ভারত থেকে সভ্যতার অন্যতম লেখক-অজন্তা প্রবাহিতা এর ভিন্নধর্মী ছোট গল্প “বিবাহ বার্ষিকী ”

7
ভারত থেকে সভ্যতার অন্যতম লেখক- অজন্তাপ্রবাহিতা এর ভিন্নধর্মী ছোট গল্প“বিবাহ বার্ষিকী ”

বিবাহ বার্ষিকী
অজন্তাপ্রবাহিতা

তারিখটা ছিল দুহাজার কুড়ি সালের উনিশে জুন। তমশ্রীর বিবাহ বার্ষিকী। কিন্তু, গতকাল রাত থেকেই কেমন শরীর খারাপ করছিলো তমশ্রীর । মাত্র আট মাস হয়েছে হিস্টেরেক্টমি অপারেশন হয়েছে।হঠাৎ করেই আবার ব্লিডিং শুরু হওয়াতে শরীরটা কেমন দুর্বল লাগছিলো । ডক্টর শান্তলাকে একবার কল করতেই বললেন দেরি না করে একটা ইন্টারনাল আল্ট্রাসাউন্ড করিয়ে নেওয়া দরকার। কোনোরকম রিস্ক না নেওয়াই ভালো। রাতে পুলককে কথাটা বলার পরেও খুব বেশি পাত্তা দিলো না।
সকালে ছেলে দীপুকে বলতেই লাফিয়ে উঠে বলে,মা ! আমি তোমায় হাসপাতালে নিয়ে যাবো।
সকাল ন’টা বাজতে না বাজতেই ওরা হাসপাতালে পৌঁছে গেছিলো। সব টেস্ট করিয়ে রিপোর্ট নিয়ে চেকআপ করাতে গিয়ে পুরো দিনটাই হাসপাতালে কেটে গেলো।
সামান্য শুকনো খাবার সাথে নিয়ে গেছিলো। দীপু চকোলেট আর জল খাচ্ছিলো।ছেলের কান্ড দেখে তমশ্রী মনে মনে হাসছিলো, স্কুল পাশ করে গেলো কিন্তু এখনো চকোলেটের নেশা কাটে নি।
ডক্টর সব রিপোর্ট দেখে বললেন, স্ট্রেস নিও না। আর ভারী কাজ বেশি করো না। ল্যাপ্রোস্কোপিতে চামড়ার ওপরে মাত্র চারটে সেলাই থাকলেও ভেতরে কিন্তু অগুনতি সেলাই করা হয় । সেগুলো শুকোতে সময় লাগে। শরীরের হরমোনও গুলিয়ে যায়, তাই মন ভালো রাখা খুব প্রয়োজন। মনের ওপর চাপ পড়লেই মাসলে স্ট্রেন পড়বে। ব্যাথা,বেদনা, ইন্টারনাল ব্লিডিং হবে। ‘সো বি কেয়ারফুল’বলে কিছু ওষুধ লিখে দিলেন ।
হাসপাতালের ফার্মেসী থেকেই ওষুধ কিনে বাড়ি ফেরার পথে একটা ছোট্ট কেক আর কিছু মিষ্টি প্যাক করিয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা হলো। কমপ্লেক্সের গেটে যখন পৌছালো তখন ঘড়ির কাঁটা চারটে থেকে নেবে সাড়ে চারটে ছুঁই ছুঁই করছে।
ওদের গাড়ি কমপ্লেক্সের এন্ট্রি গেটে ঢুকতে যাবে,সিকিউরিটি গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললো, পার্সেল আছে,সই করে নিয়ে যান।
তমশ্রী গাড়ি থেকে নেবে সিকিউরিটি অফিসের দিকে পা বাড়ালো, দীপু পার্কিঙের দিকে এগিয়ে গেলো।
ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা সুন্দর লাল Brio বেরিয়ে যেতে দেখে তমশ্রী তাকালো । নতুন গাড়ি। কমপ্লেক্সে এই গাড়ি দ্যাখেনি তো আগে। ড্রাইভার এর সিটে ছিলেন এক সুন্দরী মহিলা চোখে বড় সানগ্লাস থাকার দরুণ চেহারাটা ভালো বোঝা গেলো না।
ওর চোখের কৌতূহল সিকিউরিটি গার্ডের চোখে ধরা পরে। গত পনেরো বছর ধরে মিহির এই কমপ্লেক্সের সিকিউরিটি ।সব ফ্ল্যাট মেম্বারদের বেশ ভরসার লোক ,সবার মনের কথা বুঝতে পারে অনায়াসে।
পার্সেলের প্যাকেটটা তমশ্রীর হাতে ধরাতে ধরাতে বললো, “ম্যাডাম ! ইনি তো আপনাদের গেস্ট। সকালে এসেছিলেন, রেজিস্টারে নাম আছে।”

কি যেন মনে হওয়াতে তমশ্রী একবার ভিজিটর্স এন্ট্রি রেজিস্টারখানা চেক করলো। নাম – অর্পিতা দত্তগুপ্ত। পারপাস – অফিসিয়াল।
কি যেন মনে হওয়াতে তমশ্রী একবার ভিজিটর্স এন্ট্রি রেজিস্টারখানা চেক করলো। নাম – অর্পিতা দত্তগুপ্ত। পারপাস – অফিসিয়াল।
ফোন নম্বরটা -নাইন এইট জিরো জিরো ফোর সেভেন টু থ্রী ফোর ফোর।নম্বরটা নিজের ফোন থেকে ডায়াল করতেই বলে উঠলো, দা নম্বর ইউ হ্যাভ ডায়েলড ইজ ইনকরেক্ট। প্লিজ চেক দা নম্বর।
রেজিস্টারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আবার দেখলো ,”নাহ ! একদম ঠিক নম্বর তুলেছি। তাহলে ইনকরেক্ট বলছে
কেন ? কে ইনি? আমার কোনো চেনা তো নয়। দেখা করতে এসেছিল? আমার অনুপস্থিতিতেই বা কেন আসবে আর ঠিক আমার ফেরার আগেই চলে যাবে? সব যেন কেমন ধোঁয়াশা ঠেকছে । ধ্যাৎ!! কিসব উল্টাপাল্টা ভাবছি। একবার পুলককে জিজ্ঞেস করলেই তো হয়। আমারও দেরী হয়ে গেল ফিরতে। আরেকটু আগে এলে একসাথে বিবাহবার্ষিকীর বিকেলটা মজা করা যেত। এবাবা ! আজ তো ফ্রীজে তেমন কিছুই রেখে যাই নি। পুলকের জন্য দু পিস্ মাছের ঝোল আর রাইস কুকারে ভাত বসিয়ে গেছিলাম।” নানান কথা ভাবতে ভাবতে লিফটে ঢুকে টপফ্লোর ন’তলার বোতাম টিপলো। এই টপফ্লোরে থাকাটা এক্কেবারেই পুলকের ইচ্ছে। ওর বরাবরের ইচ্ছে আকাশে ওড়ার।
একটা ফ্লোরে দুটো ফ্ল্যাট। সামনের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা মুম্বাই নিবাসী। তাই ওই ফ্ল্যাটের দরজা সর্বদাই বন্ধ থাকে। পুরো ফ্লোরে ওরাই সর্বেসর্বা। নির্দিষ্ট ফ্লোরে এসে লিফটের দরজা খুলে গেলো। ঘরের দরজা খোলাই ছিল। ঘরে ঢুকতেই ডাইনিং টেবিলে বড় গোলাপের তোড়া চোখে পড়লো। লাল টকটকে গোলাপের বাহার দেখে মনটা ভালো হয় গেলো। পুলক সারপ্রাইজ দিতে ভোলে নি। তাড়াতাড়ি বাথরুমে গিয়ে গা ধুয়ে ভালো একটা লাল রঙের নাইটি পড়লো। গলার কাছে সুন্দর এম্ব্রডাইরি করা। আজকের দিনটার জন্যই বিশেষ করে রাখা ছিল। সেই কবেই অনলাইন অর্ডার করে আনিয়েছিলো।
দীপু বাবামায়ের জন্য কেক, ক্যান্ডল, মিষ্টি সব সাজিয়ে রাখলো টেবিলে।
ইয়ার্কি মেরে মা-কে জিজ্ঞেস করলো,’ওগো নতুন বৌ! তোমার বর কই ?’
“খুব ফাজলামো শিখেছো তাই না ! দাঁড়াও ! বাবাকে বলছি।”
আজ খুব পরিপাটি করে একটা হাতখোঁপা করে নিয়ে একটু হালকা ফাউন্ডেশন লাগিয়ে, ছোট্ট লাল টিপ্ আর সিঁদুরে নিজেকে যত্ন করে সাজিয়ে নিয়েছে তমশ্রী।
লিপস্টিক একদম পছন্দ নয় পুলকের তাই ও সর্বদাই কালার্ড ভ্যাসেলিন ঠোঁটে লাগায়।
অনেক আনন্দ নিয়ে পুলকের ঘরের দিকে পা বাড়াতেই মনে হলো আচ্ছা, ফুলের তোড়ার নজর পড়তেই মনে হলো, দেখি তো কোনো কার্ড আছে কি না ?
টেবিলে রাখা বোকে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কিছুই চোখে পড়লো না। আবার ভালো করে দেখতে গিয়ে চোখে পড়লো ফুলের মাঝে গোঁজা একটি ছোট্ট গোলাপি চিরকুট। চিরকুটটা খুলে কেমন যেন চোখের সামনে আবছা হয়ে গেলো।
‘শুধু তোমার জন্য’

  • অর্পিতা
    অজানা ভয়ে বুক কেঁপে উঠলো । দৌড়ে রান্না ঘরে গিয়ে দেখলো মাছেরঝোল, ভাত যেমন রেখে গিয়েছিলো তেমনি রাখা আছে। ফ্রীজ খুলে দেখলো বেঁচে যাওয়া বিরিয়ানি ও চিকেন কষা দুটো ‘ইউজ এন্ড থ্রো’ বাক্সে রাখা।ডাস্টবিনে গিয়ে দেখলো, চিকেনের হাড়। বুঝতে সময় লাগলো না।
    কেমন যেন একটা গা গুলোতে লাগলো । ধীর পায়ে পুলকের ঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে দরজাতে হাত রাখতেই দরজাটা একটু ফাঁক হয়ে গেলো। পুলক বিছানার ওপর বসে আছে পা লম্বা করে। কানে ফোন। পরনে গ্রে কালারের শর্টস। আর গেঞ্জি। বিছানাটা কেমন অদ্ভুত ভাবে এলোমেলো হয়ে আছে। অথচ সকালে হাসপাতাল যাবার আগে ও নিজে হাতে পুলকের বিছানার চাদর চেঞ্জ করে টানটান করে গেছে। অগোছালো বিছানা পুলকের একদম পছন্দ নয়।
    চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে আসছে, মাথা ভোঁভোঁ করছে । কেমন যেন অসার হয়ে আসছিলো শরীরটা। এমন লাগছে কেন আজ ?
    মনে হলো,বহু যত্ন করে সাজানো ভালোবাসার প্রাসাদখানা গভীর জলে তলিয়ে যাচ্ছে।
    যেকাজ কখনো করে নি, আজ করল। পুলকের কথা শোনার জন্য আড়ি পাতলো দরজায়।
    ওর গলার আওয়াজে অদ্ভুত সুখের টান , প্রতিটা শব্দ মধুর।
    অথচ এই পুলকই সকালে ওর কোনো কথার জবাব দিচ্ছিলো না ঠিক করে। ফোনের ওপাশের কথা শোনা সম্ভব নয়। শুধু ওর বলাই শুনতে পাচ্ছিলো।
    মৃদু স্বরে পুলক বলছিলো ,
    -” লকডাউনে পুরো তিনমাস অপেক্ষা করেছি আজকের দিনটার জন্য। আরে না ! না ! খাবার খুব ভালো ছিল। আর তুমিও। মনের মতো। কতদিন বাদে তোমায় কাছে পেলাম। তোমার মতো মহিলা,এতো নাম ডাক যার,সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত সাইকিয়াট্রিস্ট, সুন্দরী,স্মার্ট ,ওয়েল মেনটেন্ড। সে কি না আমার যত্ন করছে, আমার জন্য খাবার বানিয়ে এনেছে। আজ আমি ভীষণ স্যাটিসফায়েড ফীল করছি জানো। লাভ ইউ এ লট। তুমি না থাকলে আমার একাকিত্ব আমায় গ্রাস করে যেত। মানসিক ভাবে আমি স্ট্রং হতাম না।
    না। না। একা থাকবো না। ….দেখছি। ….. রাতে ? তোমার নতুন ফ্ল্যাটে… ? ঠিক আছে। অ্যাড্রেস আর লোকেশন পাঠাও। আমি ঘন্টা খানেকের মধ্যেই পৌঁছাচ্ছি । আমার প্রিয় পিচ স্যাটিনের নাইট স্যুট খানা পরো। ওতে তোমায় যা দেখায় না …. কিছু মনে থাকে না…. তোমায় ডুবে থাকতে ইচ্ছে করে তখন। আমার পাঠানো কালার চেঞ্জ হওয়া ঝাড়বাতিটা ফিট করিয়েছিলে ? উফফ। নীল আলো, সেন্টেড ক্যান্ডল, ভালো স্কচ আর সাথে তুমি। আর ভাবতে পারছি না। বাকি দেখা হবার পরে।
    … রেড / হোয়াইট ? হোয়াইট ওয়াইন তো… ? অন দা ওয়ে পিক করে নেবো। আমার জন্য দেখছি, গ্লেনফিচ পাই কি না ! নইলে ‘জনি ওয়াকার বাট ব্ল্যাক লেবেল’ দিয়েই কাজ চালাতে হবে। করোনাকাল চলছে যে,আর কি করা যাবে। ওকে বেবি । সী ইউ দেয়ার।”
    দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে তমশ্রী ঘামতে শুরু করলো, হাত পা কাঁপছে, কান গরম হয়ে যাচ্ছে । রাত্রিবেলা জন্মেছিলো তাই বাবা নাম রেখেছিলেন, তমশ্রী,বিউটি অফ নাইট ,রাতের সৌন্দর্য্য। সেই সৌন্দর্য্য যেন ধুলোয় মিশে গেলো এক লহমায় । পুলকের বলা এক একটা শব্দ যেন এক একটা মিসাইলের মতো, সোজা হৃৎপিণ্ডে গিয়ে লাগছে এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যাচ্ছে । অসহ্য যন্ত্রনা, ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে বুক। চোখের জল থামছে না।

কোনো মতে নিজেকে সামলে নিয়ে দেয়াল ধরে ধরে নিঃশব্দে পা ফেলে নিজের ঘরে গিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। পুলকের কথা গুলো কানে বেজে চলেছে।
অনেকক্ষণ আগেই বাইরে অন্ধকার নেবে আসছে। ঘরের আলো জ্বালাবার একটু ইচ্ছে করলো না। কিভাবে জীবনের এই অন্ধকার কাটবে তা ও জানে না।

  • “তমশ্রী ! অফিস থেকে একটা জরুরী কল এসেছে। সেটা মিটতে দেরী হবে। অপেক্ষা করো না। আমি ওখানেই খেয়ে নেবো।
    বাইরের দরজা বন্ধ হবার আওয়াজে বোঝা গেলো পুলক বেরিয়ে গেছে ।
    দীপু নিজের রুম থেকে দৌড়ে এলো,’মা ! বাবা কোথায় গেলো ?’
    –অফিসের কাজে। রাতে ফিরবে না।
    — সেকী ? আমরা যে এতো কিছু নিয়ে এলাম, সেলেব্রেট করবো বলে।
    -ফ্রীজে রেখে দিবি সোনা ! আগামী কাল বাবা ফিরলে কেক কাটবো। বড্ডো ক্লান্ত লাগছে। আমি একটু শুই। ঘুমিয়ে পড়লে ডাকিস না।
    “ধুর ! কি যে করোনা তোমরা ভাল্লাগেনা । বেশ তুমি একটু রেস্ট নাও। “
    আজ থেকে একুশ বছর আগে ঠিক এই দিনটাতেই গাঁটছড়ায় বাঁধা পড়েছিল তমশ্রী ও পুলক। একই য়ুনিভার্সিটিতে পড়তো দুজন।
    তমশ্রী কেমেস্ট্রি নিয়ে পড়তো আর পুলক -ব্যাচেলর অফ সোশ্যাল ওয়ার্ক।
    পুলক খুব ভালো ফুটবল খেলতো। ইউনিভার্সিটি ম্যাচ ওকে ছাড়া ভাবাই যেত না।
    হালকা চাপা গায়ের রং। মায়া মাখা দুচোখ । সেদিকে তাকালে আর চোখ ফেরানো যায় না। প্রায় ছয় ফিটের কাছে হাইট। প্রশস্ত কপাল। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল। টিকোলো নাক, পুরু ঠোঁট ,দাঁতের সেটিংও খুব সুন্দর , ছিল ভুবনভোলানো হাসি আর আকর্ষণীয় কণ্ঠস্বর। ওর গলার স্বর একবার শুনলে কানে লেগে থাকতো। বলিষ্ঠ,দৃপ্ত ও গভীর। এককথায়,লেডি কিলার। পুলকও জানতো ও অন্যান্য ছেলেদের তুলনায় বেশ এট্রাক্টিভ ও স্মার্ট। প্রাচীন শাস্ত্রে উল্লেখ করা ষোলো কলার প্রায় সব কলাতেই পারদর্শী ছিল, তাই সব ব্যাপারেই ওর ডাক পড়তো। বাড়ির আর্থিক অবস্থাও অসম্ভব ভালো থাকায় সেই সময়ই ওর কাছে দামি বাইক ,কাপড়, জুতো,ঘড়ি,বিদেশী পারফিউম,আফটার সেভ লোশন,এসবের কোনো অভাব ছিল না। সিনিয়রদের ইন্টারভিউ থাকলে ওর কাছ থেকে ভালো শার্ট ধার করতো । বন্ধুদের জন্য ‘দিল দরিয়া’ পুলক সর্বদাই ছিল দলের মধ্যমনি। স্মার্টনেস আর প্রখর বুদ্ধিমত্তার দরুণ পুলক ইউনিভার্সিটি পাশ করার আগেই ক্যাম্পাস সিলেকশনে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি পেয়ে যায় ।
    কলেজে অনেক স্মার্ট আধুনিক মেয়ে থাকা সত্বেও শান্ত, সাধারণ, তমশ্রীকেই পুলকের চোখে লেগেছিলো। প্রেমের ফাঁদে জড়াবো না ভেবেও তমশ্রী কখন যে সিনিয়রের প্রেমে পড়ে গেছিলো সেকথা ও নিজেও জানে না। পড়াশুনার পাশাপাশি টানা পাঁচবছর চুটিয়ে প্রেম করার পর ওদের বিয়ে হয়। দিদিভাই-তুলি ছিল বিয়ের হর্তা কর্তা। বছর ঘুরতেই কোল আলো করে তোড়া ও দীপু এলো। যমজ বেবি।একাহাতে শ্বশুর শাশুড়ির যত্ন ও বাচ্চাদের বড় করতে গিয়ে নিজের দিকে ফিরে তাকাবার সময় পায়নি।
    এদিকে সময়ের সাথে পুলকের ক্যারিয়ার গ্রাফ ও চেহারার জেল্লা দুইই বাড়ছিল। নিজের প্রতি যত্নের কোনো খামতি ছিল না ওর। নিয়ম করে জিম ও যোগা করে টানটান চেহারা ও মেদহীন শরীরের অধিকারী ছিল।বার্থ সার্টিফিকেট চেক না করলে বেশ পঁয়ত্রিশ বলেই চালিয়ে দেয়া যেত ওকে।
    এদিকে বিনা যত্নে তমশ্রীর চেহারার লাবণ্য হ্রাস পাচ্ছিলো । অনেকদিন ধরেই পুলককে কেমন অচেনা মনে হচ্ছিলো। একদিন অফিসের কাজের অজুহাতে পুলক নিজের শোবার ঘর আলাদা করে নিলো। বাচ্চাদের নিয়ে তমশ্রী অন্য ঘরে শুতো। সময়ের সাথে শ্বশুর শাশুড়ি গত হলেন। তোড়া বাইরে পড়তে চলে গেল। ওরাও বড় ফ্ল্যাটে শিফট হয়ে গেলো। কিন্তু দুজনের ঘর এক হলো না। চিরব্যস্ত পুলকের সংসারের দিকে নজর দেবার সময় কোনোদিনই ছিল না। তমশ্রী বরাবরই ইন্ট্রোভার্ট। তাই মুখফুটে নিজের চাহিদার কথা কিছু জানাতো না ।অপেক্ষায় থাকতো, কবে পুলকের একটু সময় হবে। ধীরেধীরে দুজনের একান্ত ব্যক্তিগত সময়টুকু কোথাও হারিয়ে গেলো।
    তমশ্রী কেমেস্ট্রিতে ফার্স্টক্লাস নিয়ে মাস্টার্স পাশ করা সত্বেও নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে কখনো ভাবে নি। বরাবরই, দিদিভাইয়ের মতো জমিয়ে সংসার করবো, এই ভেবে গেছে।
    আজ যখন সংসারের দায়িত্বভার কমের দিকে এসেছে, ছেলেমেয়ে বড় হয়েছে। তখন ও নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে, ওর কাছে কিছুই নেই। না আছে শরীরের সেই লাবণ্য,না সেই কর্মক্ষমতা, না-ই আছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।
    ‘তমশ্রী পুলক চ্যাটার্জি’ এই ভাবে নিজের নাম লিখতে খুব ভালোবাসতো। আজ এই নামের থেকে ‘তমশ্রী’ কোথাও হারিয়ে গেছে । এক মুহূর্ত লাগলোনা পুলকের আজকের দিনটাকে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে অর্পিতার কাছে চলে যেতে। পুলক বহুবার বোঝাবার চেষ্টা করেছে, এখন তমশ্রীর প্রতি ওর কোনো আকর্ষণ নেই। মুখের ওপর কয়েকবার বলেওছে, ‘আমি কোনো সক্রিয়তা অনুভব করি না, তোমায় দেখে। মানসিক ভাবে যখন কোনো অনুভূতি নেই তখন জোর করে কি কিছু হয় ?”
    তমশ্রী কোনো প্রতিবাদ করে নি,নীরবে অপমান সহ্য করে গেছে। মনের বা শরীরের কোনো আবেগই যে ওকে নাড়ায় না, এমনটা নয়। শেষ কবে পুলকের সাথে একান্তে সময় কাটিয়েছিলো মনেই পড়ছে না।
    আজ ফেসবুকে অনেকেই ওদের ছবি দিয়ে ভিডিও বানিয়ে, কোলাজ বানিয়ে উইশ করেছে। আত্মীয়-স্বজন সবাই অ্যানিভার্সারি উইশ করার জন্য ফোন করছে। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। একবার হোয়াটস আপ খুলে দেখলো ভুল করেও যদি পুলক ওর সকালের উইশ এর কোনো উত্তর দিয়ে থাকে । সকালে খুব সুন্দর করে লিখেছিলো মেসেজটা, “আরেকটা বছর তোমার সাথে কাটালাম, শুভ বিবাহবার্ষিকী। আগামী আরো অনেক বছর এই ভাবেই তোমায় পাশে পেতে চাই। “
    মেসেজটা দেখেওনি। অথচ ওকে অনলাইন দেখাচ্ছে। ফেসবুকে পুলকের ফ্রেন্ডলিস্ট লক করা। শুধু মাত্র মিউচুয়াল ফ্রেন্ড দেখা যায়। তাই অর্পিতাকে খুঁজে পেলো না। নাম দিয়ে খুঁজে দেখলো,ওরও প্রোফাইল লক করা। প্রোফাইল পিকচার খানা ভারী সুন্দর।ফর্সা সুন্দর মুখ, গাঢ় লাল লিপস্টিকে সাজানো ঠোঁট। খুব আকর্ষণীয় চেহারা। আর কিছু ভালো লাগছিলো না।
    ক্লান্ত শরীরে চোখ বুজে এলো। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল টের পেলো না। ঘুম ভাঙলো দীপুর ডাকে।

-মা ! মাসি সাতবার ফোন করলো এই নিয়ে। নাও কথা বলো।

  • কই ! দে।
    ফোনটা হাতে নিয়ে কানে রাখতেই দিদিভাই বলে উঠলো, “খুব মন খারাপ। তাই তো ? পুলককে ফোন করেছিলাম উইশ করার জন্য। খুব বিরক্ত হয়ে কথা বললো। কোথাও গেট টুগেদারে খুব ব্যস্ত, পরে কথা বলবে বলে ফোনটা রেখে দিল। বুঝলাম সব। যুগ যুগ ধরে এমন ঘটনা ঘটে চলেছে। রোজই কত মন ভাঙছে, কত ঘর ভাঙছে। কেউ তার হিসেব রাখে না। আজ যখন নিজের বোনের ঘরে আগুন লেগেছে তখন অন্যের জ্বালা বুঝতে পারছি। নইলে তো পেপারে ও টিভিতে এক টুকরো খবর হিসেবে দেখতাম বা পড়তাম। “
    কোনো উত্তর দিতে পারে না তমশ্রী।
    উল্টোদিকে দিদিভাই বলে চলে,’ সারাজীবন ধরে ভেবেছিলি, প্রেমের গভীর মহাসাগরে ডুব দিয়ে গোলাপী মুক্তো এনে ওকে মধ্যমাতে পরাবি। ওর রঙে তুইও রেঙে উঠবি ও তোকে এক টুকরো অমাবস্যার চাঁদ দিয়ে চলে গেলো। তোর মনের আকাশে ধ্রুবতারা ভেবেছিলি যাকে, এক ঝটকায় তোর আকাশটাই সরিয়ে নিলো রে। আজ, দূরের তারার খোঁজে পুলক চাঁদকে ভুলে গেছে। ভুলে গেছে তোর সব ত্যাগ। তুই নিজেকে ভুলে সারা জীবন ওকেই দেখে গেছিস। সেসব ওর আজ মনে নেই। মদমত্তে উন্মাদ হয়ে আছে ও। । মেয়েদের জন্মই হয় বোধহয় কষ্ট সহ্য করার জন্য। দেখিস নি, পাড়ার শীলা কাকিমাকে, প্রমোদ কাকুর সব অত্যাচার সহ্য করে একমনে নিজের সংসার করে গেছে। চাকরি করে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছে। পাঁচ বছর আগে, রোড একসিডেন্টে যদি নীহারিকা আন্টি মারা না যেত, তাহলে আজও প্রমোদ কাকু নীহারিকা আন্টির সাথেই গ্যাংটক থেকে কন্যাকুমারী ঘুরে বেড়াতেন।”
  • – দিভাই ! ও কী আমার কাছে ফিরবে আবার ?
  • ‘সবাই তো সুখী হতে চায়’, বুনু। সুখ ক’জনে পায়।’ মানুষের মনের খবর কে দিতে পেরেছে ,বুনু ? মিথ্যে সান্ত্বনা দিই কি করে ? মৃত্য যখন দুটো মানুষকে ভিন্ন করে দেয়, তখন ব্যথা অন্য রকম। মন জানে, সে আর ফিরবে না। কিন্তু,মানুষ যখন নিজে একটা সম্পর্কের থেকে বেরিয়ে গিয়ে নতুন সম্পর্কে বাঁধা পরে ,সেক্ষেত্রে কি বলি বল ?
    একটাই গুরুমন্ত্র,পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখিস না। ওর অপেক্ষায় থাকিস না।
  • দিভাই ! আজ আমাদের বিয়ে হয়েছিল। আমরা একসাথে নতুন জীবন শুরু করেছিলাম।
  • হ্যা ! বাবু। আজ থেকে একুশ বছর আগে এই দিনেই তোর এবং পুলকের নতুন সম্পর্কের জন্ম হয়েছিল ,১৯ শে জুন 2020, আজ, সেই সম্পর্কের মৃত্যু দিন।একবার বিশ্বাস হারিয়ে গেলে সম্পর্ককে আর বাঁচিয়ে রাখা যায় না।
    হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে তমশ্রী। “দিদিভাই তোকে খুব মিস করছি। একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধর না রে। তুই কি করে আমার মনের কথা জানিস রে? আমার চুপচাপ থাকার পেছনে গুমরে ওঠা কষ্ট গুলো কাছে না থেকেও বুঝতে পারিস। আজ, আমার সব চেষ্টা,তপস্যা, যত্ন ,একাগ্রতা, সব নিমেষের মধ্যে শেষ হয়ে গেলো । মনে হচ্ছে, আমি শ্মশানে বসে আছি। চারিদিকে আমার বিশ্বাস আর ভরসার চিতা জ্বলছে দাউ দাউ করে ।“
  • -অনেক চুমু দিলাম সোনা তোকে। জড়িয়ে ধরলাম শক্ত করে। আমি আছি তোর সাথে আমৃত্যু। তোর সাথে আমার ‘নারী’ ও ‘নাড়ি’ দুইয়েরই সম্পর্ক আছে, বাবু। যে চিতার কথা বলছিস সেই চিতার ছাইয়ের গাদা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো আবার উঠে আয়। । ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা কর। যা কিছু খেয়ে নে। ভেবে দেখ,যার জন্য কষ্ট পাচ্ছিস। সে তো আজ পরমানন্দে রাত কাটাবে । এবারে তুইও নিজের গুণ গুলোকে শান দিয়ে নিজস্ব পৃথিবী গড়ে তোলার চেষ্টা কর।
    তোকে আজ সুখের আশীর্বাদ করে লাভ নেই। আশীর্বাদ করি,শান্তিতে থাক। মনের জোর বাড়িয়ে নিজের মতো করে বাঁচতে শেখ। শেষ থেকেই না হয় আবার নতুন করে শুরু হোক।
  • অজন্তাপ্রবাহিতা
Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY