোর ছয় মাস। আমি মিথ্যা বলতেসি না। তুমি চাইলে রিপোর্ট দেখাইতে পারি। দেখাবো?”
“না দেখাতে হবে না। আপনি আমাদের সাথে ঢাকা চলেন। আমি আপনাকে বিদেশ নিয়ে যাবো। ”
“লাভ নাই। মানুষ তার মৃত্যু আগে থেইকাই বুঝতে পারে। আমিও পারতেসি। আমি এই ভিটাতেই আমি মরতে চাই। দেশের মাটিতে মরণেরও শান্তি আছে। ”
” রশিদের কোনো খবর পেয়েছেন?”
“না, নানান জন নানান কথা কয়, কেও কয় মারা গেছে, কেও কয় সন্ত্রাসী হইসে। জানি না কোনটা সত্যি। ”
কিছুক্ষণ কেও কোনো কথা বলল না। রইজ উদ্দিন বললেন,
“যাও ভিতরে গিয়া একটু ঘুমাও। অনেক বড় যাত্রা করে আসছ৷ ঘুমাইলে শরীরটা ভালো লাগব। যাও। ”
“আব্বা। ”
“বলো। ”
“আমার ইচ্ছা করছে আপনাকে জড়িয়ে ধরে কিচ্ছুক্ষণ কাদতে। ”
“ইচ্ছা করলে কাদো। ইচ্ছারে চাপা রাখতে নাই। আত্মার কষ্ট হয়। ”
রফিক সাহেব রইজ উদ্দিনকে জড়িয়ে ধরে হাওমাও করে কাদছেন।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY