একজন আমজাদ হোসেন এবং বাংলা চলচ্চিত্র

0
74

দৈনিক আলাপ ওয়েবডেস্ক:‌  আমজাদ হোসেন একজন খ্যাতিমান বাংলাদেশি সাহিত্যিক, অভিনেতা এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা। চলচ্চিত্র রচনা, অভিনয় এবং পরিচালনা– প্রত্যেক ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্যের পরিচয় রেখেছেন এবং বাংলাদেশের অন্যতম কিংবদন্তী রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তিনি। সর্বগুণে গুণান্বিত হয়ে একের পর এক কালজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাণ করে, বাংলা চলচ্চিত্রকে করেছেন সমৃদ্ধ, তিনি কিংবদন্তী ‘আমজাদ হোসেন’।

আমজাদ হোসেনের জন্ম ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট, জামালপুরে। শৈশব থেকেই তিনি সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় এসে সাহিত্য ও নাট্যচর্চার সঙ্গে জড়িত হন।

রুপালী জগতে যাত্রার শুরুটা ছিল মহিউদ্দিন পরিচালিত ‘তোমার আমার’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। এরপর তিনি অভিনয় করেন মুস্তাফিজ পরিচালিত ‘হারানো দিন’ চলচ্চিত্রে।

বাংলা সাহিত্যে একজন সাহিত্যিক হিসেবে তিনি বেশ সুপরিচিত। উপন্যাস, ছোট গল্প ছাড়াও আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থও লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালীন যে সিনেমা স্বাধীনতা আন্দোলনে গণজোয়ার এনেছিল সেই ‘জীবন থেকে নেয়া’র কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা ছিলেন আমজাদ হোসেন। গ্রাম-বাংলার ভালোবাসার ছবি হিসেবে যেই ছবিটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত, সেই ‘সুজন সখী’রও কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা তিনি। পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে নির্মিত জনপ্রিয় ছবি ‘বেহুলা’র সংলাপ রচয়িত হয়েছে তার হাত ধরেই। এছাড়া ধারাপাত, আনোয়ারা, আবার তোরা মানুষ হ, জয়যাত্রা, আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসার মত জনপ্রিয় ছবিগুলোর কাহিনীকার তিনি।

অভিনেতা আমজাদ হোসেনও বেশ জনপ্রিয়। জীবন থেকে নেয়ার আলোচিত চরিত্র ‘মধু ভাই’ রূপে অনবদ্য অভিনয় করে দর্শকদের হৃদয়ে তিনি গেঁথে আছেন। এছাড়া ‘হারানো দিন’, ‘আগুন নিয়ে খেলা, বেহুলা, প্রাণের মানুষ, প্রেমী ও প্রেমীসহ অনেক সিনেমাতে তিনি অভিনয় করেছেন। এক সময়কার বাংলাদেশীদের ঈদ বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘জব্বর আলী’র নাম ভূমিকায় তিনিই অভিনয় করেছেন। গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী সিনেমার সেই কালজয়ী গানগুলির রচয়িতাও তিনি।

আমজাদ হোসেনের লেখা নাটক ‘ধারাপাত’ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন সালাহউদ্দিন। এতে আমজাদ হোসেন নায়ক হিসেবে অভিনয় করেন। এরপর তিনি জহির রায়হানের ইউনিটে কাজ শুরু করেন।

এভাবেই দীর্ঘদিন কাজ করতে করতে ১৯৬৭ সালে নিজেই চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, নাম ‘জুলেখা’। তার পরিচালিত ব্যাপক দর্শকপ্রিয় চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘বাল্যবন্ধু’, ‘পিতাপুত্র’, ‘এই নিয়ে পৃথিবী’, ‘বাংলার মুখ’, ‘নয়নমনি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘সুন্দরী’, ‘কসাই’, ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘সখিনার যুদ্ধ’, ‘ভাত দে’, ‘হীরামতি’, ‘প্রাণের মানুষ’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘কাল সকালে’, ‘গোলাপী এখন ঢাকায়’ ‘গোলাপী এখন বিলেতে’ ইত্যাদি।

১৯৭৮ সালে আমজাদ হোসেনের পরিচালনায় বিখ্যাত সিনেমা ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ নির্মিত হয়। নিজের লেখা ‘ধ্রুপদী এখন ট্রেনে’ উপন্যাস অবলম্বনে তিনি সিনেমাটি নির্মাণ করেন। ববিতা, ফারুক, আনোয়ারা, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, তারানা হালিম, রোজি আফসারী, এটিএম শামসুজ্জামান অভিনীত ছবিটি সেই সময় দারুণ ব্যবসাসফল হয়। সাথে কালজয়ী ছবি হিসেবে এটি স্থান করে নেয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে। গোলাপী এখন ট্রেনে সেই সময় ১১টি শাখায় পুরস্কার পেয়ে ভীষণ আলোচিত হয়, তিনি নিজেই পাঁচটি পুরস্কার পেয়ে সবাইকে চমকে দেন।

‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ও ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পরিচালক হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক (১৯৯৩) ও স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করেছে। এছাড়া সাহিত্য রচনার জন্য তিনি ১৯৯৩ ও ১৯৯৪ সালে দুইবার অগ্রণী শিশু সাহিত্য পুরস্কার ও ২০০৪ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

১৯৮১ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আমজাদ হোসেন।

গত ১৮ নভেম্বর আমজাদ হোসেন ব্রেন স্ট্রোক করলে তাকে রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ইমপালস হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে বেশ কিছুদিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন তিনি। এরপর তার চিকিৎসার সব দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উন্নত চিকিৎসার খরচ বাবদ নন্দিত এই নির্মাতার পরিবারের হাতে ২০ লাখ টাকা এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ভাড়া বাবদ ২২ লাখ টাকা দেন প্রধানমন্ত্রী।

এরপর ২৭ নভেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

শুক্রবার বিকাল ৩টার দিকে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

প্রসঙ্গত, তার দুই পুত্র সাজ্জাদ হোসেন দোদুল ও সোহেল আরমান নির্মাণের সাথে যুক্ত আছেন। তিনি মোট সতেরটি সিনেমা নির্মাণ করেছেন। অর্জন করছেন সর্বোচ্চ ১৩টি জাতীয় পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পুরস্কারসহ আরো বহু পুরস্কার।

 

LEAVE A REPLY