“ফিরে পাওয়া”গল্পটি লিখেছেন সভ্যতা গড়ার অন্যতম সারথি ওপার বাংলার কবি ও লেখক সুজাতা দাস ।

443

 ফিরে পাওয়া

             সুজাতা দাস

কমলিনি- এক হাসিখুশিতে ভরপুর, মিষ্টি চেহারার পঞ্চাশোর্ধ মহিলা-
যে নিজের আইডেন্টিটি খুঁজে চলেছে সেই ছোট্ট থেকে, কারও স্ত্রী, কারও মা, কারও মেয়ে হিসেবে নয় শুধু কমলিনি হিসেবে-
সেই কমলিনি- অনেক ছোট্ট বয়েসে বিয়ে হয়ে চলে এলো, শ্বশুর বাড়ি বাসু’পরিবারে- সেখানেও কেউ তার অনেক প্রিয় নামটা ধরে ডাকলো না-
সবাই অমুকের’বউ, অমুকের’মা বলেই ডাকতে থাকলো-
এটা কখনও তার পছন্দ ছিলনা, আর সবকিছুতেই প্রাণখোলা হাসতো বলে বাসু’পরিবারের সকলেই বলতেন মাথায় বুদ্ধি কম কমলিনির-
আর এতটা বয়সে এসেও যে “বোধ” হলনা কমলিনি বাসুর, এটা সবসময় মনে করিয়ে দিতে ছাড়তেন’না তার পতিদেব সুনির্মল বাসুও-
সবার সব কথাকে পাশে সরিয়ে নিজের মতো করেই চলে এসেছে সবসময় কমলিনি কারন সে ছোট্ট থেকেই প্রচন্ড স্বাধীনচেতা আর নিজের মর্জি মতোই চলতে ভালোবেসেছে, কিন্তু প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছে শ্বশুরবাড়ির ছাঁচে নিজেকে সাজিয়ে নিতে কষ্ট পাওয়া সত্ত্বেও-
খুব মন দিয়ে সংসার ছেলে’মেয়ে মানুষ আর তাদের লেখাপড়া সামলে নিজের পড়া চালিয়ে গেছে কোনও কিছুকে তোয়াক্কা না করেই-
তাই আজ অনেক গুলো বছর পার করে এসে এই কথাগুলো শুনে হাসেন কমলিনি, আর ভাবেন- সত্যি’কী তার জীবনে “বোধ” নামক শব্দটি ছিল কোনদিন!! শুধু নিজের জন্য?
সেই কোন ছেলেবেলায় বউ হয়ে এসেছিল কমলিনি এই বাড়িতে, সকলকেই নিজের ভেবে ভালবেসেছিল-
কিন্তু এরা কখনও নিজের ভাবতে পারেনি কমলিনিকে, তাই নিজেদের উঁচু দেখাতে কমলিনিকে প্রতিনিয়ত নিচু করতে কখনও বাঁধেনি ওদের-
আসলে এই বাড়িটা’যে কবে থেকে নিজের বাড়ি হয়ে গেছে নিজেই বুঝতে পারেনি কমলিনি-
মনে পরতে থাকে, খুব ছোট্ট বেলায় যখন মা বকতেন- বাবা ছুট্টে এসে জড়িয়ে ধরে বলতেন- অনুপমা ওকে বোকো’না ও’যে পরের ঘরের, ওকে ওর মত চলতে দাও বাঁধা দিও’না ওর সব কাজে-
কোন বাড়িতে যাবে তার’কি ঠিক আছে।
মা রাগ করতেন বলতেন- মেয়েদের অনেক সমঝে চলতে হয়, না’হলেই কষ্ট পেতে হবে- আমি কী ওর শত্রু যে ওর খারাপ চাইবো!!
আরও মাথায় তোলো বুঝবে একদিন-
মা’এর কথা শুনে হা হা করে হেসে উঠতেন বাবা, আর মা অভিমানে দুমদাম করে রাগ দেখিয়ে রান্না ঘরে ঢুকতেন-
কেমন করে যে বাবা চলে গেলেন হঠাৎ একদিন না ফেরার দেশে আজও মনে করলে কষ্ট হয় কমলিনির-
আজও এই কষ্টটা কারো সাথে ভাগ করেনি সে- করতে পারেনি ভাগ, কারন কিছু কষ্ট শুধু নিজেরই থাকুক আপন হয়ে ভাবে কমলিনি-
শাশুড়ি সোমদত্তা দেবীই পছন্দ করে এনেছিলেন ছেলের বৌ করে কমলিনিকে,
সেটাও অদ্ভুত এক ব্যাপার!! এখনও ভাবলে হাসি পায় সেদিনের কথা মনে পরলে!!
দূর্গা পূজার ঠাকুর দেখতে গিয়ে আর খুঁজে পাচ্ছিলেন না কাউকে সোমদত্তা, আসলে বড়ো বড়ো প্যাণ্ডেলে মহিলা আর পুরুষ দের আলাদা লাইন হয়’তো সেই কারনেই বাড়ির লোকের থেকে আলাদা হয়ে গেছেন-
ঐ রকমই একটা প্যান্ডেল থেকে বেরিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে অসহায়ের মতো তাকাচ্ছিলেন এদিক ওদিক সোমদত্তা-
ঐখানেই বন্ধুদের সাথে বসে ছিল কমলিনি, গল্পে ব্যস্ত কমলিনি হঠাৎ একজনের হাতের ছোঁয়ায় ফিরে তাকালো-
অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল কমলিনি মিষ্টি হেসে, কিছু বলবেন আমাকে?
আমি কাউকেই খুঁজে পাচ্ছি না বললেন ভদ্রমহিলা-
একটু দাঁড়ান আপনি আমি আসছি’ বলে
বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে উঠে দাঁড়িয়ে ভদ্রমহিলাকে বলল চলুন এবার-
কমলিনি ভদ্রমহিলাকে নিয়ে অনেকটা ঘুরে একটা জায়গায় চলে এল, আসার পথেই ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করছিলেন টুকটাক নানা প্রসঙ্গে-
কমলিনি হেসে হেসে উওরও দিচ্ছিল সব প্রশ্নের কারন ভদ্রমহিলার মধ্যে একটা মাতৃসুলভ ব্যাপার ছিল, আর সেটা অনুভব করতে পারছিল কমলিনি
তার মাঝেই হঠাৎ ভদ্রমহিলা একজনকে ডেকে উঠলেন নাম ধরে সুমুউউ, তার হাতেই ভদ্রমহিলাকে সঁপে দিয়ে একটা একটু হাসলো কমলিনি-
কমলিনির কাজ শেষ- একটু হেসে ফেরার জন্য ঘুরতেই, ভদ্রমহিলা বললেন তোমাদের বাড়ি আসলে চিনতে পারবে’তো মা? আর তোমার মুখের হাসিটি এমনিই রেখ দিও সবসময় কেমন বলে কপালে একটা চুমু খেলেন মহিলা।
আসুন না আমাদের বাড়ি একদিন ঠিক চিনতে পারবো আপনাকে, ঐ প্যান্ডেলের সামনে এসে যাকে বলবেন আশিস মিত্রের বাড়ি যাবো সেই দেখিয়ে দেবে-
এই কথা বলে কমলিনি ফিরে গেল বন্ধুদের কাছে ভদ্রমহিলাকে বিদায় জানিয়ে।
কমলিনি বরাবর একটু স্বাধীনচেতা নিজের মন মত চলতেই পছন্দ করে, কিন্তু শ্বশুর বাড়ি এসে নিজের সত্তাকে বিসর্জন দিয়ে এদের ছাঁচে ঢেলে ফেলল নিজেকে, কারন সে মাকে কথা দিয়েছিল কখনও তার জন্য কথা শুনতে হবে না-
যে কারনে এ’বাড়িতে এসে কারো কালো মুখ দেখতে হয়নি কমলিনিকে এক মাত্র সুনির্মল বাসু ছাড়া।
হঠাৎ মেয়ে পল্লবীর ডাকে সম্বিত ফিরলে মেয়ের দিকে ভালো করে তাকাল আর ভাবলো সত্যিই কী তার কোন বোধ নেই?
কী এত চিন্তা কোরছ মা? কেন বাবার কথায় মন খারাপ কোরছ? তুমি’তো জান বাবা এমনিই আমিতো ছোট্ট থেকেই দেখছি তোমাকে এই কথাটা বলে আনন্দ পান বাবা, আমরা সাবাই জানি তুমি আমাদের কতখানি জুড়ে আছো মা।
লক্ষী’মা আর অভিমান করে মন খারাপ কোর’না, তিনি নিজেও জানেন তুমি ছাড়া এই সংসার অচল হয়ে পড়বে-
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ পল্লবীর দিকে অবাক হয়ে কমলিনি-
আর মনে মনে ভাবলো বড় হয়ে গেছে তার মেয়ে, পড়তে শিখে গেছে মনের ভাষা-
এক ছুটে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন কমলিনি আর ভাবলেন জিতে গেছি-
আমি জিতে গেছি আমি- সুনির্মল বাসু তুমি হেরে গেছ আমার কাছে, আমার “বোধ” হারিয়ে যায়নি-
আমি এখনও বেঁচে আছি, আমি কমলিনি বাসু – আমি নতুন করে বাঁচব- আমার নতুন আইডেন্টিটি তৈরি করে তোমাকে সাথে নিয়েই-
সমাপ্ত——————
কপিরাইট @1443 সুজাতা

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY