সাহিত্যের অন্যতম সারথি সৈয়দা কামরুন্নাহার শিল্পী এর ধারাবাহিক রোমান্টিক গল্প “অশ্রুমতি ”এর দ্বিতীয় পর্ব ।

57
সৈয়দা কামরুন্নাহার শিল্পী এর ধারাবাহিক রোমান্টিক গল্প “অশ্রুমতি ”এর দ্বিতীয় পর্ব ।

অশ্রুমতি

( দ্বিতীয় পর্ব )

সৈয়দা কামরুন্নাহার শিল্পী

নভেম্বর মাস বেশ শীত পড়ে গেছে। ভোরের কুয়াশা জিন বুঝিয়ে দেয় শীতের সকাল। বনলতার ভাপা পিঠে ভীষণ পছন্দ, তাই মা আজ পাটালি নারিকেল মিশিয়ে ভাপা পিঠা বানানোতে ব্যস্ত সকালে।
আবির এসেছে সাপ্তাহিক ছুটিতে, বনলতার বায়না ব্যাডমিন্টন খেলবে বিকেলে।
দেখতে দেখতে বিকেল ঘনিয়ে এল। ব্যাডমিন্টন খেলতে খেলতে হঠাৎ ফেদার গিয়ে আবিরের চোখে পড়ে চশমার একটিয় কাঁচ ভেঙে যায়।
বনলতা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল দুঃখ ও পেল। সে কিছুতেই বুঝতে চাচ্ছিল না খেলতে গিয়ে এ ধরনের এক্সিডেন্ট হতে পারে।
না বুঝে সে ঝড় ঝড় করে চোখের পানি ফেলতে লাগলো, আবির তাকে অনেক বুঝালো তবুও বুঝতে চাইল না।
শেষে কেঁদে কেঁদে বলল তুমি তো চশমা ছাড়া ঠিকভাবে দেখতে পাও না, আমার আজকের  জ্যামিতি টা কে বুঝিয়ে দেবে, আগামীকাল তো ক্লাসে আমায় শাস্তি পেতে হবে।

আবির বলে এই তো এতক্ষণে বুঝলাম আমার চশমাটা ভাঙ্গায় তোমার তেমন কোনো খারাপ লাগেনি তোমার ভয় পেয়েছে যে জ্যামিতি টা না শিখে  বিদ্যালয়ে গেলে তোমার হাতে সপাং সপাং করে পড়বে তাইতো!
বেশ তাই হোক, ভালোই হয়েছে আমার চশমা ভেঙে ।আমি চশমা এত সহজে ঠিক করব না, কয়েকদিন একটু শাস্তি পাও কেমন লাগে একটু দেখি না!

বনলতা বলে তাইতো বলবে, এটাই তো তুমি চাও ।আমাকে যদি একটুও ভালবাসতে তবে একথা তুমি কখনো বলতে না। তুমি তো ভালোবাসো বিপাশাকে। আর আমাকে চাও শুধু বকা খাওয়াতে।
একথায় আবির হতভম্ব হয়ে যায়। বুঝতেই পারলো না এমনিভাবে এত সহজে বনলতা গর গর করে বলবে ।তবে কি সত্যিই বনলতা আমায় নিয়ে অন্য কিছু ভাবছে ,এই ছোট্ট মেয়েটি !
ধুত্তরি ছাই, এত ভাবতে ভালো লাগেনা।
বিপাশা কেন বনলতার মনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলো! আমার কোন আচরণ কি–
আবির ভাবতে ভাবতে সে দিনের মতো খেলা বন্ধ করে ঘরে ফিরল।

বনলতা বাসায় এসেই ওর মাকে জানাল, মা আবির ভাইয়ের চশমাটা আবার সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলতে গিয়ে ভেঙে গেছে একটি গ্লাস।
বনলতার মা তো শুনে একেবারে আঁতকে উঠলেন। বললেন, সে কথা তুই এত স্বাভাবিক ভাবে বলছিস ?তুই জানিস না ,চশমা ছাড়া আবির একটুও পড়তে পারে না!
বনলতা বলে, জানি তো কি করব মা! তুমি কাল শহরে আবির ভাইয়াকে পাঠিয়ে চশমাটা ঠিক করে আনিয়ে দাও না লক্ষী মা আমার। মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো।

আবির বনলতার মামাতো ভাই। পড়াশুনায় খুব ভালো রংপুর মেডিকেলে শেষ বর্ষের ছাত্র। মাঝে মাঝে ছুটি পেলেই সে বনলতাদের বাসায় বেড়াতে আসে। বনলতা দের বাসা রংপুর কুড়িগ্রামে, একটু ভিতরে যেতে হয় ।
আবিরের বাসা বগুড়া ।রংপুর শহরের চেয়ে মোটামুটি জাকজমকপূর্ণ। বগুড়াকে সাধারণত উত্তরবঙ্গের ঢাকা শহর বলা হয়। সবধরনের সবকিছুই পাওয়া যায় ।
রংপুর মেডিকেলে চান্স পাওয়ায় রংপুরেই পড়াশোনা করছে আবির। আর মাঝেমধ্যে ছুটি পেলে দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলো বেড়াতে তার ভীষণ ভালো লাগে।
তবে আবিরের সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে তার বর ফুপিকে অর্থাৎ বনলতার মাকে।
বনলতা আর বিপাশা জমজ বোন ওদের কোন ভাই নেই, তাই আবিরকে পেলে ওরা যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। বনলতা ছোট তবে ভীষণ চঞ্চল, সারাক্ষণ শুধু কথা আর কথা, প্রশ্ন আর প্রশ্ন ।তার যেন জানার কোন শেষ নেই। উত্তর তার চাইই চাই ।কখনো বাবাকে বিরক্ত করে কখনো মাকে। বিপাশার সঙ্গে তার সকল সময় খুনসুটি লেগেই থাকে।

বিপাশা বেশ শান্ত স্বভাবের হাসিখুশি শান্ত গলায় কথা বলে। নীরব থাকতেই পছন্দ করে, সারাক্ষণ বইয়ে মুখ বুজে থাকে। তা না হলে কম্পিউটারে গেমস নিয়ে ব্যস্ত।
কখনো গান শোনা, তবে মেহমান আসলে বিপাসা মাকে সাহায্য করে, বিশেষ করে নাস্তা তৈরিতে ।
আর বনলতা, আইসক্রিম ফুচকা খুব বেশি পছন্দ ।মেহমান এলে তাদের সঙ্গে গল্পে মেতে থাকে। বিশেষ করে গ্রামে কোথায় কবে মেলা হয়েছে, কে ভাল বাশি বাজায় কোথায় লাঠি খেলা অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প শোনানো নিয়ে সে ব্যস্ত। সেইসঙ্গে গল্প শুনতেও।

বাবা-মা দুজনেই শান্ত স্বভাবের তবে বনলতাকে নিয়ে তাদের চিন্তার শেষ নেই ।যতো বড় হচ্ছে ততো চঞ্চল ও অস্হির প্রকৃতির। তবে পড়াশোনায় ক্লাসে একেবারে প্রথম স্থান বরাবরই হয়ে আসছে ।
বাবা-মার কাছে বিপাশা ও বনলতা দু’জনেই সমান আদরের। বাবা ফখরুল ইসলাম মাঝেমধ্যেই বলেন ,আমার বনলতা ঠিক যেন নাটোরের বনলতা সেন !আর বিপাশা ও আমার মতো। আমি সুচিত্রা সেনকে পছন্দ করি ,আমার মেয়েও সুচিত্রার যেন মুখটাই ধারণ করে বসে আছে ।
মা স্বর্ণলতা দুই মেয়েকে একই রকম পোশাক পরান একই ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে বিদ্যালয়ে পাঠান ,গান শেখান।

স্বর্ণলতা মনে করেন, পড়াশোনায় শুধু ভালো হলে চলবে না পড়াশোনার সঙ্গে নাচ গান কবিতা আবৃতি খেলাধুলা সবকিছুর মধ্যেই থাকতে হবে !তাই বলে প্রথম থাকতে হবে ধর্ম শিক্ষা।
তবে মাঝেমধ্যে স্বর্ণলতা বনলতাকে নিয়ে চিন্তিত থাকেন। এই দুষ্টু মেয়েটাকে ঠিক ভাবে মানুষ করতে পারলে তো !তাই অধিকাংশ সময় চোখে চোখে রাখেন ,বুঝতে দেন না বন্ধুর মতো মিশে থেকে সকল কথা সকল আবদার হাসি মুখ নিয়ে ভালো-মন্দ বুঝিয়ে দেন অনেক কথার মাঝে ।
তবে আজকের আবিরের চশমা ভাঙ্গার পরে নতুন চশমা তৈরি করার ব্যাপারে আবদারটা যেন একটু অন্য সুরের মনে হলো। তথাপিও স্বর্ণলতা প্রকাশ করলেন না কিছুই বরং আবিরের চশমা তৈরি করতে শহরে লোক পাঠাতে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন ।
আবির বলল, ফুফু আম্মা চিন্তা করবেন না আমার আরো একটি চশমা আছে । দু’দিন পরে বানালেও চলবে ।
সেকথায় কিছুটা হলেও চিন্তা মুক্ত হলেন তিনি।
কিন্তু বনলতাকে বুঝাতে আবীরের বেশ সময় লাগল ।সে মানতে চাইল না, বললো কৌতুহল নিয়ে ;দেখাও তোমার অন্য চশমাটি
কোথায় !
আবির বলে ,বোকা মেয়ে এই দেখো বলে ,একটি অক্সি কালারের ফ্রেমের চশমা ব্যাগ হতে বের করে বনলতাকে দেখাল।
বনলতা নির্দ্ধিধায় বলে,
এখনই পড়ো আমি দেখব তোমাকে এই চশমাতে কেমন লাগে!
সবার সামনে এইভাবে বনলতা বলায় আবির একটু লজ্জিত হলো, তথাপিও সবকিছু স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিয়ে চশমা পরলো।
তারপর শোয়ার ঘরে চলে গেল। সেই রাত্রে আর আবির পড়াশোনা করল না ।
শুধুমাত্র বনলতা কে জ্যামিতিটা বুঝিয়ে দিয়ে বলল ,আজ তোমার ছুটি ।
বনলতা বলে, কেন?

আবির বলে ,আজ আমার শরীরটা ভালো লাগছে না ।কেন ভালো লাগছে না ?জ্বর আসলো না তো! বনলতা একটু অস্থির হয়ে ওঠে ,তার দু’চোখে যেন এক অন্যরকম মায়া ।আবির বলে না তেমন কিছুই হয়নি।
বনলতা সে কথায় আবিরকে বলে, তবে রাতে খেয়ে শুয়ে পড়ো।
আবির বলে পাকা গিন্নির মতো তো কথা বলতে পারো, শুধু কাজের বেলায় ফাঁকি!
বনলতা বলে, কে বলেছে আমায়
কাজের বেলায় ফাঁকি! একটি হুকুম করে দেখনা ,করতে পারি কিনা!
কার কথা শুনিনা! দাঁড়াও বাবাকে ডাকছি–
আবির তাড়াতাড়ি ওর মুখ চেপে ওকে থামিয়ে দেয়।

কে শোনে কার কথা, বনলতা বলতে থাকে হুঁ বাবা র সব কাজ কে করে দেয়! বিপাশা–??
আমি তো করি!
বিপাশা মায়ের কাজে সাহায্য করে আমি বাবার। আমি তো তোমার ও সব কাজ করতে চাই, তুমি দাও না তো করতে!
তুমি কেন আমার সব কাজ করে দিতে চাও?
বারে! বাসায় তুমি ছাড়া আর কার কাজ করব !আমাকে কেউ তো কোনো কাজের কথাই বলে না !

আবির বলে,কেন বলে না !
তা তো জানি না ,তবে এটুকু জানি মা বলে তোমাকে কোন কাজ করতে হবে না , তুমি পড়তে যাও।
আবির বলে ,ঠিকই বলেন ফুফু আম্মা, যাও তুমি পড়তে যাও ;তবেই আমি খুশি …

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY