কলমযোদ্ধা নাসরিন আক্তার এর একটু ব্যতিক্রমধর্মী লিখা গল্প “অচেনা সময়ের স্বপ্ন বুনে চলে ”

225
কলমযোদ্ধা নাসরিন আক্তার এর একটু ব্যতিক্রমধর্মী লিখা গল্প “অচেনা সময়ের স্বপ্ন বুনে চলে ”

অচেনা সময়ের স্বপ্ন বুনে চলে…

                            —–নাসরিন আক্তার ।

আজকের গল্প একালের রূপকথা । এক শহরে বাস করতো এক টোনা আর এক টুনি।
ওরা জিম ও ডেলার গল্পে সিদ্ধ ছিলো, একদিন সেই টোনাটুনির ইচ্ছে হলো রিক্সা করে ঘুরবে, তাই তারা রিক্সায় উঠে বসলো, তারপর শুরু হলো টুকুর টুকুর গল্প।
টোনা মিস্টি করে হাসে আর বলে- হ্যারে, আমাকে দেখলেই তোর এত গল্প কোথা থেকে আসে রে!
টুনিও হাসে! চোখ দুটো সুদূরে মেলে ধরে। যেনো কতদূর থেকে ভেসে আসে ওর কণ্ঠস্বর।
-বলতো, আমি তোর কে!?
-তুই আমার, লাল টুকটুকে ঠোঁট ওয়ালা ছোট্ট টুনটুনি।
আর আমি হোলা–আ—ম—
তখনি মেয়েটি টুক করে মুখ থেকে কথা কেড়ে নেয়।
-তুই আমার দক্ষিনের জানালা। রাত জাগা আকাশ। আমার আয়না। তুই আমার আমি।
ছেলেটি হো হো করে হেসে উঠে, রিক্সা চালাতে চালাতে চালকও পিছন ফিরে ফিক করে হাসে। আবার শুরু হয় টুকুর টুকুর গল্প।
-ওদের গল্প নির্দৃষ্ট কোনো সীমানায় থাকে না। ছেলেটি প্রায় সময়ই চুপ করে শোনে, শুধু শোনে বললে ভুল হবে, যেনো আত্মস্ত করে। একজোড়া গোলাপি ঠোটের কাঁপন, চোখের নাচন, দেখে দেখে প্রেমিক হয়ে উঠে। ঠোঁট জিভ শুকিয়ে আসে ,খুব ইচ্ছে করে কমলার কোষের মত ঠোঁট দুটি একটিবার নিজের শুস্ক ঠোঁটের ফাঁকে ঢুকিয়ে জিভ ভিজিযে নেয়। আবার কথা বলতে বলতে যখন অভিমানী বালিকার মত নাক ফুলিয়ে ,ঠোঁট বাঁকিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠে ছোট বালিকার মত তখন সে দায়িত্বশীল অভিবাবক। গল্প এগিয়ে চলে সময়ের আলপথে, দাঁড়ি-কমা, হাইফেন, সেমিকোলনের তোয়াক্কা না করেই।

হঠাৎ মেয়েটি বলে উঠে
– এই আমি ভুট্টা খাবো
– ভুট্টা!ভুট্টা কই পা্ইলি ?
-ডানে বামে তাকালেই দেখতে পাবি
– মামা দাঁড়ান, বলেই ছেলেটি লাফ দিয়ে নেমে যায় রিক্সা থেকে । একটুপরেই একটা পোড়া ভুট্টা নিয়ে হাজির হয় ।
– ধন্যবাদ ,এই না হলে আমার আয়না ! আমার জান্টু !!
ছেলেটি কিছুটা বিরক্তে নিয়েই তাকিয়ে থাকে মেয়েটার দিকে।যেভাবে একজন বাবা তার সন্তানের অপ্রিতিকর আব্দারে বিরক্ত হয়।
মেয়েটি খুব আগ্রহ নিয়ে ভুট্টারস্টিকে কামর দেয় ,পর পর দু’তিনবার কামর দিয়ে বলে উঠে
–খেতে ইচ্ছে করছে না ,একটুও ভালো লাগছে না রে ।
-জানতাম খেতে পারবি না । ভুট্টাটা ভোলো ছিলো না
—তাহলে আনলি কেনো ?
-না আনলে তো তুই গাল ফুলাতি টুক টুক করে কথা শুনাতি !
-আর এই পচা ভুট্টা খেয়ে আমি যদি অসুস্থ হয়ে পরতাম! তো খুব মজা হতো তাই না!?ও অঅমার কথা শোনানোটাই তোর কাছে বড় হলো ! আর আমার অসুস্থতা কিছু না ,তাই না!!
বলেই মুড অফ করে বসে থাকে মেয়েটি ।
যে মেয়ে কথা ছাড়া এক মূহুর্ত থকতে পারে না ,তার গুম হয়ে বসে থাকা অসয্য লাগে ছেলেটির কাছে । ও জানে এখন কিছুতেই কথা বলানো যাবে না ।বেশি কিছু বলতে গেলেই চোখ ভিজে উঠবে বাচ্চাদের মত। ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেও চুপ করে বসে থাকে । হ্ঠাৎ
– মামা রিক্সাটা একটু থামান ,
বলেই রিক্সা থেকে নেমে যায় ছেলেটি ।একটু পর দুটো কোনআইসক্রিম এনে মেযেটির সামনে ধরে ।ফিক করে হেসে আইসক্রিমটা হাতে নেয় মেয়েটি ।
ছেলেটি জানে কি করে মনের মেঘ তাড়নো যায় । কখনোই মেযেটির কাছে মেঘবালকের আনাগোনা সয্য করতে পারে না সে ।এক মূহুর্তেই সকল মেঘ সরে পরন্ত বিকেলেও মেযেটির মুখে আলো ঝলমল করতে থাকে । শুরুহয় আবার টুকুর টুকুর গল্প

-দেখলি কত তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা হয়ে গেলো, এত দেরি করলি কেনো?
-সরি, দেরি হয়ে গেলো।
-জানি তো! তোর তো আবার আঠারো মাসে বছর।
-তুই না আসলেই একটা পাগলী ! দেরি হতেই পারে।
-হুম, দেরিতো হতেই পারে এখন যদি একটু বলি?
-কি !কি বলবি তুই শুনি ?
— তুই যদি মেয়ে হতি তাহলে সন্তান গর্ভে ধারণ করতি দশ মাসের পরিবর্তে ষোল মাস, বুঝলি!?

ছেলেটি সকৌতুকে বলেউঠে —
-ওমা তাই নাকি ! সেটা কিভাবে বুঝিয়ে বল?

-নেচারালি, দশ মাস পার হওয়ার পর, ভাবতি হয়তো হাত পা পুরোপুরি গঠন হয়নি আরও দুমাস থাক, দু’মাস পর ভাবতি হয়তো নাক চোখ পুরোপুরি গঠন হয়নি আরও দু’মাস থাক, পরবর্তি দু’মাস পার হয়ে যেতো ঠিক কখন কবে কি ভাবে প্রসব করবি সেটা ঠিক করতে করতেই। এবার ছেলেটি অপ্রত্যাশিত কাজটি করে বসে।
টুপ করে চুমু দিয়ে বসে ঘাড়ের একপাশে। মেয়েটি কপট অভিমানী দৃষ্টিতে প্রশ্রয়ের হাসি হাসে।
-এটা কি হলো?
-এই জন্যই বলি তুই আমার টুনটুনি। সারাক্ষন ননস্টপ টুনটুন করেই যাস্। অপার্থিব অপ্রয়োজনীয় কথাগুলো খুব উপভোগ করিরে!!
-তো! তোর ধারণা আশেপাশের সব জটিলতা নিয়ে কথা বলে আমি তোর সাথে কাটানো সময়টা নষ্ট করবো?
তুই আমার খোলা আকাশ। এখানে আমি মুক্ত চড়ুই…
যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে উড়াউড়ি করবো। তোর বুকে বসে কুটকুট করে দাঁনা খাবো, বুঝলি!!
এবারো ছেলেটি হো হো করে হেসে উঠে । পিছন ফিরে তাকিয়ে রিক্সা চালক ও দাঁত বেরকেরে হাসে ,
-সবাইকে বলতে শুনি মুক্ত বলাকা হতে চায় আর শুধু তুই কি না চড়ুই হতে চাস্!
-বলাকা অনেক দূরে উড়ে যায়, আমি অনেক দূরে যেতে চাই না রে , তোর বুকে তোর কাছাকাছি থাকতে চাই, শুধু তোর সাথে খুনসুটি করে করে জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই।
ছেলেটা বাম হাতটা পিছনে নিয়ে আসে এবার ,আলতো করে মেয়েটাকে জড়িয়ে বসে।
-হ্যারে, আমি যদি কখনো না থাকি!?
মেয়েটি আর একটু ঘনিষ্ট হয়ে বসে, ছেলেটির হাতে হাত রাখে, যত্নকরে ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস লুকায়।কন্ঠস্বর খাদে নেমে আসে,
-আমি অনেকের মত বলবো না, তুই না থাকলে আমি মরে যাবো। আমার দক্ষিনের ও জানালা থাকবে সে জানালায় বাতাসও বইবে, তবে সে বাতাস আমাকে শীতল করবে না। আমার আকাশ থাকবে, সে আকাশে চাঁদ থাকবে, থাকবে না শুধু জোছনা। আমার আয়না থাকবে না তো, তাই আমার আমিটাই মরে যাবে রে।
আমি বেঁচে থাকবো -এই আমির কোনো ছায়া থাকবে না।
ছেলেটির হাতে আলতো চাপদিয়ে মেয়েটি গুন গুন করে কবিতা রচে —
ইচ্ছে করে-
বুকে জমানো জন্জাল ঝেড়েমুছে শুধু তোর জন্যই গড়ি পাতার তাজমহল,
ইচ্ছে করে-
তুই স্রোতস্বতী ঝর্ণা হয়ে ভেঙে ফেল সকল আগল,
ইচ্ছে করে –
তোর হাতে হাত রেখে পথ হাঁটি শতসহস্র বছর।
কথা বলতে বলতে ওরা আরো একটু ঘনিষ্ট হয়ে বসে, মেয়েটি পরম নির্ভরতায় ছেলেটির ঘাড়ে মাথা রাখে। ঘড়ির কাটার সাথে সাথে রিক্সার চাকা ঘুরে,ঘূর্ণায়মান চাকার প্রবাহে থাকে পরম নির্ভরতা। এক সন্ধ্যায় মন খরকুটো ছাড়াই অচেনা সময়ের স্বপ্ন বুনে চলে

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY