শ্রদ্ধা,ভালোবাসা,বেদনায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণে সমাজ বিশ্লেষক-কলমযোদ্ধা রীতা ধরের লেখা “বঙ্গবন্ধু এবং স্বপ্নের সোনার বাংলা”

44
শ্রদ্ধা,ভালোবাসা,বেদনায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণে

বঙ্গবন্ধু এবং স্বপ্নের সোনার বাংলা
রীতা ধর

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক । বঙ্গবন্ধু আর স্বাধীন বাংলাদেশ হচ্ছে একটি বৃন্তে দুটি ফুল ।বাংলাদেশ যদি সে ফুলের রঙ হয় বঙ্গবন্ধু তার সুবাস। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে হয়তো আজও বাঙ্গালী জাতি স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহন করতে পারতো না। বাংলার মাটি মানুষের জন্য যেমনি বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছে তেমনি বঙ্গবন্ধুর কারনেই বাংলার মানুষ পেয়েছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাঁর অকৃত্রিম দেশপ্রেম, মাটি ও মানুষের জন্য মমতা তাঁকে যুগে যুগে বাঁচিয়ে রাখবে মানুষের অন্তরে। যতদিন বাঙ্গালী ও বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকবেন মানুষের অন্তরে। তাই তো পৃথিবীতে যত মহান ব্যাক্তিত্ব রয়েছেন তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নাম লেখা রয়েছে প্রথম কাতারে। পরাধীন এই বাঙ্গালী জাতিকে তিনি উপহার দিয়েছেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, একটি নতুন পতাকা, নতুন মানচিত্র। বাংলাকে মনে প্রাণে ধারণ করেন এমন একজন মানুষের পক্ষেও বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার করা সম্ভব নয়।

১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর দেশ যখন শত্রুমুক্ত হলো, স্বাধীন বাংলার আকাশে উড়ছে যখন লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত লাল সবুজ পতাকা তখন দেশের মানুষকে সাথে নিয়ে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশগড়ায় নতুন উদ্যোমে মনোনিবেশ করলেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু তখনও মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত অপশক্তির ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে তারা একের পর এক চক্রান্তের ফাঁদ পেতেছে । তেমনি একটি চক্রান্তের পরিকল্পনা করেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এদেশের সেনাবাহিনীর বিপথগামী কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক সদস্যদের সাথে নিয়ে। ষড়যন্ত্রকারীরা ওই বিশ্বাসঘাতকদের ব্যবহার করেছে তাদের চক্রান্তের বাস্তব রূপ দিতে।

সেদিন ছিল ১৯৭৫ সালের ১৪ই আগষ্ট।
পরদিন ১৫ই আগস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে যাওয়ার কথা। কিন্তু কে জানতো, ১৪ই আগস্ট সেনাবাহিনীর সেইসব বিশ্বাসঘাতকরা একত্রিত হয়ে স্বাধীনতার স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পরিকল্পনা করছিলো। সেদিন মধ্যরাতে মেজর ডালিম, মেজর নূর,মেজর হুদা,মেজর শাহরিয়ার, মেজর পাশা,মেজর রাশেদসহ অন্য কয়েকজন ঘাতকের উপস্থিতিতে হত্যার পরিকল্পনাটি প্রথম ব্রিফিং করে মেজর ফারুক। মূলত স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের মদদপুষ্ট হয়ে সংগঠিত হয়েছিল ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাকান্ডটি। যা বাঙ্গালী জাতির জন্য অত্যন্ত কলঙ্কজনক।নির্মমতা কতটা নিষ্ঠুর হলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে ঘাতক দল।

বঙ্গবন্ধু সবসময়ই বাংলার মানুষ ও মাটির প্রতি বিশ্বাসী ছিলেন। নিজের প্রাণের চেয়েও অধিক ভালোবাসতেন বাংলার মানুষকে।তাই তো বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়িতে ঘাতকরা যখন তাঁকে আটক করে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামিয়ে আনতে থাকে তখন সিঁড়ির মুখে মেজর হুদাকে দেখে বঙ্গবন্ধু চিৎকার করে ওঠে বলেছিলেন , ‘তোরা কী চাস? তোরা কি আমাকে মারতে চাস?’ মেজর হুদা বলে, ‘আমি আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি?’ বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তুই আমাকে মারতে চাস? কামাল কোথায়? তোরা কামালকে কী করেছিস?’ উত্তরে হুদা বলে, ‘স্যার, কামাল তার জায়গায়ই আছে। আর আপনি তুই তুই করে বলবেন না। আপনি এখন বন্দি, চলুন।’
বন্দুকের গুলির সামনে তখনও গর্জে উঠলেন বঙ্গবন্ধু, ‘কী, তোদের এত সাহস! পাকিস্তান আর্মিরা আমাকে মারতে পারেনি। আমি বাঙ্গালী জাতিকে ভালোবাসি। বাঙ্গালী আমাকে ভালোবাসে। কেউ আমাকে মারতে পারে না।’ কিন্তু যুগে যুগে মিরজাফরেরা ছিল এবং থাকবে। তাদেরই বিশ্বাসঘাতকতায় অকালে ঝরে যেতে হলো বাংলার অবিসংবাদিত নেতাকে,মৃত্যু হলো একটি সোনালী স্বপ্নের।

আজ আমরা বাঙ্গালী জাতি হিসেবে গর্ব করে বলি, আমরা বীরের জাতি। কিন্তু যদি বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হতো তাহলে তা হয়তো আদৌ সম্ভব হতো না। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার জয়লাভ, ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা দাবিতে ১৯৬৯ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণআন্দোলনেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব ও অবদান সূর্যালোকের মতো স্পষ্ট এবং চিরন্তন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক অগ্নিঝরা ভাষণে তিনি স্বাধীনতার যে ডাক দিয়েছিলেন তাও ইতিহাসে অবিস্মরণীয়। সেদিন তাঁর বজ্রকণ্ঠ হতে উচ্চারিত হয়েছিল ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ সেই মন্ত্রপূত ঘোষণায় নিপীড়িত কোটি বাঙ্গালী ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার যুদ্ধে। তাঁর অমর আহ্বানেই নয়মাস যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়ে বাঙ্গালী আজ লড়াকু বীরের জাতি।স্বাধীনতার স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব
বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতায় দেশের সংবিধানও প্রণয়ন করেছিলেন।

এখন আগস্ট মাস,এই মাস জাতীয় শোকের মাস। আগস্ট মাস এলেই মনে পড়ে যায় সেই ভয়াবহ ১৫ই আগস্টের কালরাত। যা আমাদের মর্মাহত করে তোলে। যে বিশাল হৃদয়ের মানুষটি নয়মাস স্বাধীনতার যুদ্ধ চলাকালীন সময় কারাগারে বন্দি ছিলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা পর্যন্ত তাঁকে স্পর্শ করার সাহস দেখাতে পারেনি, অথচ স্বাধীন বাংলার মাটিতেই কিছু বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরদের পরিকল্পনায় নিজ দেশের মাটিতেই তাকে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে। বিশ্বাসঘাতকদের মধ্যে অন্যতম ছিল বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠজন খন্দকার মোস্তাক।সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে আমরা শুধু শোকাহত নয়, জাতি হিসেবেও বড় দুর্ভাগা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে নৃশংসভাবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে ঘৃণ্য পরিকল্পনা কারী ঘাতক দল। খুব অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ১৮ জনকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। সেই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডে পাষন্ড ঘাতকদের হাত থেকে রেহাই পায়নি শিশু রাসেল,শিশু বাবু,এমনকি অস্তঃসত্ত্বা বধূও।
শোকার্ত সেই কালরাতে ঘাতকের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী শেখ ফজিলাতুননেছাও, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল, জামালের স্ত্রী রোজী জামাল, বঙ্গবন্ধুর ভাই শেখ নাসের, এসবি অফিসার সিদ্দিকুর রহমান, কর্ণেল জামিল, সেনা সদস্য সৈয়দ মাহবুবুল হক, প্রায় একই সময়ে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে যুবলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মণির বাসায় হামলা চালিয়ে শেখ ফজলুল হক মণি, তাঁর অন্ত:সত্তা স্ত্রী আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াতের বাসায় হামলা করে সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবী, পুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত বাবু, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বড় ভাইয়ের ছেলে সজীব সেরনিয়াবাত এবং এক আত্মীয় বেন্টু খান।

সেদিনের হত্যাযজ্ঞের সময় দেশে ছিলেন না বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। বড় মেয়ে শেখ হাসিনা স্বামীর সঙ্গে ছিলেন জার্মানিতে। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন ছোট বোন শেখ রেহানাও। তাই ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেন তাঁরা।

এমন বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞে সেদিন হতবাক হয়েছিল সারাবিশ্ব, যে মানুষটি স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন তাঁকেই বাঙালিরা হত্যা করেছে। কেঁদেছে আকাশ বাতাস সমস্ত প্রকৃতি। ঘাতকদের উদ্যত অস্ত্রের সামনে ভীতসন্ত্রস্ত বাংলাদেশ বিহ্বল হয়ে পড়েছিল শোকে আর বর্বরোচিত ঘটনার আকস্মিকতায়। সেদিন বঙ্গবন্ধুর বুক চিরে যে রক্তের প্লাবন ঝরেছে তা বাঙ্গালীর মর্মছেঁড়া অশ্রু প্লাবন। যে প্লাবন ইতিহাসের পাতায় কালো কালিতে লেখা থাকবে চিরকাল। এ শোকের আগুন কাল থেকে কালান্তরে জ্বলবে।

বিশ্বের ইতিহাসে ঘৃণ্য ও নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সেদিন তারা কেবল বঙ্গবন্ধুকেই নয়, তার সঙ্গে বাঙ্গালীর হাজার বছরের প্রত্যাশার শ্রেষ্ঠ অর্জন স্বাধীনতার আদর্শকেও চিরতরে হত্যা করতে চেয়েছিল। মুছে ফেলতে অপচেষ্টা চালিয়েছিল বাঙ্গালীর বীরত্বগাঁথার ইতিহাসও। বঙ্গবন্ধুর নির্মম নৃশংসতম হত্যাকান্ড বাঙ্গালী জাতির জন্য করুণ বিয়োগগাঁথা,এ হত্যাকাণ্ড শুধু ব্যক্তি শেখ মুজিবুর রহমান এর নয়, সমগ্র জাতির একটি সোনালি স্বপ্নের অকাল মৃত্যু।
১৫ আগষ্টের কালোরাতে বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘাতক দল দৈহিকভাবে হত্যা করলেও তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি চিরঞ্জীব। একটি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্থপতি তিনি। যতদিন এই রাষ্ট্র থাকবে, ততদিন অমর থাকবেন বঙ্গবন্ধু। সমগ্র বাঙ্গালী জাতির মর্মচেতনায় তিনি চিরঞ্জীব। বঙ্গবন্ধু এক মহান আদর্শের নাম। যে আদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিল গোটা দেশ।

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রুপান্তর করতে। ক্ষুধা, দারিদ্র ও শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের স্বপ্নও দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগেই ঘাতকদের নৃশংস বুলেট কেড়ে নেয় তাঁর প্রাণ।

তবে তাঁর অসমাপ্ত কাজ এবং সোনার বাংলা স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন তাঁর যোগ্যকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। কয়েকজন খুনীর ফাঁসির রায়ও কার্যকর হয়েছে।যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং কয়েকজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশ।দেশে এখন উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাচ্ছে।বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে সামনে রেখে স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়তে সমস্ত বাধা বিপত্তিকে সরিয়ে এগিয়ে চলেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

Content Protection by DMCA.com

LEAVE A REPLY