প্রফেসর ড. মোঃ আমজাদ হোসেন (এসডিজি কোঅর্ডিনেটর -বাংলাদেশ চ্যাপটার) এর সমকালীন সময়ে করোনা ক্রান্তি কালের বিশ্লেষণধর্মী লেখা “করোনা মোকাবেলা : টেকসই উন্নয়ন অর্জনে একটি অনুকরণীয় প্রেক্ষিত” (Handling Corona : An Exemplary Aspect in Achieving SDGs)

78
“করোনা মোকাবেলা : টেকসই উন্নয়ন অর্জনে একটি অনুকরণীয় প্রেক্ষিত (Handling Corona : An Exemplary Aspect in Achieving SDGs

“করোনা মোকাবেলা : টেকসই উন্নয়ন অর্জনে একটি অনুকরণীয় প্রেক্ষিত” (Handling Corona : An Exemplary Aspect in Achieving SDGs)

প্রফেসর ড. মোঃ আমজাদ হোসেন (এসডিজি কোঅর্ডিনেটর -বাংলাদেশ চ্যাপটার)

করোনা মোকাবেলা : টেকসই উন্নয়ন অর্জনে একটি অনুকরণীয় প্রেক্ষিত (Handling Corona : An Exemplary Aspect in Achieving SDGs)
উপরোক্ত শিরোনামটি এইরূপও হতে পারেঃ
বিশ্বব্যাপী করোনার যাত্রা ও টেকসই উন্নয়নে ইহার যথার্থতা (Worldwide Journey of Corona and It’s Usefulness in Achieving SDGs)

বিগত এপ্রিলের ৪ তারিখে
“করোনার আগমন ও বিকিরণ: (ক্ষয়িষ্ণু বৈশ্বিক স্থিতিশীল তার টেকসই পুনর্গঠনে প্রকৃতির একটি কৌশল” The Emergence and divergence of Corona syndrome: (A Natural Device for Sustainable Restoration of Depleting Global Sustainability) শিরোনামে ফেসবুক পোস্টিংটি সমর্থন করে একাধিক প্রকৃতিবাদী ও ধর্মবিজ্ঞানী অভিমত প্রকাশ করেছেন।
পোস্টিংটির লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/100740978263291/posts/100749594929096/?sfnsn=mo

বর্তমানে বাংলাদেশে মহামারী করোনা মোকাবিলায় ‘লকডাউন’ পদ্ধতি চলছে। মহামারীতে এই পদ্ধতিরকথা ১৪00 বৎসর পুর্বেই ইসলাম প্রচার করেছে। ‘লকডাউন’ পদ্ধতি কার্যকারিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের তথা বিশ্বের মানুষ যে বাস্তবমুখী তালিম পাচ্ছে ও চোখের সামনে যে বাস্তবতা দেখছে সেগুলি যদি আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ও জীবনধারা সংস্কৃতিতে ধারণ ও লালন করা যায় তাহলে ২০১৫ সালে জাতিসঙ্ঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসমূহ অর্জনকরা বাংলাদেশ সরকারের জন্য সহজ হবে।
সাময়িকভাবে চলমান লকডাউন একদিকে যেমন ঢাকা শহরে বায়ু ও শব্দ দূষণ হ্রাস, প্রকৃতির প্রাণশক্তির পুণঃজাগরণ, সুন্দরবনে বনজ প্রতিবেশের পুনঃআবির্ভাব – হরিন, বাঘ, বানর, সাপ ও কুমিরসহ নানা ধরনের বন্য পাখির মুক্ত ও নির্ভয় আচরণ, বঙ্গোপসাগরে ডলফিনের এবং সমুদ্রসৈকতে কচ্ছপ ও কাঁকড়ার আধিক্য ও অবাধ বিচরণ সম্ভব করেছে – অন্যদিকে এই লকডাউন পদ্ধতি কার্যকর করার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের নিরলস পরিশ্রম ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ, গরিবদেরকে ধনিদের দ্বারা সাহায্য প্রদানে উদ্বুদ্ধ করেছে। শিক্ষার্থীরা কৃষকদেরকে ধান কাটতে সাহায্য করছে – নিজেরাও কৃষি কাজের প্রশিক্ষণ পাচ্ছে।
এই লকডাউন পদ্ধতি কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশে আগে থেকেই চলমান আছে। বঙ্গোপসাগরে মাসব্যাপী জাটকা ও চিংড়ী সংরক্ষণ, হালদা ও অন্যান্য নদীতে রুই কাতলা মাছের ডিম সংরক্ষণ ইত্যাদি তার উদাহরণ। রমজান মাসে আমলকারি মুসলিমেরা নফসকে লকডাউন করে, সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখে। সেই সাথে এখন থেকে সরকার যদি প্রতিবৎসর অজরুরি অফিস আদালত, কলকারখানা, দোকানপাট, হোটেল রেস্টুরেন্ট, সড়ক ও নৌ পরিবহন চলাচল ইত্যাদি রমজান মাসে লকডাউন রাখে তাহলে টেকসই উন্নয়নের বেশকিছু অভীষ্ট আপনা আপনিই অর্জিত হবে। জ্বালানী সাশ্রয়, জাতীয় আয়-ব্যায়, লাভ-লোকসান, জনসংখ্যা ও আর্থিক প্রবৃদ্ধি এবং সম্পদ বণ্টনের টেকসই ভারসাম্য রক্ষা হবে। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে। সপ্তাহে এক দিন কারফিউতুল্য পূর্ন লকডাউন ‘সার্বিক স্থিতিশীলতা’কে (holistic sustainability) নিশ্চিত করবে। ফলস্বরূপ টেকসই উন্নয়নের অধিকাংশ অভীষ্ট অর্জিত হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অর্জিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট সমূহ হলো: দারিদ্রসুলভ সহজ সরল জীবনযাপন (poverty-like simple lifestyle) সংস্কৃতিকরণ, টেকসইকৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, নৈতিক ও ব্যবহারিক শিক্ষা, নারীর মর্যাদা, পানি ব্যাবস্থাপনা, গ্রামাঞ্চলে নিশাচর প্রাণী বান্ধব বিদ্যুতায়ন, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পায়ন, সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণ, বাসযোগ্য নগরায়ন, মৌলিক চাহিদা ভিত্তিক উৎপাদন, জলবায়ু পরিবর্তন ব্যাবস্থাপনা, জলজ জীববৈচিত্র সংরক্ষণ, হ্রাসমান ভূমি বন ও স্থল জীববৈচিত্র পুনরূদ্ধার, সুখশান্তি ও ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিতকারি প্রতিষ্ঠান সমূহের পুনর্গঠন এবং উন্নয়নে স্থানীয় বা দেশি বিনিয়োগকারীদের অংশীদারিত্ব।
পশ্চিমা আধুনিকতা, ভোগবাদ ও বিশ্বায়নে আসক্ত পণ্ডিতজনদের নিকট বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের অভীষ্টসমূহের উপরল্লেখিত সরলিকরন ও পুনর্ব্যাখ্যা (simplification and re-interpretation)অমূলক মনে হতে পারে। কিন্তু টেকসই উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বিষয়ক গবেষকদের নিকট, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের যেসকল কর্মকর্তা অস্ট্রেলিয়া থেকে এসডিজি বাস্তবায়ন নিরিখে ট্রেনিং প্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কার্যকরী প্রশিক্ষণ ও গবেষণা পরিচালনা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয় সাধন করেন, ওনাদের বিবেচনায় এবং সেইসাথে সুশীল সমাজ একটিভিস্টদের নিরিখেও টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক উপরোক্ত ধারনাগুলি বাস্তবতা সম্পন্ন।
সুজলা সুফলা স্বনির্ভর টেকসই সোনার বাংলা গড়ার জন্য সর্বজনবিদিত আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী মডেল বাস্তবায়ন করতে হবে। পশ্চিমা উন্নয়ন মডেল বাংলাদেশে বাস্তবায়নের অবাস্তব উদ্ভট চিন্তা করার কোন সুযোগ নাই। ‘স্বনির্ভর বসবাসের (self-reliant living) এর জন্য প্রকৃতির সেরা কন্যা বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে সবচাইতে টেকসই’ – যাহা আমরা গানের মধ্যে গেয়ে থাকিঃ

Link: https://www.youtube.com/watch?v=zxUWXib7ZAg
ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদেরই বসুন্ধরা,
তাহার মাঝে আছে দেশ এক সকল দেশের সেরা,
ওসে স্বপ্ন দিয়ে তৈরী সেদেশ স্মৃতি দিয়ে ঘেরা।
এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি,
সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্ম ভূমি।
এই শাশ্বত সত্যটি সমন্ধে যারা অজ্ঞ – তাদের করণীয় হবে যারা ‘টেকসই বিজ্ঞান’(sustainability science )জানে তাদের কাছ থেকে জ্ঞাত হওয়া। অজ্ঞতাবশতঃ টেকসই বাংলাদেশকে প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে অটেকসই পশ্চিমা দেশের মত বানানোর অপচেষ্টা একটি স্বদেশ বিদ্বেষমূলক অপরাধের শামিল।
টেকসই উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও আধ্যাত্মিকতা (sustainable development, sustainability and spirituality) বিষয়ক ছাত্র ও আমলকারি গবেষক (action-researcher) হিসেবে আমরা মোটাদাগে পশ্চিমা সভ্যতাকে ধর্মীয় মূল্যবোধে অবজ্ঞা এবং জেগে ঘুমানোর সংস্কৃতি হিসাবে গণ্য করে থাকি। কারণ প্রাকৃতিক নিয়ম (laws of nature ) এবং প্রকৃতির বহন ও প্রজনন ক্ষমতা (carrying and regeneration capacity of nature) লঙ্ঘন করলে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিতে পারে – এটা জ্ঞাত ও ভুক্তভোগী হওয়া সত্ত্বেও তাদের ভোগবাদ, অপচয় প্রবণ, বিশ্বায়ন ও সীমালঙ্ঘনকারি আগ্রাসনবাদি জীবনাদর্শনের সংশোধন হয়না – এটাও হয়তোবা প্রকৃতি প্রতিপালকের একটি বিধান। করোনার আগমনে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবননাশ, গৃহবন্দী বা নিজ ঘরে কারাদণ্ড, আর্থিক, সামাজিক, দৈহিক ও মানসিক দুর্ভোগের মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব যে ভয়াবহ শাস্তি পাচ্ছে – সেটা থেকে তারা শিক্ষা গ্রহণ করছে না, করবেও না। কারণ সম্পদের ভোগ ও অপচয়, এবং বিশেষ ধর্মে বিশ্বাসী দেশসমূহের মানুষহত্যা করে ঐসব দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেরা সম্পদশালী হওয়ার নেশা পশ্চিমাদেরকে, বিশেষ করে আমেরিকা ও এর সহচরদেরকে পেয়ে বসেছে। এই নেশা যাবার নয়। তাই স্বশিক্ষিত দিব্যজ্ঞানী ‘সহজ মানুষ’ লালন ফকির তাঁর এক কালামে প্রকাশ করেছেনে এইভাবে:
চিরদিন ইচ্ছা মনে
আইল ডিঙ্গায়ে ঘাস খাবা
মন সহজে কি সই হবা।
ডাবার পর মুগুর প’লে
সেই দিনে গা টের পাবা।। ….
ইল্লতে স্বভাব হলে
পানিতে কি যায়রে ধুলে
খাজলতি কিসে ধুবা ?
লালন বলে হিসাবকালে
সকল ফিকির হারাবা।।
ভিডিওতে দেখুন :বাউলগুরু ফকির মান্নান শাহ্, কুষ্টিয়া।

Link:https://www.youtube.com/watch?v=zxUWXib7ZAg

করোনা মোকাবিলায় রাজনীতি পরিমণ্ডলে যা ঘটছে তার অন্যতম অর্থ এই যে টেকসই উন্নয়নে “দলীয় রাজনীতি এ দেশে সুফল বয়ে আনছে না”। ‘কেহই বাদ যাবেনা’ (leaving no one behind) টেকসই উন্নয়নের এই মুল শর্ত পালন দলীয় রাজনীতিতে বাংলাদেশে সম্ভব হচ্ছেনা। এতদসত্ত্বেও ইহার একটি ইতিবাচক দিক আছে । বাংলাদেশের মন্ত্রী মহোদয়গনের কথায় এবং কাজে এটা স্পষ্ট যে উনারা নিজ থেকে বা নিজ দায়িত্বে কোন কিছু বলতে ও করতে অসামর্থ – সবই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এবং নির্দেশে হয়। তার মানে, মন্ত্রীদের লিডারশীপ গুণাবলীর ঘাটতি আছে। এহেন পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে একজন ‘দিব্যজ্ঞানী সহজমানুষ’ এর সান্নিধ্যে থেকে বুদ্ধিমত্তার সাথে টেকসই উন্নয়নের ‘সহজ পথে’ চলতে হবে। এ বিষয়ে ‘সহজ মানুষ’ লালনের শিক্ষা :
যেওনা আন্দাজি পথে মন রসনা।
কুপাকে কুপ্যাঁচে পড়লে প্রাণে বাঁচবে না।
পথের পরিচয় করে যাওনা মনের সন্দেহ মেরে
লাভ লোকসান বুদ্ধির দ্বারে যাবেরে জানা।….
ভিডিওতে দেখুন :বাউলগুরু ফকির মান্নান শাহ্, কুষ্টিয়া।

Link: https://www.youtube.com/watch

দলবাজি দর্শনের উর্ধ্বে গিয়ে ‘কাউকে বাদ দিয়ে নয়’ পলিসিতে সরকার পরিচালনা করতে পারলে এবং শুভাকাঙ্ক্ষী অথচ ভিন্ন মতাবলম্বিদের ও গণমাধ্যমের দেওয়া টেকসই উন্নয়নমূলক সুপরামর্শ বা সুপারিশ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে ভবিষ্যতে কোনও বিরোধী দল না থাকার কথা বিধায় চলমান নেতৃত্ব দীর্ঘস্থায়ী হওয়া সম্ভব। এই নেতৃত্ব সুখশান্তিপুর্ন স্বনির্ভর সোনার বাংলার পুনঃআবির্ভাব ঘটাতে সক্ষম হবে, যাহার রূপরেখা ১৯৬০ এর দশকেও বিদ্যমান ছিল। সর্বজনবিদিত রূপরেখাটি নিম্নরূপঃ
নদী ভরা জল মাঠ ভরা ফসল
পুকুর ভরা মাছ গোয়াল ভরা গরু
বাড়ী ভরা গাছ পাখির কলতান
শিশুর কোলাহল বাউলের ও মাঝির গান
রাতে বন্যপ্রানী ও ভূতের ভয়
উপসংহারে বলা যায় করোনার বিকিরণকে আমাদের সংস্কৃতির সাথে সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ধর্মীয় বিধান ও প্রকৃতির নিয়মাবলিপুষ্ট নীতি পালনের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়ন দ্রুততর করা সম্ভব।


মোঃ আমজাদ হোসেন
এসডিজি কোঅর্ডিনেটর (বাংলাদেশ চ্যাপটার)
কার্টিন ইউনিভার্সিটি সাস্টেইনিবিলিটি পলিসি ইন্সটিটিউট
কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া।
ফোন + ৬১ ৮৯৪৯৪ ২১২৪ (বাসা, অষ্ট্রেলিয়া)
Email: [email protected]

নিবার্হী পরিচালক
এসডিজি অ্যাকশন রিসার্চ সেন্টার
সিমেক ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি

সিমেক ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি, উত্তরা, ঢাকা, বাংলাদেশ।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY