জীবনের কালবেলায় একজন ক্ষণজন্মা সাধক ”নুরুল ইসলাম” স্মরণে।সাম্য দর্শনের কলমযোদ্ধা-হাসান আহমেদ চিশতীর লেখা“জ্ঞানময় স্বপ্নমঙ্গলের দিশারী”

69
''নুরুল ইসলাম'' স্মরণে।সাম্য দর্শনের কলমযোদ্ধা-হাসান আহমেদ চিশতীর লেখা“জ্ঞানময় স্বপ্নমঙ্গলের দিশারী”

জ্ঞানময় স্বপ্নমঙ্গলের দিশারী
হাসান আহমেদ চিশতী

জীবনের কালবেলায় একজন ক্ষণজন্মা সাধক পুরুষের প্রাণ পর্ব লিখতে বসে কত কথাই তো মনে পড়ে। তার কতটাই বা লেখা হয়। বরং সেই প্রিয় মানুষটির জন্য দু’ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে যায় আর একান্ত ভাবনার ঘোরে রেশটানা দায় হয়ে পড়ে। তাঁর পুর্বসুরীদের কথা যতটা না জানি তাঁর চেয়ে উত্তরসুরী কেউ একজনের সান্নিধ্য পাওয়া সেও তো কম নয়। এমনি একজন সাধু পুরুষ নুরুল ইসলামের প্রথম পুত্র মোঃ রবিউল ইসলাম। হৃদয়বৃত্তে কখন যে আসন গেড়ে বসেছিল সে কথার বিস্তারে নাই বা গেলাম। তবে মননবৃত্তের নিত্য অনুশীলনের আড্ডায় তার সরব উপস্থিতি আমাদের ক’জন বন্ধুকে নব চেতনার নব উদ্যোমে সদা আপ্লুত করে রাখে। আমরা যারা প্রাণ প্রত্যয়ই একান্ত লিলাবৃত্তে অবগাহন করি তাদের মধ্যে মোঃ রবিউল ইসলাম, নূরুল হক, আশিকুর রহমান, তারিফ হোসেন ও আমি। তবে আসাদ ও আনু ভাই কাজের পরিসরে দুরে। মাসুদ, বাবলু, বিপ্লব আর পরিতোষ বয়োকনিষ্ঠতার কারণে মাঝে মধ্যেই এসে ভিন্নমাত্রা দেয়। ভাবের তীক্ষèতা আর মনের সন্ন্যাস্যে গা ঝাড়া দিয়ে সান্ধ্যকালিন চা পর্ব শেষ করে প্রায় প্রতিদিনই আমাদের আয়োজনের সমাপ্তি হয়।

অন্তর্মুখিনতা কিংবা বহির্মুখিনতায় আমাদের কখনো ছেদ পড়ে না। তবু মনে হয় জীবনটা যেন কোন ষ্টেশনে অপেক্ষায়রত ওয়েটিং রুমের মতো। ২০২১ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারী আমার বাবা এবং রবিউলের বাবা একই দিনে পরলোক গমন করেন। মানুষিক ভারসাম্যতায় আমরা হাল ভাংগা নাবিকের মতো অথৈই সমুদ্রে দিকভ্রান্ত। আমরা যে জগতে বাস করি সে জগতে অনিত্যতার একটি নিষ্ঠুর এই নিয়ম। আমি তা উপলব্ধি করতে পেরেছি। যাকে কোনদিন হারাতে হবে এ যেন চিন্তায় আসে না। নিজেকে ভীষণ অসহায়, সম্ভলহীন মনে হয়। অদ্ভুত রকম শূন্য নিঃসঙ্গ নিরবতা। মর্মান্তিক স্থিতি, বিচলিত হৃদয় গভীরতম সত্যে গিয়ে পৌঁছতে চায় না। তবু ভাবতে কষ্ট হয় মহাকালের সেই অখন্ড জীবন স্রোতে নিজেকে মিলিয়ে দেওয়াই হয় তো মৃত্যু।
বালকবেলায় পড়েছিলাম পিতৃস্ত্রোত্র: ‘‘পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমন্তপং প্রিতরে প্রীতিমাপন্নে সর্বদেবতা।’’ সেই চেতনার উল্লেখ করেছেন প্রবোধ কুমার সান্যাল- ‘‘জন্মদাতা হওয়া সহজ; কিন্তু পিতা হওয়া বড় কঠিন।’’ যে পিতৃত্বে দায়িত্ববোধ আছে তা বাস্তবিকই মহান। সেই মহান দায়িত্ব ব্যাপৃত হয়ে সমাজ জীবনে যে ব্যক্তিটি সত্যের সাধনা করে গেছেন তিনি মোঃ নুরুল ইসলাম। আজ তাঁর কথাই বলবো যিনি রবিউল ইসলামের পরম পিতা। যে পিতৃত্বতার দায় মিটিয়ে মুক্তির পূণ্যস্্নান করিয়েছেন সন্তানকে। আর আত্ম প্রকাশের সুক্ষ্মকায়ায় মায়া বোধে বলেছেন রাজা প্রজার সম্পর্ক নয় আমাদের। তোমার ফসলের ভাগ চাইতে আসবোনা কোনদিন। আত্ম প্রত্যয়ই হয়ে জেগে থেকো আমার রবি। ছেলেকে দীর্ঘ্য চিঠি লিখতেন। তাতে অনেক কথা। নানা উপদেশ, অনুরোধ, আশা-আকাংখ্যা আর দিক নির্দেশনা। যেন এই সেই মুক্তিত্বত্ত্বের কাব্য সমাহার দলিল।
পৃথিবীর সকল অনুশোচনা তীব্র অনুভূতির বেদনায় আকুল সোনাতলা গ্রামীণ জনপদ আর নুরুল ইসলামের পরিবার পরিজন। তবু জীবনের গতি থেমে থাকে না। ব্যক্তিত্বের বিশালত্বে যে মাত্রায় ভালবাসা দিয়ে সকলের মন জয় করতে পেরেছিলেন নরুল ইসলাম। তার পূর্ণ প্রতিদান পেয়েছেন পরিবার গঠনে স্ত্রী সন্তানদের মনুষত্ব বলয়ে মানুষ হয়ে ওঠায়। নুরুল ইসলামের বেড়ে ওঠা বর্ণাঢ্য জীবনের গল্প অনেক বিস্তৃত আর চরম শিক্ষণীয়। যার তুলনা চলে না কোনও প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাপিঠের সাথে। কারণ বহুমাত্রিক মনোজগতের দর্শণ আর মনন বৃত্তের যে দীর্ঘ্যযাত্রার গতি পথ বিনির্মাণে জীবনবোধে তার আঙিনা, তা কেবল মাত্র অনুধাবন ও অনুশীলনেই একজন প্রত্যয়ই মানুষ হয়ে ওঠার পাথেয়।

নিরাশ্রয়ের গৃহি নুরুল ইসলাম তার গ্রামীণ জনপদে নুরু ভাই। বিপদে আপদে আর কার্য্যকরণের সকল ধারায় ছিল তার নিত্য উপস্থিতি। তাই ধী শক্তি আর মেধা মননে রীতিমত প্রগতিশীলতার বাতাবরণ ছিল অনন্য মাহাত্বে সুপ্রতিষ্ঠিত। চিন্তাগত এবং আচরণগত উভয় প্রশ্নেই নুরু ভাই একজন প্রিয় অনন্য মাত্রার মানুষ। জীবনের প্রান্তিক পর্ব তার কেটেছে নানা চড়াই-উৎরাই এর বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে। তবু তার চিত্তের ভেতরে যে বিত্ত ছিল তারই নিগুঢ়তম জীবনরস সঞ্চার করে সদা জাগ্রত তার গতির ধারা। ইউনিয়ন পরিষদে চাকুরী করে যে স্বধর্মে সুশৃংখল পরিবার গঠন আর সামাজিক পরিমন্ডলের আত্মপ্রতিষ্ঠা এ এক অনবদ্য ও অনন্য প্রাণপ্রতিষ্ঠা।

আলো আঁধারী গোলকধাঁধার জগতে সত্য মিথ্যা না চিনলে জীবনের দিশার সন্ধানই পাওয়া যায় না। সেই সত্য সন্ধানের নিগুঢ়তম তাপস ছিলেন মোঃ নুরুল ইসলাম। লালন দর্শণের সে কথাই মনে আসে ‘‘মানুষ ভজিলে সোনার মানুষ হবি।’’ তাঁর ঐ লোক জীবনে হাটে-মাঠে, ঘাটে, চায়ের টেবিলে কিংবা কোনও খোলাচত্বরে আড্ডায় যে যত বিষয় যুক্তিতর্ক করতো, তার প্রায় সবটা জুড়ে নুরু ভাই যে সহজ সমান্তরাল পথ দেখাতে পারতেন। তাই তাঁর প্রতি সকলের বিশ্বাস আর আস্থা ছিল অবারিত। এমন কি চলমান রাজনৈতিক ধ্যান ধারণায় বুদ্ধিদীপ্ত সমন্বয় সাধনে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ফলে সকল ধারার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ঐ অঞ্চলে তারই প্রজ্ঞাবলয়ে শ্রদ্ধার্ঘ্য দিতে কুন্ঠিত হতো না। অথচ তিনি বিনয়ের সাথে যে কোন রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতেন এবং তাদের দামী গাড়িকেও ফিরিয়ে দিতেন। ব্যক্তিত্বের এই মাত্রাগুণে সকলে বিচলিত হলেও তিনি সদা শান্ত চিত্ত্বের আপন বিত্তে সমাসিন।

রবিউল ইসলামের সাথে সাক্ষাৎ ও নীবিড় সম্পর্কের আতিসয্যে তার পিতা নুরুল ইসলামের সাথে আমার এক আত্মিক মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়েছিল। এই সাধক খুব স্বল্প সময়ে এতোটাই আপন করেছিলেন যে তার ছেলের খবর যখনি ফোনালাপে জানতে চেয়েছেন, তখনি আমার কথা জিজ্ঞাসা করতেন। এমন কি আমার সাথে আছে শুনলেই যেন অনেকটা নিশ্চিন্ত হতেন। এটা আমার উপলব্ধি থেকে আমি জেনেছি। ভাবতে পারিনা, আমার বুক ফেটে কান্না আসে, দিকশূন্য হয়ে শরীর কাঁপতে থাকে। জীবনের এমন সত্যকে কিছুতেই অস্বীকার করার কোনও উপায় নাই। সে যে মানুষের পিতা। কিভাবে মানুষ হওয়া যায় তার পূর্ণতা ছিল তাঁর, সেই মণির দ্যুতি তিনি ছড়াতে পারতেন। তাঁর নিজ বাড়ীতে আমাকে পাশে বসিয়ে এক সাথে খেয়েছেন। তাঁর যে পাঠ্যাভ্যাস ছিল সেই সযত্নে রাখা সংরক্ষিত গ্রন্থ সমাহার আমাকে দেখিয়ে বলেছেন- জীবনকে মূল্যবোধে সুশৃংখল করতে হলে স্বধর্মের শিক্ষায় যত্নবান হওয়া অতিব গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন হাদিসের নানা ধরণের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও দর্শণ তত্ত্বের চরমতম শিক্ষা যে তিনি স্বউদ্যোগে আত্মস্থ করতে পেরেছেন, এটা তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে না গেলে হয়তো আমার অজানাই রয়ে যেত। কাল বিবর্তনে এমন একজন ক্ষণজন্মা মানুষের কথা শুধুমাত্র বাক্যবিন্যাসে সম্ভব হয়ে ওঠে না। কারণ একান্ত আত্ম উপলব্ধির সবটাই যেন অপ্রকাশিত রয়ে যায়। তিনি স্বপ্ন বিলাসী কর্মযোগী হয়েও বহু আলেম ওলামা, পীর-মাসায়েক ও মহাত্মা বুজুর্গদের যেমন শ্রদ্ধা করতেন ঠিক তেমনি আবার তাদের একান্ত সহচর্য্যও লাভ করেছেন। স্বধর্মের নৈতিকতা, বিজ্ঞান চেতনা আর সত্য সন্ধানের বস্তুনিষ্ঠ্যতায় নুরুল ইসলাম ছিলেন অটল সাধক। সময়মতো সন্তানদের সুশিক্ষিত করে বিয়ে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মায়ের মতো পুত্র বধুর আসন করে দিয়েছেন। যতটা জেনেছি- বড় পুত্রবধুর হাতে তৈরী জামা পরতেন, যেন মায়ের দেয়া নক্সীকাঁথা গাড়ে জড়িয়ে রেখেছেন। এ বড় অস্থির চিত্ত বেদনার স্মৃতি।

পাঁজির হিসেবে আমরা এখন প্রবীণ। তবু পিতৃ ঋণের দায়মুক্ত হওয়া যায় না। বহুকাল আগে পড়েছি- “পিতার পূণ্যে পুত্রের জয়।’’ তারই প্রতিচ্ছবি সেই নুরু ভাই এর বড় সন্তান রবিউলের ভেতরে যতটা দেখেছি তার কিয়দাংশের বর্ণনা অত্যাবশ্যক বলে মনে করি। প্রায় এক যুগের অধিক সময়কাল ধরে তার সাথে আমার প্রাণপ্রিয় সখ্যতা। ঈশ্বরদী সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের প্রধান এবং সহকারী অধ্যাপক রবিউল এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএস এ ডক্টরেট করছে। ইতিপূর্বে সে সরকারি বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডের বিশ্ববিখ্যাত নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাস থেকে থিসিসে ডিস্টিংশন নিয়ে শিক্ষায় মাস্টার্স ডিগ্রী লাভ করেন। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত রবিউল যখন কলেজে কর্মব্যস্ত তখন এ অঞ্চলের আওয়ামী লীগ নেতা শামসুর রহমান শরিফ ডিলু এমপি ছিলেন ভূমিমন্ত্রী। রবিউল যে তার পিতার ন্যায় স্বপ্নবিলাসী কর্মযোগী সেটাই দেখেছি তার এই সরকারি কলেজ উন্নয়নের সর্বাত্মক প্রচেষ্টার তৎপরতা থেকে। আপন পিতার একই ব্যক্তিত্বের মহার্ঘ্য ধারণ করে রবিউল মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে চরম গ্রহণযোগ্যতায় সম্মানের সাথে দাঁড়াতে পারতেন। যা এ অঞ্চলের অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। যাক সে কথা, তবে ঈশ্বরদী সরকারি কলেজ উন্নয়ন তরান্বীত করতে রবিউল এর কর্মপ্রচেষ্টা সম্ভাবনাময় শিক্ষার বৃহৎ পরিষরকে বাড়িয়ে তুলেছে। পাশাপাশি এ অঞ্চলের সকল মানুষের সাথে তার মেলামেশা আর যোগাযোগ এমন এক মাত্রা এনে দিয়েছে যে আমার বন্ধু মহলের কোনও অনুষ্ঠান হলে তার অনুপস্থিতিতেও রবিউল স্যারের মতো মানুষ হওয়ার উদাহরণ আমরা শুনতে পাই। বড় অদ্ভুৎ শোনালেও এটাই সত্য। সার্থক সাধক নুরুল ইসলাম, জ্ঞানময় স্বপ্নমঙ্গলের দিশারি। মানুষ তিনি মানুষ করেছেন সন্তান। তাই তো তিনি মানুষের পিতা। পরিশেষে আমাদের পবিত্র কোরআনের একটি বাণী দিযে অসমাপ্ত কথার সমাপ্তি টানবো। “হে আমাদের রব, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তান দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি তাদের মুত্তাকিদের নেতা বানিয়ে দিন” (আল-কুরআন: ২৫:৭৪) আমিন।

লেখক পরিচিতি: হাসান আহমেদ চিশতী, কবি, সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক, ঈশ্বরদী, পাবনা।

নূরীসত্তা ধারণকারী ”নুরুল ইসলাম” স্মরণে শব্দ সাধক তারিফ হোসেন এর লেখা ”পিতার তান গায় সন্তান”

Content Protection by DMCA.com

1 COMMENT

LEAVE A REPLY