“উষ্ণতার এপাশ ওপাশ ”ভিন্ন ধারার অণুগল্পটি লিখেছেন ব্যতিক্রম পরিক্রমায় বিরল প্রতিভাধর লেখক ও কবি নাসরিন আক্তার ।

414
“উষ্ণতার এপাশ ওপাশ ”ভিন্ন ধারার অণুগল্পটি লিখেছেন ব্যতিক্রম পরিক্রমায় বিরল প্রতিভাধর লেখক ও কবি নাসরিন আক্তার ।
প্রতিভাধর লেখক ও কবি নাসরিন আক্তার

উষ্ণতার এপাশ ওপাশ

                                     -নাসরিন আক্তার

হাঁটুর ভাঁজে মাথা লুকিয়ে কুন্ডুলি পাকিয়ে বসে আছে বাবলু’। একটু পরপর মাথা বের করে চোরা চোখে উষ্ণতা খুঁজছে। পাশে বসা কুন্ডলি পাকানো কুকুরটাও থেমে থেমে লেজ নাড়িয়ে সঙ্গ দিচ্ছে বাবলুর।

জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ, ঘন কুয়াশায় ঢেকে আছে চারদিক। দশহাত দূরের কিছুই দেখা যায় না, তার উপর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। এ যেনো গোঁদের উপর বিষফোঁড়া!!!
পরনে ছেঁড়া শার্ট আর হাফপ্যান্টের উপর একটা ছেঁড়া লুঙ্গি জড়ানো। তাও সেটা শীতের কাঁপুনি দেখে দুদিন আগে টঙ দোকানদার আবদুল চাচা দিয়েছেন।

ফুটপাতের ফল দোকানদার রহিমেরও তেমন সামর্থ নেই যদিও এতিম ছেলেটাকে দেখলে বড্ড মায়া হয় তার। কবে, কখন, কোথা থেকে এই ষ্টেশনে এসেছিলো বাবলু’ তা ঠিক মনেও নেই। কেউ লক্ষ্যই করেনি ছেলেটা কার?

শুধু দেখেছে, ছোট একটি ছেলে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়। কোথায় খায়, কোথায় থাকে সেটা কেউই লক্ষ্য করেনি। একসময় দেখা গেলো বাবলু এই ষ্টেশনে পারমানেন্ট হয়ে গেছে। শুধু নিজের কোন ঠিকানা বলতে পারে না। এই ব্যস্ততার দিনে কেই বা কার খোঁজ রাখে?
ষ্টেশনে হাজারো মানুষের আনাগুনা প্রতিদিন। তাদের উচ্ছিষ্ট খেয়েই বাবলুর দিন পার হয়, বয়স বেড়ে যায়।

গরমে ঘুমানোর সমস্যা নেই, পরিত্যক্ত ওয়াগনের ছাদে রাত পার হয়ে যায়।
সমস্যা শুধু এই শীতের রাতেই। শীতের বুড়ি বড় নির্মম।
ষ্টেশনের কোনার দিকে কিছু পুরোনো চট স্তুপ করে রাখা, তারই এক পাশে পাগলীটা ঘুমিয়ে আছে। দিনে কখনোই বাবলু তার কাছে ভিড়তে সাহস পায় না, খুব ভয় তার পাগলীটাকে।
আজ বারবার ঘুরে ফিরে সেদিকটাতেই লোভাতুর চোখে তাকাচ্ছে।

মনে সুপ্ত ভাবনা, পাগলীটা ঘুমিয়ে গেলেই চুপ করে পাশে যেয়ে শুয়ে যাবে। চোখ দুটো ঘুমে ঢুলুঢুলু তাও মন থেকে ভয় দূর হচ্ছেনা। আরো কিছুটা সময় অপেক্ষা করে বিড়াল পায়ে হেঁটে চুপ করে পাগলিটার পাশে শুয়ে পড়ে। নিচের চট আর পাগলির শরীরের উষ্ণতা দুটোই যেনো বাবলুর কাছে বেহেস্তি সুখ মনে হয়।

ঘুমঘুম চোখে পাগলীটা নিজের শরীর থেকে ছেড়া কম্বলের একটা অংশ মায়ের মমতায় বাবলুর শরীরে তুলে দেয়। বাবলু এবার একটু সাহস পায়, পাগলীটার শরীরের সাথে সেটে শোয়। একটু পর কুকুরটাও এসে বাবলুর অন্য পাশে শুয়ে নিজেও একটু উষ্ণতা পেতে চায় যেনো। বাবলু এতে আরো একটু বাড়তি উষ্ণতা পায়।

রাত্রি’ ওয়ারড্রপ থেকে শীতের জামা-কাপড় বের করতে করতে নিঝুমকে তাড়া দেয়। -মামনি এবার শুয়ে পরো, আর কার্টুন দেখতে হবে না। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে। আমরা দাদুর বাড়ি যাচ্ছি।

রাত্রি’ ও মামুনের’ একমাত্র মেয়ে নিঝুম। বয়স পাঁচ বছর। বাবার দিকে কাতর চোখে তাকায়। মামুন চোখের ইশারায় মাকে দেখিয়ে বলে- না মা’ এবার ঘুমিয়ে যাও, মামনি বকবে।

রাত্রি’ হাতের কাজ রেখে মেয়ের হাতে মুখে লোশন মাখিয়ে শুইয়ে গলা পর্যন্ত কম্বল টেনে দেয়। নিঝুম’ বাধ্য মেয়ের মতো চোখ টিপে শুয়ে থাকে। রাত্রি আবার নিজের কাজে মন দেয়। শীতের জামা কাপড় বের করে বিছানার স্তপাকার করতে থাকে।

মামুন মুখের সামনে ধরা বই থেকে চোরা চোখে বারবার স্ত্রীর কাজ দেখে থাকতে না পেরে বলেই ফেলে,
-এত কাপড় নিয়ে কি হবে? যাচ্ছোতো মাত্র চার-পাঁচ দিনের জন্য।
-লাগবে, দেখোনা কতো শীত পরেছে? তাছাড়া গ্রামের দিকে শীত আরো বেশি।
-তাই বলে এতো?! কয়টা লাগেজ হবে ভেবে দেখেছো?
-হোক, ছোট বাচ্চাদের জামা কাপড় একটু বেশিই নিতে হয়। কখন কোনটা লাগে বলা যায়না। মামুন জানে, স্ত্রীকে বলে লাভ নেই। নিজে যা বোঝে তাই করে।
তাই চুপচাপ বইয়ের পাতায় ডুবে যায়।
মাঝরাত পার হওয়া ট্রেনের হুইসেল ছাপিয়ে ভোর ছ’টার অনেক আগেই ষ্টেশন জেগে ওঠে। তবে শীতের সকাল বলে হকারের আনাগোনা এখনো শুরু হয়নি। মাত্র দু’একটা দোকানের শাটার তুলতে শুরু করেছে। ঘুম ভেঙে গেলেও বাবলুর’ পাগলী আর কুকুরের মাঝের ওম ছেড়ে বেরুতে ইচ্ছে করে না। ও’ ময়লা চটের ভেতর থেকে শুধু চোখ দুটো বের করে ভোরের কাজকর্ম দেখে।

৬.৪৫ বেজে যাওয়াতে মামুন’ তাড়া দেয়, তাড়াতাড়ি করো- ট্রেন আসার আর বেশি বাকি নেই। রাত্রি’ মেয়ের হাত ধরে টান দিয়ে বলে- নিঝুম, দাঁড়িয়ে কেনো? তাড়াড়াড়ি হাঁটো।
-মামনি দেখো, ওখানে কুকুরের পাশে একটা ছেলে!
ভালো করে লক্ষ্য না করলে বোঝার উপায় নেই, পাগলী আর কুকুরের মাঝে কেউ একজন শুয়ে আছে। তাই প্রথমটায় রাত্রি’ বুঝতে পারে না।
বলে- কই? ওখানে তো একটা পাগলী শুয়ে আছে।
-না মা’, একটা ছেলেও আছে। দেখো, কেমন করে তাকিয়ে আছে?!
এবার রাত্রির নজরে আসে।
-ও তাইতো!
-মা, ও’ ওখানে শুয়ে আছে কেনো? কুকুর যদি ওকে কামড়ে দেয়?
-দিবে না, ওরা ওভাবেই থাকে।
-ওরা ওভাবে থাকে কেনো? ওদের ঘর নেই?
-না।
-ওদের ঘর নেই কেনো?
-ওরা গরিব তো, তাই।
-ওরা গরিব কেনো মা’?
নিঝুমের অবান্তর প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে রাত্রি’ বিরক্ত হয়ে মেয়েকে ধমকে উঠে।
-আহ! এবার হাঁটোতো, বাবা রাগ করবেন।

ছোট্ট মনের হাজারো প্রশ্ন নিয়ে নিঝুম’ মায়ের হাত ধরে সামনে হাঁটে। বাবলু’ পুতুলের মত মেয়েটার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।

কি সুন্দর দেখতে! পরনে তুলোর মত নরম পোশাক, মাথায় ফুল তোলা টুপি, পায়ে মোজা জুতা দেখতে দেখতে ও’ কেমন একটু উষ্ণতা অনুভব করে। সেই রাখাল বালক আর রাজকন্যার গল্পের মত...

-রাজকন্যার শর্ত ছিলো, যে রাজপুত্র মাঘ মাসের শীতের রাতে পুকুরে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে সারা রাত বসে থাকতে পারবে, রাজকন্যা তাকেই বিয়ে করবে। কোন রাজার ছেলেই এই শর্ত পূরণ করতে পারেনি। শেষে এক রাখাল বালক পেরেছিলো।

কি করে পারলো?
রাজার এই প্রশ্নের উত্তরে রাখাল ছেলে বলেছিলো, সুউচ্চ প্রাসাদের জানালায় কুঁপি হাতে দাঁড়িয়ে রাজকন্যা যখন রাখাল বালককে দেখছিলো, সেই আলোর উষ্ণতা অনুভব করেই তার সারা রাত পার হয়ে যায়।
আমাদের গল্পের বাবলুও কিছুটা সেরকম উষ্ণতা অনুভব করে।

নিঝুম’ বাবা-মায়ের সাথে ট্রেনে উঠে জানালায় মুখ রেখে বাবলুর দিকে তাকিয়ে থেকে কেমন একটা কষ্ট অনূভব করে। ওর খুব ইচ্ছে করে, এক দৌড়ে গিয়ে বাবলুকে একটা সোয়েটার দিয়ে আসে। ওর নিজের তো অনেক আছে কিন্তু মামনি বকবে তাই সাহস হয়না।

ট্রেন হুইসেল বাজিয়ে কুয়াশা কেটে সামনে এগিয়ে চলে। নিঝুম ঘাড় বাঁকিয়ে বাবলুকে দেখতে চেষ্টা করে। দেখতে না পেয়ে মামনিকে আবারো প্রশ্ন করে, মামনি ওরা গরিব কেনো?
এবার আর রাত্রি রাগ করে না।

মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হয়, তাই মেয়ের মন অন্যদিকে ফেরাতে চেষ্টা করে।
-দেখেছো মামনি, ট্রেন কত দ্রুত চলছে। আমরা ছেলেবেলায় ট্রেনে চড়ে একটা ছড়া কাটতাম। এসো সেই ছড়াটি কাটি-
রেল গাড়ি ঝমাঝম
পা পিচলে আলুর দম,
ইস্টিশনের মিষ্টি কুল
শখের বাগান গোলাপ ফুল…

মা-মেয়ে ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দের সাথে তাল রেখে ছড়া কাটে, বাবলু নিস্পলক তাকিয়েই থাকে, ট্রেন নিজ গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যায় পিছনের সব দৃশ্য ফেলে…

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY