করোনা ক্রান্তি কালের বিশ্লেষণ ধর্মী লেখা “করোনা ও উহান শহর ”লিখেছেন কলমযোদ্ধা হাসানুজ্জামান

110
“করোনা ও উহান শহর ”লিখেছেন কলমযোদ্ধা হাসানুজ্জামান

করোনা ও উহান শহর

                        হাসানুজ্জামান

সারা বিশ্বে আবালবৃদ্ধবণিতার কাছে করোনাভাইরাস একটি আতংকের নাম হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ১৯১৮ সালে বিশ্বে আরো একটি ভাইরাসের আগমন ঘটেছিল। তার নাম ছিল ‘স্প্যানিস ফ্লু।’ সেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে ৫ কোটি মানুষ মারা যায়। মজার ঘটনা হচ্ছে আমেরিকার নাগরিক ম্যারিলি শাপিরো ১৯১৮ সালে ‘স্প্যানিস ফ্লু’তে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ৬ বছর। তিনি সেই ভাইরাস থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। আবার তিনি করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বেশ কিছুদিন। এখন তিনি করোনা মুক্ত জীবনে ফিরে এসেছেন।

করোনার সঙ্গে চীন দেশের একটি শহরের নাম মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে। সেই শহরের নাম ‘উহান শহর’। এটি চীনের হুপেই প্রদেশে অবস্থিত। অনেকেই এই শহরকে আবার উহুয়ান শহর বলে চেনে। যে যেভাবেই চিনুক না কেন আজ এই শহরটি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি শহর হিসাবে। সর্বশেষ তথ্য মতে, বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ৫৬ লাখেরও বেশি। মৃত্য বরণ করেছে ৩ লাখ ৫৩ হাজার ২২৫ জন। বিশ্বের নামীদামী দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকায় এ পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১৭ লাখ ২৫ হাজার ২৭৫ জন। মৃত্যু ১ লাখেরও বেশি। ব্রিটেনে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৬৫ হাজার। মৃত্যু ৩৭ হাজার ৪৮ জন। ইতালীতে আক্রান্ত ২ লাখ ৩০ হাজার ৫০০। মৃত্যু ৩১ হাজার ৯৫৫ জন। ফ্রান্সে আক্রান্ত ১ লাখ ৮২ হাজার ৭২২ জন। মৃত্যু ২৮ হাজার ৫৩০ জন। স্পেনে আক্রান্ত ২ লাখ ৮০ হাজার। মৃত্যু ২৭ হাজার ১১৭। ব্রাজিলে আক্রান্ত ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৫০৭ জন। মৃত্যু ২৪ হাজার ৫৯৩ জন। জার্মানীতে আক্রান্ত ১ লাখ ৮১ হাজার। মৃত্যু ৮ হাজার ৪৯৮ জন। ভারতে আক্রান্ত ১ লাখ ৫০ হাজার ৭৯৩ জন। মৃত্যু ৪ হাজার ৩৪৪ জন। বাংলাদেশে আক্রান্ত ৩৬ হাজার ৭৫১ জন। মারা গেছে ৫২২ জন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের পরিবর্তন ঘটতে থাকবে।

চীনের যে শহরে এই করোনাভাইরাসের উৎপত্তি, সেই শহর নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বা তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া প্রথম থেকেই বলে আসছে চীনের উহান শহরের ল্যাব থেকে করোনার উৎপত্তি। তারা আরো বলছে চীন পরিকল্পিতভাবে এই ভাইরাসের উৎপত্তি ঘটিয়ে বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছে। অবশ্য এ ব্যাপারে চীন প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে। আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই দাবীর পক্ষে এখনো কোনো যুক্তি খুঁজে পায়নি। বিশ্বের বেশির ভাগ বিজ্ঞানী এবং তাঁদের গবেষণাগার ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেনি। তাঁরা ভিন্নমত পোষণ করে বলেছে, করোনাভাইরাস উহান শহরের বাদুর থেকে অন্য একটি মানুষের পাশাপাশি থাকা একটি প্রাণীর মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এই শহরের প্রথম একজন ডাক্তার চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই রোগের বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি তাঁর ফেসবুক পেজে এই ভাইরাসের কথা লিখলে সরকারের পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা সেই ডাক্তারকে ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। পরে সেই ডাক্তার এই ভাইরাসে মৃত্যুবরণ করলে পুলিশ নড়েচড়ে বসে। ভাইরাসের বিষয়টির সত্যতা উপলব্ধি করে পুলিশ প্রশাসন পরে ডাক্তারের পরিবারের নিকট ক্ষমা চেয়ে নেয়।

১৯২৭ সালে চীনের রাজধানী ছিল এই ‘উহান শহর।’ পরবর্তীতে টোকিও ও তারপরে বেইজিং চীনের রাজধানী হয়েছে।এই শহরটির পরিচিতি আসে জিমনেশিয়াম ফিবা এশিয়া চ্যাম্পিয়নশীপ’ আয়োজনের মধ্য দিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান হুপেই শহরের পূর্বাঞ্চল দখল করে নেয়। আর এই হুপেই প্রদেশের রাজধানীর নামই হচ্ছে ‘উহান শহর’। শহরটি হাননদী এবং ইয়াংসিকিয়াং নদীর মোহনায় অবস্থিত। এখানকার অনেক মানুষ রয়েছে যারা এখনো নদী পথে ফেরীর মাধ্যমে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাতায়াত করে। এই শহরটি চীনের মধ্যস্থলে অবস্থিত বলে পুরো চীনের সঙ্গে এর চমৎকার যোগাযোগ রয়েছে। এই যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে সড়ক পথ। এভাবে বলা যায় যে, চীনের অন্যান্য প্রদেশে যেতে হলে এই শহরের পাশ দিয়েই যেতে হয়। তবে সব শহরের ক্ষেত্রে একথা আবার ঠিক নয়।

২০১৫ সালের আদশশুমারী অনুযায়ী এই শহরের লোক সংখ্যা ১ কোটি ৬ লাখ ৭ হাজার ৭০০। এদের মধ্যে মানুষ দেবতা ৭৯.২ ভাগ, টাওবাদী ৩.৯৩ ভাগ, বৌদ্ধধর্ম ১৪.৬৯ ভাগ, প্রোটেস্টট্যান্ট ২.৮৬ ভাগ, ক্যাথলিক ৩৪ ভাগ, ইসলাম ১.৬৪ ভাগ এবং অন্যান্য ১.৬১ ভাগ। সমতল ভূমি থেকে ৩ হাজার ১০৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই শহরটি। এখানে যতগুলো পাহাড় রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জিউগং, জিংঝু, থ্রিজর্জেস ড্যাম উডাং উল্লেখযোগ্য। প্রতিবছর এই শহরে দেশ বিদেশ থেকে প্রচুর পর্যটক আসে। পাহাড় ও এখানকার নদী এবং পুরান এই শহরটি পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়াও পযর্টকদের কাছে আরো একটি বিষয় বেশ আকর্ষণীয় তা হচ্ছে এখানকার আবহাওয়া। শীতকালে এখানকার আবহাওয়া ১ ডিগ্রি থেকে ৬ ডিগ্রির মধ্যে এবং গ্রীষ্মকালে ২৪ ডিগ্রি থেকে ৩০ ডিগ্রির মধ্যে উঠানামা করে। তবে কখনো কখনো উহান শহরের তাপমাত্রা তার চেয়েও বেশী হয়। কৃষিজাতের মধ্যে এই শহরের পাশ্ববর্তী এলাকাগুলোতে ধান, গম, চা ও তুলা উৎপাদিত হয়। এখানকার উৎপাদিত খনিজ পদার্থের মধ্যে মেটাল বেশ বিখ্যাত। এ ছাড়াও মেটাল, টেক্সটাইল সরঞ্জামাদিসহ অটোমোবাইল শিল্পের বেশ কদর রয়েছে। এই শহরের আরো একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে শহরটি পুরো চীনের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত। এখানকার চুজু ও হানজু অপেরা চীনের মধ্যে প্রসিদ্ধ। মৌসুমে এই অপেরার দল পুরো চীন চষে বেড়ায়।

এই শহরের মানুষ বেশ কর্মঠ এবং দায়িত্বশীল। কাজের প্রতি তাদের মনোযোগ বেশী। বেশির ভাগ মানুষই দিনের খাবার রাস্তাঘাটে সেরে নেয়। এখানকার হোটেলগুলি বেশির ভাগই রাস্তার পাশে। ছোট ছোট হোটেল থেকে নুডুলস সেই সঙ্গে অর্ধসিদ্ধ মাংশ মিশিয়ে তারা খাইতে বেশ পছন্দ করে। তাদের কাছে যেসব প্রাণীর মাংশ বেশী পছন্দ সেগুলো আবার বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ পছন্দ করে না। এখানে অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে বাদুরের মাংশও বিক্রি হয় যা উহানবাসীর বেশ পছন্দের একটি খাবার। ধারণা করা হচ্ছে এই বাদুর থেকে করোনাভাইরাস মানুষের কাছাকাছি বসবাসকারী অন্য একটি প্রাণীর মাধ্যমে মানব শরীরে প্রবেশ করেছে।

আজকে এই করোনাভাইরাস বিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছে। চীন থেকে শুরু করে আফ্রিকা, আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া কোনো দেশ বাদ যাচ্ছে না। চীন তার নিজস্ব শক্তি দিয়ে করোনা মোকাবেলা করে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারলেও তাদের প্রায় ৫ হাজারের মত নাগরিক ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে। এদিকে এই করোনায় বিশ্বে ৩ লাখের বেশি মানুষ ইতোমধ্যে মারা গেছে। ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রি বরিস জনসন, বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী ম্যাডোনা করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে উঠেছেন। ম্যাডোনা করোনা আক্রান্ত রোগীদের সাহায্যে ১১ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন। গবেষকরা বলছেন, কোভিড-১৯ এর চেয়ে সার্স-১ এবং সার্স-২ বেশি শক্তিশালী। কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে উপসর্গের তীব্রতা অনেক কম এবং মৃত্যুর হারও কম। কিন্তু সার্স-১ এবং সার্স-২ এ আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুর হার বেশি। নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ভাইরোলজিস্ট জোনাথন বল বলেছেন, কোভিড-১৯ ভাইরাসের পৃষ্ঠতলে ( সারফেস) থাকে এক ধরণের প্রোটিন। যার মাধ্যমে কোষের রিসেপ্টরগুলোেেক ধোঁকা দিয়ে তারা আরএনএকে কোষের ভিতরে ঢুকিয়ে দিতে পারে। দেহে প্রতিরোধী কোষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানোর জন্য আমাদের কোষের কিছু কলাকৌশল আছে। ভাইরাসের আরএনএ গুলো আমাদের কোষে ঢোকার পর সেই কলাকৌশলগুলো নিয়েই কোষের মধ্যে করোনা ভাইরাস দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটায়। তাতে কোষের মধ্যে ভাইরাসের সংখ্যা এতটা বেড়ে যায় যে, কোষের প্রাচীর ফেটে যায়। তখন সেই ভাইরাসগুলো দেহে ছড়িয়ে পড়ে।

ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) এর বিজ্ঞানীরা বলেন, ‘কোভিড-১৯ কে জীবনের অংশ মনে করে আগামী কয়েক বছর চলতে হতে পারে।’ করোনাভাইরাসের আগে মানুষ যেভাবে জীবন অতিবাহিত করেছে সেই জীবনে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে না। হাত ধোঁয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মাস্কপরা থেকে বিরত থাকার কোনো সুযোগ থাকবে না। করোনাভাইরাস মানব শরীরে দীর্ঘদিন বসবাস করতে পারে সে ক্ষেত্রে বছরের পর বছর টিকা নেয়ার প্রয়োজন হতে পারে। ১৯১৮ সালে স্প্যানিস ফ্লুতে ৫ কোটি লোক মারা যায়। এতো বড় একটি মৃত্যুর ঘটনা মানুষ ভুলেই গিয়েছিল। কিন্তু করোনা এসে সেই বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক ঘটনা পুনরায় বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিল।

এদিকে ওষুধ আবিস্কারের কিছু কিছু তথ্য শোনা যাচ্ছে। চীন, জাপান, আমেরিকা, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা করোনাভাইরাসের টিকা আবিস্কারের পথে বলে দাবী করে আসছে। তবে হাইড্রোক্সিক্লোরোইকুইন, রেমডেসিভির মত ওষুধে কিছু কিছু সফলতা আসলেও তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা জানিয়েছে। সংস্থাটি এই ওষুধগুলো প্রয়োগে আপত্তি জানিয়ে আসছে।

হাসানুজ্জামান : সদস্য, খেলাঘর কেন্দ্রিয় কমিটি।
মোবাঃ ০১৭১১-১০৮৭৩৬ তারিখঃ ২৮.৫.২০২০

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY