ভারত থেকে জীবনবোধের লেখক-অগ্নিমিতা দাসের জীবন ধর্মী গল্প“ছদ্মবেশী”

15
জীবনবোধের লেখক-অগ্নিমিতা দাসের জীবন ধর্মী গল্প “ছদ্মবেশী”

ছদ্মবেশী
কলমে_ অগ্নিমিতা দাস

রূপান্তর নাট্যদলের বেশি নামডাক নেই।
রোজগারপাতি ও মন্দের দিকে। নাট্য দলের পরিচালক ও সেরকম কেউকেটা নয়। পরিচালক নিজেই নাটক পরিচালনা করে নিজেই লেখে। লেখার মান খুব উচ্চস্তরের নয়। “সিঁথির সিন্দুর “,”ভাগ্য তুমি কার” “
” গোবর্ধনের বিয়ে” “,”রামের বনবাস”
“বাসন্তীর প্রেম “টাইপের।
নাট্য পরিচালক রমেনের বাবা এই মফস্বল অঞ্চলের আড়তদার। বাঁ হাতে ভালো রোজগার আছে। দোতলা বাড়ি ,জমি খামার ,সব মিলিয়ে বেশ বাড়বাড়ন্ত। রমেন কলেজে বিএ পাস করে এখন বেকার। ছোট থেকেই কবিতা লেখার খুব উৎসাহ ছিল। সে কবিতা শোনানোর জন্য তার কত প্রেমিকা যে কেটে পড়েছে তার ইয়াত্তা নেই।আবার অনেক কবিতাপ্রেমী রমেনের কবিতা শুনে তার পকেটের সর্বস্বান্ত করেছে। একমাত্র তার মা আগ্রহভরে আদরের পুত্তরের কবিতা গল্প শুনত।ছোট থেকেই রমেন পাড়ার সরস্বতী পুজোতে ,বিজয়া সম্মিলনীতে ,স্কুলে কলেজে টুকটাক নাটকের রোল করত।
কলেজ থেকে বেরিয়ে চাকরির পরীক্ষায় হতাশ হয়ে যখন প্রায় শোকে মুহ্যমান তখন মায়ের আইডিয়াতেই এই নাট্যদল খোলা। রাইটার এবং পরিচালক স্বয়ং রমেন। রমেনের বাবা এতদিন পর্যন্ত সহ্য করছিলেন কিন্তু নাট্যদলের ভূত চাপার পর তাকে এই মারে তো সেই মারে!
সীতেশ বাবুর খুব ইচ্ছা তার একমাত্র ছেলে তার ব্যবসা দেখুক।চাকরি করতে হবে কোন দুঃখে!
ব্যবসাদারের ছেলে ব্যবসা সামলাবে।
কিন্তু রমেনের এক গোঁ!
সে শিক্ষিত সাহিত্যপ্রেমী !
আড়তে বসে দোকানদারি করতে পারবে না।
তাই রমেন কে নিজের ঘরে নাট্যদলের মহড়া করার পরিকল্পনা বানচাল করতে হলো।
অগত্যা শহরের শেষ প্রান্তে এক বিধবা মাসিমার একতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে শুরু হলো নাট্যদল।
রমেনের অনেক অনুরাগী ছিল। কিছু উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা তার মধ্যে ছিল!নাম কে ওয়াস্তে কলেজে যাওয়া ছাত্র-ছাত্রী , ছোটখাটো কাজ করে কয়েকজন, অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধরা নাট্য দলে যোগ দিল। সব মিলিয়ে জনা পনেরো নিয়ে”রূপান্তর” নাট্যদল শুরু হলো।

নাট্যদলের প্রত্যেকে সারা দিন পর সন্ধ্যেবেলায় রোজ আসে
এতে নিষ্ঠার অভাব নেই ঝড় জল যাই হোক না কেন মহড়ায় উপস্থিতি আবশ্যিক ।
এটা রমেনের কড়া বার্তা। যদিও নাটকের বেশিরভাগ সময় হিরোইন কাকলি অনুপস্থিত থাকতো।
হিরোইন হওয়ার যোগ্যতা যদিও তার সেরকম ভাবে ছিল না কলকাতার নাট্যদলের নায়িকাদের মত পেল্লব ত্বক,রেশমের মতো চুল ,সারা শরীরে মাদকতা কিছুই নেই। তবে এই নাট্য দলের বাকি মেয়েগুলোর খড়ি ওঠা ত্বক, কটা চুল আর ভোঁতা নাকের থেকে কাকলি বেশ ফর্সা। চুলে তেমন জেল্লা নেই তবে ঠিকঠাক ।শরীর একটু ভারীর দিকে মুখে একটু আলগা শ্রী রয়েছে।ব্যাস তাই দিয়ে রমেন কে কুপোকাত করেছে ।

রমেন তো তার প্রেমে গদগদ ।শোনা যায় কাকলির অনেক বয়-ফ্রেন্ড আছে ,রমেন কে পটিয়ে রাখে শুধুমাত্র নাটকের প্রধান চরিত্র পাওয়ার জন্য ।যাই হোক যত না মহড়া হতো তার থেকে বেশি আড্ডা হতো ।রমেন নিজের খরচ করে চা ,চপ সিঙ্গারা আনাতো। সেই লোভে প্রতিদিন হাজিরা ছিল সবার ।পুজোর পর থেকে মোটামুটি শো আসত গ্রামেগঞ্জে।কিন্তু দলের মধ্যে একটা অদ্ভুত সমঝোতা ছিল। মহড়ার পর চা মিষ্টি খেতে খেতে রাজনীতি, সিনেমা, খেলা নিয়ে তর্ক থেকে তুমুল ঝগড়া হয়ে যেত। দুই তিন দিন পর দেখা যেত সব গলে জল । একই বিড়িতে দুজন সুখ টান দিচ্ছে।

এবারে নাটকের ডাক এলো রুপপুর বলে এক গ্রামে। দলের সবাই ঠিক করল গ্রামের মানুষ দেব দেবতা নিয়ে একটু বেশি ইমোশনাল প্লাস এখন নেতাদের দৌলতে রামের খুব বাজার। তাই ঠিক হলো “রামের বনবাস “নাটকটা মঞ্চস্থ হবে। রমেন ” রামের বনবাস “নাটকটিতে একটু আধটু আধুনিকতা যোগ দেওয়াতে নাটকটা পৌরাণিক হলেও পাবলিক বেশ মজা পায়। “রামের বনবাস “নাটকটি যে রাম হয় সে দেখতে কালো হলেও লম্বা-চওড়া গলার আওয়াজ ভরাট অভিনয় বেশ ভালো করে। রূপপুরে রামের বনবাস সুপার ডুপার হিট হল। ওই অঞ্চলের সবাই প্রায় রাম ভক্ত।

ওই গ্রামের পাশাপাশি কয়েকটি গ্রামের নাট্য উদ্যোক্তারা নাটকের জন্য অগ্রিম বায়না দিয়ে দিল।রমেন তো খুশিতে ডগোমগো ।আনন্দে আত্মহারা হয়ে একলা পেয়ে সীতা ওরফে কাকলিকে আদর করার চেষ্টা করলে কাকলি মিষ্টি হেসে বলল,” রমেন দা ভুললে চলবে না !আমাকে এবার নতুন এন্ড্রয়েড ফোন কিনে দিতে হবে আমার ফোনটা ঠিক মতো কাজ করছে না।”রমেন বলে হবে হবে সব হবে! মন দিয়ে শো কর !আমি দেখতে পাচ্ছি তুই হবি সেরা অভিনেত্রী আর আমি সেরা পরিচালক। রমেনের আবেগে মুখ ঝামটা দিয়ে কাকলি বলে উঠলো ,”তোমার খালি বড় বড় কথা ! আমি খেটে মরি! সেই থেকে আমার মাথা ধরেছে কারোর কোনো হুঁশ আছে! ব্যস্ত হয়ে রমেন বলল, “দাঁড়াও দাঁড়াও বিষ্টুর কাছে ওষুধের বাক্স আছে এনে দিচ্ছি ।এই বলে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। নাটকের শেষে সবাই তখন গ্রিনরুমে মেকআপ তুলছিল বিষ্টু মুখ বাঁকিয়ে অয়ন কে বলল,” রমেন দা কে ভাল মানুষ পেয়ে কাকলি কি নাচ নাচাছে! আমরা গরম মশা সব সহ্য করে নাটক করছি কিসের আশায়,” রূপান্তর” কে দাঁড় করানোর জন্যই তো। সবাই রমেনের কাকলির প্রতি এই আদিখ্যেতা দেখে অত্যন্ত বিরক্ত।

পরপর কয়েকটি শোতে রামের বনবাস হট কেক। শেষ শো যে গ্রামে ছিল সেই গ্রামের নাম মোহাম্মদ বাজার।গ্রামে হিন্দু মুসলিম মেশানো ছিল ,মুসলমানের প্রাধান্যই বেশি। দলের বয়স্ক সুবীর বাবু রমেন কে আলাদা ডেকে বললেন ,”এই গ্রামে অন্য নাটক করলে হতো না !একটু রিহার্সাল করে নিলেই হবে।”
রমেন বলল,” আরে এটি এটা একটা বড় গঞ্জ, মেলা উপলক্ষে উদ্যোক্তারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করছে। তারমধ্যে আমাদের নাটক ও থাকবে। কিছু হবে না !শুধু এই গ্রাম নয় ,আশেপাশের অনেক গ্রাম থেকে মেলা উপলক্ষে মানুষ আসবে। “দলের সবাই গজ গজ করতে লাগল, আসন্ন বিপদের আশঙ্কায়। কি দরকার বাবা এই গ্রামে রাম নিয়ে নাটক করার!
যেখানে রাম কে নিয়ে এত বিতর্ক!
রমেন দমবার পাত্র নয়। নগদ টাকা হাতে নিয়ে নিয়েছে ।সবে একটু নাম হতে শুরু করেছে এমন সময় এসব দেখলে হয়। যাই হোক নাটক ভালোভাবেই হল।

অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন মোহাম্মদ লতিফ, এবছর ইলেকশনে দাঁড়াবেন।
তাই তিনি ক্লাবের ছেলেদের টাকা পয়সা দিয়ে এই সব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করাছেন। নাটকটি দেখার পর তিনি মাইকে হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি নিয়ে একটি বড় ভাষণ দিলেন । তিনি রামের মত পুত্র ও দেশভক্ত কে সালাম জানালেন। হাততালির ঝড় বইলো।
মোহাম্মদ লতিফ রামের বনবাস দেখে এতই আপ্লুত হয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি “রূপান্তর” দলকে হাজার টাকা পুরস্কার দিলেন। রামকে আলাদা করে কিছু দেওয়ার ইচ্ছায় পকেট হাতড়ে পাঁচশো টাকার নোট পেলেন। পাঁচশো টাকা দেওয়ার তার মোটেও ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু একশো টাকা তো এখনকার দিনে দেওয়া যায় না । তার একটা প্রেস্টিজ আছে। ছেলে কে আশেপাশে খুঁজে দেখতে পেলেন না! যদি তার কাছে দুশো টাকার নোট থাকে! কিন্তু সে হয়ত ফোনে কথা বলছে বা ফেসবুকে ব্যস্ত। মনে মনে ছেলে কে মুন্ডুপাত করতে করতে ঠিক করলেন রাম বলে কথা ,তাকে পুরস্কার দিতেই হবে।

অগত্যা পাঁচশো টাকার নোট রামের জামায় সেফটিপিন দিয়ে এঁটে দিলেন। গ্রামের মানুষ গদগদ। আশেপাশর বহু গ্রাম থেকে অনেক মানুষ মেলা উপলক্ষে এসেছিল। সবাই বলাবলি করতে লাগল ,”সত্যিই একেই বলে মানুষ ! লতিফ সাহেব সব ধর্ম কে কিভাবে সম্মান করেন। মুসলমান হয়ে রামকে পুরস্কার ভাবা যায়।
লতিফ সাহেব ছেলের বাইকের পেছনে বসে বাড়ি যেতে যেতে ভাবছিলেন __কেমন কায়দা করে ভোটের আগে ভোট ব্যাংকে ভোটারদের সংখ্যা বাড়ালাম !বেঁচে থাক রাম !বেঁচে থাক ভোটব্যাঙ্ক!এবার যেন নির্বাচনে জিতে যাই। গতবার এক চুলের জন্য হেরে গিয়েছিলাম হিন্দু ভোট না পাওয়ার জন্য এবার আর ফসফাতে দেব না। রাম কে ধরে যদি জান্নাতের সিড়ি পাওয়া যায় ক্ষতি কি।
নাটক শেষে নাটকের রাম ওরফে জালাল শেখ তার পাওয়া টাকাটা দলের লিফলেটে আঁকা রামের ছবিতে ঠেকিয়ে দলের বাক্সে রাখল।
তারপর অজু করতে গেল ।পাঁচ ওয়াক্ত নামাজি জালালের এশার নামাজের সময় পেরিয়ে গেছে ।তাই তাকে এখন এশার ফরজ নামাজটা পড়তে হবে।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY